১।
আজ ভারী অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা হলো। এটা এখনই শেয়ার করা যাক; কারণ এটা মগজে বসতে একটু সময় নেবে। কাঁচা ছাঁচ যেমন আছে, লিখি। আপনারা কমবেশী সবাই-ই প্রায় জানেন; যাঁরা আমায় রক্তমাংসে চেনেন আর কি, যে, আমি একা বাঁচি — একা মানে সত্যিই একা। পাড়ার কিছু ছেলে-মেয়ে, যাদের সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে একটা সময় কথা-টথা হতো, তারা প্রত্যেকেই প্রায় বিয়ে-শাদী করে ফেলেছে। বাল-বাচ্চাও হয়ে গেছে অনেকের। তারা আমায় অনিন্দ্য আঙ্কল ডাকতো, কিন্তু, ভাগ্যহত আমি তখনও বুঝি নি।
আজ একটা ঘটনা আমায় অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে গেলো। এতো পাবলিক স্পীকিংয়ের অভিজ্ঞতা, অ্যান্ড দ্যাট টু, ইন থ্রি ডিফারেন্ট ল্যাঙ্গুইয়েজেস, সব জলে গেলো; এত আনস্মার্ট কথা আমি অনেক দিন বলি নি। অথচ যা কিছু কথা, তার সবটাই বাংলাতেই হওয়ার ছিলো — সেই বাংলা, যাকে আমি আমার মাতৃভাষা (আগে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ বলতাম, ইদানীং নেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ বলে থাকি) বলেই জানি। কিন্তু কথোপকথন শুরু হওয়ার পর থেকেই আমার অসুবিধা শুরু হয় — ভীষণ সাফোকেটিং লাগছিলো নিজের ঘরকে, যেখানে আমি স্বাচ্ছন্দ্য টের পাই সবচেয়ে বেশী।
কী হয়েছে আজ — বিকেলের দিকে খানিক ঘুমিয়েছিলাম। সকালে কাজের কিছু চাপ ছিলো, সারতে সারতে বেলা গড়ায়। তা পৌনে আটটা নাগাদ আমার পাওয়ার-ন্যাপ ভাঙায় বউ, অফিস থেকে ফিরে রিফ্রেশড হয়ে চা বানিয়ে নিয়ে মুখের সামনে ধ’রে। চা হাতে নিয়ে দুটো জরুরী ফোন করার ছিলো। করলাম। মোবাইলে মেইল চেক করতে ইচ্ছে করছিলো না, ডেস্কটপ খুলে ক্যালাইডোস্কোপ (অর্থাৎ অনেককটা ইমেইল আই ডি তো) ঘোরাতে যাবো, জয়িতা মিষ্টি হেসে বললোঃ ‘*** তোর কাছে একটু আসবে। ### (***-এর মা) চাইছে, *** তোর সঙ্গে যেন একটু কথা বলে। তা’ তুই কী ব্যস্ত?’ আমি দাঁত ক্যালাই, যেভাবে কেলিয়ে ছেড়িয়ে জীবনটা কেটে এলো আর কিঃ ‘না। ব্যস্ততা কীসের। আসতে বল না।’ কী করে বুঝবো, বিশ্বরূপের একটা অন্ততঃ দিক আমার দেখা বাকী আছে, আর সেটা দেখতে আমি চলেছি।
*** একটি ছেলে। আমাদের বাড়ীর কয়েকটা বাড়ী পরেই তাদের বাড়ী। বয়স ১৬+। হোস্টেলে থেকে মন দিয়ে লেখাপড়া করে এবার মাধ্যমিক দিয়েছে। এগারো কেলাসে ভর্তি হবে। সায়েন্স-ই নেবে। তবে পিওর সায়েন্স, নাকি, কম্বিনেশনে সামান্য অদল-বদল করে নিয়ে চূড়ান্ত মনোমতো কিছু একটা — এইসব গুরুত্বপূর্ণ কিংবা তুচ্ছ ব্যাপার। পড়াশোনায় তো আপনারা জানেনই যে, আমি আটকলা (আটকুঁড়েও লেখা যেতো, খুব ভুল হতো না তাতে), মাধ্যমিক ফেল লিখি বটে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়, কান্নিক মেরে মাধ্যমিকের গেরো পেরোনো গিয়েছিলো। রেজাল্ট ফেজাল্ট নিয়ে প্রশ্ন করবেন না কাইন্ডলি, এতো লজ্জায় পড়ে যাবো যে, এই লেখাটাও শেষ হবে না, ইংরেজীতে গ্রেস মার্ক পেয়ে পাশ, অঙ্কে কোনও রকমে ৩৪ (কে সি নাগ, শালা শুয়োরের বাচ্চা, কিছু বাচ্চা থাকে, আমি এখন রিয়েলাইজ করি, যাদের জন্মের পরই মুখে দুধ দেওয়ার বদলে নুন দিয়ে মেরে দেওয়া উচিত, নইলে এরা পরে অন্যের শান্ত-সুস্থ জীবন দুর্বিষহ করে দেয়, কে সি নাগ একজন ওইরকম বিষ-মাল), ইতিহাসে বাহমনী রাজবংশ… ওরাল পরীক্ষার দিন বীথিকা দিদিমণি আর কাউকে না পেয়ে আমায় ধরেছিলেনঃ ‘বল্, বাহমনী ডায়নাস্টির একজন রাজার নাম বল্।’ আমি কুল, ওই বনি এমের ড্যাডি কুল গানটার মতো, আ’য়্যাম ক্রেজী লাইক আ ফুল, ওয়াইল্ড অ্যাবাউট হিস্ট্রি কুল। সটাকসে পাল্টা শুধিয়েছিলামঃ ‘ব্রাহ্মণী সাম্রাজ্যটা কোথায় দি’মণি?’ বীথিকা দিদিমণিঃ ‘হুম, আর চোল?’ মিছে কথা কেন লিখবো — দক্ষিণ ভারতের দিকে কোথাও একটা চোল সাম্রাজ্য আছে জানতাম, প্রভাতাংশুর মাইতির বইতে চোলদের সময়ে তৈরী হওয়া একটা মন্দিরের ছবিও ছিলো। কিন্তু, কিশোরবেলা, সেক্সুয়াল অ্যাওয়েকেনিং-এর হতে পারে, কামিং অফ এজ যাকে বলে, কিন্তু কোথাও কি দেখেছেন কামিং অফ এজ অফ ডিভিনিটি? সুতরাং মন্দির থেকেই চোল, চোল প্রতিসৃত হয়ে চোলি, চোলি থেকে অ্যাসোসিয়েশন অফ থটস্ হয়ে চুনরী, আর সেখান থেকেই মান্না দে আর লতা মুঙ্গেশকর টেক অফ করতেন, চুনরী সাম্ভাল গোরী... এই গানটায় ‘হারারারা’ জায়গাটা আমার দারুণ লাগতো। জানি না, হারারারা’র সঙ্গে স্যার্রা মারার কোনও সম্পর্ক আছে কিনা, তবে এটুকু বলতে পারি, সম্পর্ক থাক, বা না থাক, বর্ষায়, ময়দায় ঠিক যে ব্যাটারের ওপর এক গেলাস জল ঢাললে ‘পর দুর্দান্ত পাটিসাপটা তৈরী হয়, ঠিক ওইরকম কাদার লেইয়ের মধ্যে স্যার্রা কেটে গোল করেছি অনেক। এর আর একটা লক্ষ্যও ছিলো — স্যার্রা কাটার পর বল পায়ে ঠেকুক আর না ঠেকুক, পা গোলকীপারের হাঁটুতে ঠেকবেই, আর ওই ভরবেগ সামলাতে না পেরে সামনের কাদায় মুখ থুবড়ে সে পড়বেই। তা সে পড়ুক, কিন্তু আমি ইতিহাসে যাতে ফেলের গাড্ডায় না পড়ি, সেজন্য বীথিকা দিদিমণি আমাকে আর প্রশ্ন না করে ইতিহাসে দশে দশ দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ ‘তুই কী আর পড়বি?’ শীটে দশ পড়ে গেছে দেখে রোমাঞ্চিত, পুলকিত, সহর্ষ আমি দিদিমণিকে বরাভয় দিতে চাইলুমঃ ‘হ্যাঁ দি’মণি। খুব মন দিয়ে পড়ে নেব। এই ব্রাহ্মণী, চোলি সব। লেটার পেয়ে যাবো, দেখে নেবেন।’ বীথিকা দিদিমণি, কপাল, ভ্রু কুঁচকিয়েঃ ‘সে না হয় পড়বি ‘খন, আমি জানতে চাইছিলাম, এই মাধ্যমিক... এর পরেও কি তুই আর পড়বি?’ ঠিক এইসব জায়গার জন্যই চন্দ্রবিন্দুর অনিন্দ্য, ভ্যাবাচাকা গানখানি লিখেছিলেন বোধহয়, আমার ক্লাস টেনের সংস্করণ সেই কথাই বলে। মাথা নাড়লুম সদর্থক। বীথিকা দিদিমণি হতাশ মাথা নাড়লেনঃ ‘আর কতো মাস্টার দিদিমণিদের ভাগ্যে যে কী লেখা আছে...’ বীথিকা দিদিমণির ঘর থেকে স্যার্রা কেটে গেলেই, পাশের ঘরে জীবনবাবু সার বসে, বসে না লিখে ঢুলছেন লেখাই ভালো, বসন্তের দুপুর, মাথার ওপর এক পয়েন্টে পাখা ঘুরছে, হিউমিডিটি সেসময় কম থাকতো, তো মুখ তুলে আমায় দেখতে পেয়েঃ ‘অ তুই। বল্, একটা কবিতা মুখস্থ বল্। সিলেবাসের কবিতা। পারবি?’ আমি উজ্জ্বল মাথা নেড়েঃ ‘খুব পারবো সার।’ জীবনবাবু সার, চোখের পাতার ব্যায়াম করে নিয়েঃ ‘তাহলে বল। দেরী করছিস কেন, বাবা?’ জীবনবাবু আমাদের মেক-শিফট বাংলার টীচার, সন্ধ্যা দিদিমণি অসুস্থ ছিলেন বলে ওরাল নিতে এসেছিলেন। আজ বুঝি — যখন জয়িতা অফিস থেকে বাড়ী ঢুকেই বলেঃ ‘ধ্যার। কপালে পুরো শনি। পাঁজিটা দেখ তো, কোন্ গ্রহের এখন সাড়ে সাতি চলছে। শালা, বালের অফিস, আর একটা অ্যাডিশনাল এনকোয়্যারি পুরে দিলো। এই নিয়ে তিন হপ্তায় চার খানা। চারটেই শালা অন্যদের কাজ। একজন ইলেকশন ডিউটিতে, একজন পাহাড়ে ঘুরতে গেছেন, আর একজন তো ফেডারেশন করে। তুই ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন, পাঁজিটা দেখতে বললুম না তোকে?’ শনি হলে শ্বেতবেড়েলা গাছের শিকড় বাহুতে বা কোমরে, আর সনি হলে অর্ডার ছাড়া বর্ডার ক্রস করতে এসো না, বিনা ভিসায় আমার বাসায় ঢুকতে চেও না, ভাবতে ভাবতে আমি ইন্টারনেটে বেণিমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা বের করি। জানি না, হাফ হলে গঞ্জিকা লেখা হতো কি না।
তো জীবনবাবু সারের কথা শুনে আমি চোখ বন্ধ করলামঃ প্রিল্যিউড মিউজিক ভেঁজে নিয়েই — এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি। বস্তুতঃ রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবিতাটা আমি সে সময় ঠিক বুঝেও বুঝি নি, তখন সব কিছু সোজা-সাপটা বোঝার বয়স — সুকান্ত কি রবীন্দ্রনাথকে খিস্তি মারলো? শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস... মানে তো রবীন্দ্রনাথের ফার সাইটের অভাব। ঐক্যতান কবিতায় কি রবীন্দ্রনাথ সুকান্ত’র এই বাণী লাগি কান পেতে ছিলেন? তাহলে তো বলতেই হয় যে, কানে গরম সীসে ঢুকছে। পরে-পশ্চাতে, কেউ আমায়, আমার প্রার্থনা শোনো তুমি ২৫শে বৈশাখ শুনিয়েছিলো। আমি তার ঢের পরে বুঝেছিলাম রবীন্দ্রনাথকে বুঝে-শুনে যদি কেউ বা কারা লাথি মেরে থাকে, তবে সেটা হচ্ছে, কৃত্তিবাসীদের কয়েকজন। যাঁদের মুখ চোখের সামনে ভাসছে, তাঁদের একজন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের ফিকশনাল প্রোজে লাথি... আচ্ছা চলো, মানা যায়, কিন্তু প্রবন্ধে বা চিঠিগুলোতেও? গানে যে লাথি নেই, সেটা ক্লীয়ার, কৃত্তিবাসীরা মাল টেনে লাট্টু হয়ে মধ্যরাত্রে কলকাতা শাসন করতে বেরোলে হা রে রে’র জায়গায় রবীন্দ্রনাথের গানই থাকতো। কিন্তু সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় মেধাবী ছিলেন, সাহিত্যিকদের মধ্যে গড়পড়তায় আমি যে জিনিসটার অভাব দেখি, সেই মেধা তাঁর ছিলো; কিন্তু তাহলে কি পড়েন নি, নাকি, সুবিধেজনক লাথি ছিলো সেগুলো? যে — আদার খাড়া না করে সে ভক্ত পুজোয় বসবে না! আর গদ্যে আদার কে — না, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষের কবিতার অমিতো আর দিবারাত্রির কাব্যের হেরম্ব অতো জ্ঞানের কথা যে বলে, যে যে লেয়ারেই অতো সব বলুক না কেন, কিন্তু — আমার সাদা মনে কাদা নেই, হচ্ছে যে, সেসব বলে কেন, তাদের উদ্দেশ্যটা কী?
সে তাদের উদ্দেশ্য যাই থাক, জীবনবাবু সার কিন্তু একটা অদ্ভূত জিনিস লক্ষ্য করছিলেন — একটা ছাত্র কবিতা মুখস্থ বলতে গিয়ে গানের তাল দিচ্ছে। বড়ো বড়ো করে চোখ চেয়ে তিনি পাকড়েও ফেললেন আমাকেঃ ‘তুই কীসের তাল দিচ্ছিস রে?’
আমার ততোক্ষণে জাল গোটানো হয়ে গিয়ে মাছ ডাঙায় তোলা হয়ে গেছেঃ ‘(মনে মনেঃ তাল দিচ্ছি না বাল, তোমায় গাল পাড়ছি। তালগোল পাকানোর আর জায়গা পাওনি তুমি! পৃথিবীতে এতো কিছু থাকতে তুমি কিনা আমায় কবিতা মুখস্থ বলতে বলছো! আমি ক্লাসে সবাইকে বাংলা ব্যাকরণের সাজেশন দিয়ে এলুম যে, একটা মেয়ে বাংলা ব্যাকরণের কী কী পড়বে — পুরুষ আসবেই। প্রত্যয় রেখে সন্ধি কোরো। সমাসবদ্ধ তো হতেই হবে, দ্বন্দ্বে, অপাদানে, আদানে, প্রদানে, যে কোনও অধিকরণে, অধিগ্রহণে, তা সে তুমি যতই হিজ হিজ হুজ হুজ, অর্থাৎ, বহুব্রীহি হতে চাও না কেন। বিভক্তি অনিবার্য তবুও সমাসিত তো হতেই হবে। তাই কারক হিসেবে তুমি কর্ম করে যেও। করণেই কোরো না হয়। কর্তার তাই ইচ্ছে। লিঙ্গ নিয়ে একটু নাড়াচাড়া কোরো, তাহলেই ধাতুও পড়বে) সে কি সার, আপনি জানেন না, এই কবিতাটাতে সুর করেছেন সলিল চৌধুরী।’
জীবনবাবু সার চশমাটা চোখের ওপর তুলে, অন্য সার হলে পিঠের ছাল-বাকল উঠে যেত, কিন্তু জীবনবাবু সার আমাদের সংস্কৃত পড়াতেন, আর তাছাড়া, ভারী শান্ত স্বভাবের ছিলেন। তার ওপরে দুবছর আগে, মানে যখন কিনা আমার আট কেলাস, সংস্কৃত ক্লাসের স্মৃতি নির্ঘাত তাঁর ছিলো, নরাভ্যাম মানে যে নর রূপ ভ্যাম্পায়ার হয়, এই সময়ে অন্ততঃ সেটাই হওয়া উচিত, রক্তাক্ত রূপক কর্মধারয় সমাস… এই ইনপুট আমিই জুগিয়েছিলাম। সমাস বস্তুটি বোধহয় নয় কেলাসে ইন্ট্রোডিউসড হতো, কিন্তু এই স্কুলের বাতই কুছ অলগ হ্যায়, অ্যাট লিষ্ট, থা। আট কেলাসের শেষবেলায়, এক নিউলি অ্যাডমিটেড ছেলের কাছ থেকে আসা এই ইনোভেটিভ সাজেশন শুনেই তিনি, জীবনবাবু সার, তাঁর ডিফেন্স মেকানিজম সাজিয়েছিলেনঃ ‘তোমাদের মিশনে বুঝি এইসব পড়ানো হতো?’
আমি সব সময়ই সপ্রতিভ উল্লুক থেকেছি, আছি, আজওঃ ‘হ্যাঁ সার। টেক্সটের সিন্থেসিসের ওপর মিশনে খুব জোর দেওয়া হয়।’
কিন্তু পৃথিবী গোল, ওরাল পরীক্ষার দিনই আমি সেটার প্রমাণ পাই, যখন জীবনবাবু সার বললেনঃ ‘তাহলে তো তোকে আর একটা কবিতা মুখস্থ বলতে হবে রে, মিশনের ছেলে।’ সে বছরে, আমারই কারণে, এই কবিতা মুখস্থ ব্যাপারটা একটু সিম্বলিক, দশ কেলাসে, প্রি-টেস্টের পরেই, তড়পা খানেক রেজাল্ট হাতে নিয়ে, ছেলে পিলেরা কেমন পড়ছে দেখতে এসেছিলেন, কনক দিদিমণি, আমাদের হেড মিস্ট্রেস। মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদ বধের একটা টুকরো আমাদের খেতে এবং হজম করতে দেওয়া হয়েছিলো। লজ্জার মাথা খেয়ে স্বীকারোক্তি দিয়ে যাই — আমি কবিতাটা হাফও পড়ে উঠতে পারি নি। যাই হোক, আমাদের ফার্স্ট বয় সারা স্কুল টাইম জুড়ে লাস্ট বেঞ্চে বসে উপন্যাস পড়ে। সেই তাকেও উঠে আসতে হয়েছিলো ফার্স্ট বেঞ্চে। আর তারপর শুরু হয়েছিলো মাদারির খেলা। বেঞ্চের একটা সাইড থেকে একজন দাঁড়ায়, খানিকটা মুখস্থ বলে, দিদিমণি থামিয়ে দেন, পরের জন সেখান থেকে ধরে, যে পারে না, তাকে কান ধরে দাঁড়াতে হয়, ছেলে-মেয়ে পার নেই। আমি লাস্ট বেঞ্চে বসে এই যুদ্ধু কিছুটা দেখার পর প্যাটার্নটা যেরকম এঁচে উঠতে পেরেছিলাম, তাতে করে বুঝেছিলাম, কপালে আজ বাদুড় বসেছে, কারণ লাট এলাকার আদ্ধেক পাবলিক কবিতাটাকে অরে (অথবা) ছাড়বে বলে হেঁকে দিয়েছে, এরা তো কবিতাটা কেমন দেখতে, সেটাই জানে না; আর সেই কারণেই কোনও প্যাটার্নই সার্টেন নয়। অতএব কেস জন্ডিস বুঝে থার্ড বেঞ্চে উঠে এসেছিলাম। কনক দিদিমণি আড়চোখে আমাকে একবার মেপে নিয়েঃ ‘উঠে এলি যে!’
আমি বসে পড়ে পাশের জনকে পাছা দুলিয়ে গুঁতোচ্ছিলাম তখন, মানুষ অনেকভাবেই টুইস্ট নাচ শিখতে পারেঃ ‘না দি’মণি… ইয়ে, ঠিক শুনতে পাচ্ছি না।’
কনক দিদিমণি খুব ইজিলি আমার অসুবিধাটা বুঝে নিয়ে মাথা নাড়লেন, আর ওদিকে পাঁচালি শুরু হয়ে গেলো। এবার প্যাটার্ন বুঝে নিতে খুব একটা অসুবিধে হয় নি যে, প্রথম দিকটাই আমাকে বলতে হবে। সেই কোন্ ছোটবেলায় শোনা গানের কলি, আমিও সুখের মতো ফুরিয়ে যাবো, কিংবা দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়… আমার পালা এলে সবাইকে চমকে দিয়ে, এমনকি নিজেকেও চমকে দিয়ে, আমি বেশ বলে যাচ্ছিলাম গড়গড় করে, হঠাতই হায় তাতঃ -তে গিয়ে দলা পাকিয়ে গেলো — হাই তাতঃ। হয়েছিলোটা কী — ওইর’মভাবেই গলাধঃকরণ করে রেখেছিলাম কবিতাটিকে, পাকস্থলীতে সে আর গিয়ে সেঁধোতে পারে নি। দ্য জাজমেন্ট ড্যে’র দিন ওই ক্রুড মালটাই বেরিয়ে এসেছিলো। আর বাস, আগুনে পেট্রোল পড়লো। চোখের প্রস্থচ্ছেদ মানে চোখের পাতা, ভুরু, চোখের কোণ যাকে অপাঙ্গ বলে, এখান দিয়ে চোখ মারা হয়, ইংরেজীতে একে উইঙ্কিং বলে — কনক দিদিমণি প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় আমার লাইফ সায়েন্সের পারফর্মেন্স মুখস্থ বলে যাচ্ছিলেন। চোখের প্রস্থচ্ছেদ, কিংবা লম্বছেদটা আমি যেভাবে এঁকেছিলাম। হাত দুটোও তাঁর, থেমে মোটেও ছিলো না, বরং এলোপাথাড়ি চলছিলো যথাস্থানে, অর্থাৎ আমার গালে, দু-একটা দলছুট হয়ে গলার দিকে, আর তারপর একসময় হাতে ব্যথা করলে সেকেন্ড বয়ের ব্যাগের ওপরে থাকা স্কেল — দুটো গালের রঙ পুরোদস্তুর শীতকালের সাহেবদের মতন হয়ে উঠছিলো।
জীবনবাবু সার সেই স্যাডিস্টিক প্লেজার তারিয়ে তারিয়ে খেয়ে জিজ্ঞাসা করলেনঃ ‘গানটা কে গেয়েছে রে, মিশনের ছেলে?’
আমি ভরাট হেসে বললামঃ ‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সার।’
এবার জীবনবাবু সারের চোখ সরুঃ ‘ক্যাসেটটা আছে তোর কাছে?’
আমি দাঁত বের করে বললামঃ ‘হ্যাঁ, তবে আমার কাছে এখন নেই। বাড়ীতে আছে।’
জীবনবাবু সার ঝুঁকে এলেনঃ ‘আমায় আজ ক্যাসেটটা দিতে পারবি, মিশনের ছেলে?’
আমি ফাঁকা শীটের দিকে তাকিয়েঃ ‘বদলে আপনি আমায় কতো দিচ্ছেন, সার? এখনও তো শীট সাদা!’
জীবনবাবু সার ঝপ করে চোখটা বন্ধ করেঃ ‘দেবো, ফুল মার্কসের চেয়ে দু নম্বর কম দেবো।’
আমি হেলে সাপের মতোই অনেকটা হেলে যাইঃ ‘তাহলে আমি সার... এক দৌড়ে গিয়ে ক্যাসেটটা নিয়ে আসি, সার?’
জীবনবাবু সার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেনঃ ‘তোর বাকী সবকটা ওরাল হয়ে গেছে?’
আমি ততোক্ষণে দরজার মুখেঃ ‘সার, প্রত্যেক ঘরের সামনে লাইন আছে। তাছাড়া একজন-দুজন এপার ওপার হলে কিছু হবে না। পরেরটায় তো অরূপবাবু সার, ফিজিক্যাল সায়েন্স। আর উল্টো দিকে আব্দুলবাবু সার, ভূগোল। আমি সার দৌড়ে যাবো, আর ছুট্টে আসবো।’
জীবনবাবু সার চেয়ারে শরীরটা ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ ‘তোর পরের জন কে আছে? তাকে ডেকে দিয়ে যা।’
ক্যাসেট নিয়ে ইস্কুলে ফিরে আমি অরূপবাবু সারের ঘর বন্ধ দেখে, সোজ্জা ঢুকে গেলাম আব্দুলবাবু সারের ঘরে। আব্দুলবাবু সার আরও শান্ত মানুষ। ঢুকেই বলে দেবো, সার, ওই মহাসাগরীয় স্রোতটা পরীক্ষার আগে আগে পড়বো বলে ঠিক করে রেখেছি। কথাটা বলা হয়ে গেলো, আর দেখলাম, আব্দুলবাবু সার নেই, চেয়ারে বসে হালদারবাবু সার। হালদারবাবু সারের ছেলে কামাল। আমাদের সঙ্গেই পড়ে। সার তেড়ে সিপিআই(এম) করেন, সুতরাং, আমার বাপের সাথে প্রচুর পীরিত। তা আমার বাপকে নিয়ে আমার কোনও ভয় নেই, এই হালদারবাবু সারকে টপকাতে পারলেই বাস। ওপারে আনারকলি দিদিমণি, জীবন বিজ্ঞান — আনন্দধারা ভুবনে বহে যায়, আর আনারকলি দিদিমণির কাছে স্নেহধারা। মাঝখানে প্রবালবাবু সার, শুনেছিলাম যেন এবারও ইংরেজীর ওরাল হবে না, কোন্ দুঃখে যে সার বাগান সাজিয়ে বসে আছেন... ‘কি রে, আজকাল কি কানে শুনতেও পাচ্ছিস না? স্রোত পড়িস নি, ভালো কথা, লিথুয়ানিয়ার রাজধানীর নাম জানিস না? খবরের কাগজও আজকাল আর পড়িস না, না? তা কী পড়িস? আনন্দলোক, আলোকপাত? নাহ, অলোকবাবুর সঙ্গে দেখা হলে বলতেই হচ্ছে।’
হালদারবাবু সারের চোখ জোড়া যেন আমার বুকের ভেতর ফুঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই লোকটা ক্লাসে পড়ানোর সময়, যে কোনও সাবজেক্ট উনি পড়াতেন, এবং দুর্দান্ত পড়াতেন, কী অসম্ভব উইট থাকতো তাঁর ডিসকোর্সের ছোট ছোট অ্যানেকডোটে, ফেসিলিটেশনে, কিন্তু পরীক্ষার দিন এলেই কেন যে কনস্টিপেশনের রোগীর মতো অ্যাটিটিউড ধরতেন... মরীয়া হয়ে জিজ্ঞাসা করলামঃ ‘কী হয়েছে সার, লিথুয়ানিয়ায়? আসলে সার গত দু দিন ধরে এই কবিতা মুখস্থ করার চক্করে পড়ে—’
হালদারবাবু সার খুব ব্যথিত হয়ে বললেনঃ ‘দেখ বাবা, তুই আমাদের ক্লাসের একমাত্র ছেলে যে ক্লাস এইটে কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়েছে। আর আজ তুই, দেখ, দেশটাকে বাঁচাতে সোভিয়েত রাশিয়া কী না করছে! আর আমেরিকানরা লিথুয়ানিয়ায় সৈন্য পাঠিয়ে দিয়েছে। উঃ পৃথিবীটার কোনও উন্নতি হতে দেবে না এরা।’
আমি খুব সমব্যথী হয়ে পড়িঃ ‘দেখেছেন সার, এত বড়ো ঘটনা, আর বাবা সকালে আমায় কিছু বলেই নি! এহ, মনটা খারাপ হয়ে গেলো সার। কী যে হচ্ছে এই পৃথিবীতে। এদিকে না জানলে শান্তিও পাচ্ছি না। আচ্ছা সার, টীচারস’ রুমে তো আনন্দবাজার রাখে, দেখে আসবো একটু?’
সার বললেনঃ ‘যাবি? যা তাহলে। সবটা পড়িস কিন্তু। খানিকটা পড়েই যেন আবার খেলার পাতা খুলে বসিস নে।’
ঘর থেকে বেরিয়েই দেখি কামাল। বললামঃ ‘যা না, যা। তোর বাপ স্রোত নিয়ে খাপ পেতে বসে আছে। সেঁকে দেবে আজ।’
‘কী বলছিস রে?’ পিছন থেকে সারের পাতলা গলা ভেসে আসে।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে বললামঃ ‘ইয়ে সার, লিথুয়ানিয়ায় স্রোতের মতো মার্কিন সৈন্য খাপ পেতে বসে আছে। তবে সোভিয়েত রাশিয়া ওদের সেঁকে দেবে।’
বলে নিয়েই, কামালকে চোখ মেরে, আর দাঁড়ায়! স্ট্রেইট খুলে থাকা দরজা দিয়ে অরূপবাবু স্যারের কাছেঃ ‘এন এ। না। সোডিয়াম মানেই হলো গিয়ে না। বলুন সার—’ অরূপবাবু সারের যে কোনও কথার ক্ষেত্রেই আমি কান পেতে রই, ভয়ানক আস্তে কথা বলেন। আমি ভালো করে কান পেতে বুঝলাম, উনি জানতে চাইছিলেন, আমি ভৌত বিজ্ঞানের একটাও চ্যাপ্টার পুরো পড়েছি কিনা। তাহলে তিনি প্রশ্ন করবেন। নইলে, দশে নয়। আমাকে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। প্যালপেবল গুড ইজ ওয়্যে বেটার দ্যান প্রব্যাবল গুড। বিকজ এনি গুড মাইট বিকাম ইলিউসিভ গুড অ্যাট এনি পয়েন্ট অফ টাইম। আর তাছাড়া মাত্র এক নম্বরের জন্য যদি খাটনি বাঁচে, তাহলে...
আনারকলি দিদিমণির ঘরে যেটা হয়েছিলো, সেটা আর লিখলাম না। লজ্জার একশেষ। আমাদের স্কুলের সবচেয়ে সুন্দরী দিদিমণি, বয়সে আমাদের সবচেয়ে কাছাকাছি তিনি একটাও প্রশ্ন করেন নি, সেই প্রথম বোধহয় একা পেয়েছিলেন আমায়, যাকে বলে বাগে পাওয়া, স্বীয় রক্তের অগ্রজার মতো পিঠে সস্নেহে হাত বোলাতে বোলাতে বলেছিলেনঃ নিউরন, হৃদপিন্ডে রক্ত সঞ্চালন, চোখের প্রস্থচ্ছেদ, নেফ্রন — এইধরনেরগুলো যেন পেনসিলে আঁকা প্র্যাকটিস করি আমি। বাকী প্রশ্নে অঙ্কন না চাইলেও লেখার পরে যেন পেন দিয়েই পরিচ্ছন্ন করে পরীক্ষার খাতায় এঁকে দিয়ে আসি। এগুলো বলার কারণ ছিলো — প্রি-টেস্টে লাইফ সায়েন্সে সেকেন্ড লোয়েস্ট মার্কস পেয়েছিলো মায়া গিরি — ৬২, আর, লোয়েস্ট আমি — ২৮।
দেখেছেন, নিজের কথা লিখবো না — ওয়াদা করেও ওয়াদা ভাঙলাম। অবশ্য ওয়াদা জিনিসটা তৈরীই হয় ভাঙার জন্য। কিন্তু তাই বলে, পাঁচ-পাঁচটা এক্সট্রা পাতা!
২।।
*** ঠিক করে রেখেছিলো, মানে আমার কাছে এসে যখন উদয় হলো, তখন আমি যা বুঝলাম, যে একটা প্রিডিটারমিন্ড চয়েসসেট সে তৈরী করেই এসেছে ইন দ্য সেন্স যে, সে... সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হবে। মানে ঝন্টুতে বসবে আর ক্র্যাক করে দেবে। তাই আর বায়োলজি নিয়ে বহে বেড়ানো কেন... মিছিমিছির ব্যাগেজ কোনও ক্রস তো আর নয় যে প্রত্যেক মানুষকে বহে বেড়াতে হবে। আর আমারও বায়োলজি ছিলো না, স্ট্যটিসটিক্স ছিলো জেনে তার আগ্রহ দ্বিগুণেরও বেশী হলো বোধহয় এই মর্মে যে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে সে, হাইলি এগোতেই পারে। তার ব্যক্তিগত কাঙ্ক্ষা এটি, আর মানুষের যে কোনও অ্যাস্পিরেশনকেই আমি সম্মান করি, ***- ও তার কোনও ব্যতিক্রম নয়।
কিন্তু আমি যে প্রশ্নটা প্রথমেই করে ফেললাম, সেটা হলোঃ ‘আর ইউ শিওর অ্যাবাউট ইট?’
*** মাথা ঝাঁকিয়ে দিলো সদর্থক।
আমি আবারঃ ‘হ্যাভ ইউ অলরেডি গট ইয়োরসেলফ অন বোর্ড?’
বিপন্ন বেচারী *** ‘না, মানে তা কী করে হবে? আমি ক্লাস ইলেভেনে এখনও অ্যাডমিশনই নিই নি। কী করেই বা নেবো। মাধ্যমিকের রেজাল্টই তো বেরোয় নি এখনো।’
অনেককিছু বলার ছিলো আমার এখানে, সামলে নিলাম, কেননা ১৯৯০-৯২-এর এগারো-বারো আর ২০২৬-২৮-এর এগারো-বারো — ফারাক বিস্তর। আমি তো মাধ্যমিক দেওয়ার পর খান পঞ্চাশেক সিনেমা দেখেছিলাম হলে গিয়ে, যার মধ্যে ৯৯% ছিলো হিন্দি বই (সিনেমা নয় সেগুলো, এখন সেটা বুঝি), যার বিন্দু বিসর্গও আমি বুঝি নি, বরং সিনেমাহলে ঢুকে আমি বুঝতে পারতাম, আমি হিন্দি সিনেমা বুঝে দেখার চাইতে সিগারেট ভালো দেখি-বুঝি। আর সেই সময়টায় সিগারেট ছেড়ে বিড়ি ধরে লাল সুতো-কালো সুতো’র তফাৎ বুঝছিলাম (সবই কী আর আমি তফাৎ বুঝি না মা?)। আর বাবা সেটা জানতে পেরে, আমিই বলে দিয়েছিলাম বাবাকেঃ ‘ছ্যাঃ ছ্যাঃ, তুই আমার মান সম্মান ডোবাবি দেখছি। তুই... তুই বিড়ি খাস? আর আমি কিনা জীবনে একবার বিড়ি খেয়ে আর খেতেই পারলাম না! কেন, উইলস ফিল্টার বুঝি তেতো লাগছে?’
যাই হোক, *** এটা রিয়েলাইজ করতে বোধহয় পারলো যে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং যদি দিল্লিতে থাকে, তবে সে থাকে কলকাতাতেই। আমার শহর। তারও শহর। বহোত দূরে আছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং। আমি বললামঃ ‘দ্যাখ ***, আমি ধরে নিচ্ছি তুই খুব মন দিয়ে পড়বি আগামী দু বছর। অনেক আপস অ্যান্ড ডাউনস আসবে এই দু বছরে তোর জীবনে। তবুও... তবুও আমি ধরে নিছি যে, খুব মন দিয়ে পড়ে তুই জয়েন্ট ক্র্যাক করার এফিশিয়েন্সী গ্যাদার করে উঠতে পারবি। বাট ম্যে আই মেক আ সাজেশন?’
*** নড়েচড়ে বসলোঃ ‘হ্যাঁ বলো।’
আমি সিগারেট ধরালাম। ধরাতেই হলো। এর কারণ দুটো — এক. আমাকে শব্দ খুঁজে নিয়ে নিয়ে কথা বলতে হচ্ছিলো। দুই. জয়িতা আমাকে দ্বিতীয় দফার চায়ের পেয়ালা দিয়ে গিয়েছিলো। নচেৎ সিগারেট ধরানো, সেটাও আবার একজন আন্ডার এইট্টিনের সামনে, যে কিনা নন-স্মোকার — দুটো অপরাধ। একটা তো সবাই জানেন, দ্বিতীয়টা হলো, এভাবেও একজন চাইল্ডকে এনটাইস করা যায়। জুভেনাইল জাষ্টিস অ্যাক্টের ৭৪ – ৮৯ ধারার মধ্যে শিশুর বিরুদ্ধে যে যে অপরাধের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে এটা পড়ে না ঠিকই, কিন্তু, নিকোটিনাইজড স্টাফ কোনও শিশুকে বিক্রি বা কোনও শিশুকে দিয়ে ভেন্ডিং করানো যদি পানিশিয়েবল অফেন্স হয়, তাহলে একজন শিশুর সামনে সিগারেট খাওয়াটাও ইমপ্লীসিট ক্রাইম বটে। সেটা সে যতই আমার নিজের ঘর হোক না কেন। তবুও দু-একটা অপরাধ না করলে ক্ষমা চাইবারও তো জায়গা থাকবে না ওপরে গিয়ে — তাই না?
*** -এর দিকে তাকিয়ে থাকলাম খানিকক্ষণ, আর সিগারেট চায়ের পরে প্রথম কয়েকটা পাফেই মোহময়ী। তারপর তার আর ভ্যালু আমার কাছে বিশেষ থাকে না — ইউজড কন্ডোমের মতো, অ্যানালজিটা একটু বেশী হয়ে গেলো, না? — কমিয়ে দেওয়া যাক, ইউজড পলি-প্যাকের মতো ফেলে দেওয়া যায়। একটা সময়, নিজেকে গুছিয়ে উঠতে পারলে ***-কে বললামঃ ‘দ্যাখ, তোদের এডুকেশন সিষ্টেম আমার কাছে আননোন স্টাফ। আমি তোর বয়সে ছিলাম ১৯৯০ – ৯২ সেশনে। আর এটা ২০২৬ – ‘২৮। টু বি অনেস্ট, আই ডোন্ট রিয়েলি নো ইউ, অর ইয়োর অর্ব। সেম গোজ দ্য আদার ওয়ে। আমাদের সময় জয়েন্ট এন্ট্রান্স ছিলো, তোদের তো… তাও আমি এখনকার কথা জানি না, বাট আই রেকন, ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেডিকেল এন্ট্রান্স টেস্ট এখন বোধহয় আলাদা। আয়্যাম রাইট?’
*** মাথা নেড়ে আমাকে অ্যাকম্প্যানি করে। কিছু বলতেও যায়। কিন্তু আমিই তাকে থামিয়ে দিই, লিসনিং স্কিলের তোয়াক্কা না করে, কারণ আমার মনে হচ্ছিলো, আমার আরও কিছু, যাকে বলা যেতে পারে, অ্যান্সিলিয়ারি, বলার আছেঃ ‘ইউ সী ***, ইঞ্জিনিয়ারিং, টু বি মোর স্পেসিফিক, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং তোর স্বপ্ন। হয়তঃ তুই এটা ক্র্যাক করে দিবি। কিন্তু আমাদের সময় যেটা ছিলো, পরীক্ষায় বসো, পারফর্ম করো, অ্যান্ড গো গ্র্যাব আ গুড সিট — সেটা কিন্তু এখন আর নেই। এখন তোদের কাউন্সেলিং হয় না?
*** মাথা নেড়ে আবারও আমাকে অ্যাকম্প্যানি করে।
সিগারেট অনেকক্ষণ আগেই ফেলে দিয়েছি, একটা গুটখা চেবানোর জন্য প্রাণটা উসখুস করছিলো, কিন্তু নিজেকে থামালাম, *** জুভেনাইল, আইনি ভাষায় চাইল্ড, এর সামনে আমাকে আমার মতো চললে চলবে না। বললামঃ দ্যাখ ***, এই যে জে ই ই বা নিট- এ ক্র্যাক করার জন্য কাউন্সেলিং — এটা কিন্তু নোবল অ্যাপ্রোচ, বাট থিওরেটিক। কেন জানিস?
*** কিন্তু খুব ভালো লিসনার। হোস্টেল লাইফ ওকে শোনার বেশ স্কিল জুটিয়ে দিয়েছে দেখতে পেলাম। আমার সময় তো এসব কিছুই জোটে নি আমার বরাতেঃ ‘প্রতিটা জিনিস যখন কোয়ান্টিটেভ ভ্যালুর সঙ্গে কোয়ালিটেটিভলি অ্যাপ্রাইজড হয়, তার জঁর-ই আলাদা। কিন্তু লেট’স কল ইট ইভেনচুয়াল যে, আমাদের দেশে কোয়ালিটেটিভ অ্যাপ্রাইজাল খুব অনেস্টলি করা হয় না। আর এটাই ম্যেনিপ্যুলেশনের প্রথম ধাপ; আমরা এভাবেই প্রত্যেক জিনিসকে, প্রত্যেক মানুষকে ম্যানুভার করতে শিখি। ম্যেনিপ্যুলেশন আর ম্যানুভারিং — এই দুটো শব্দকেই তুই খারাপ সেন্সেই, আই মিন, নেগেটিভ মেজারে নিস, কেমন? কোয়ালিটেটিভ অ্যানালিসিস ইটসেলফ ইজ আ কোয়ালিটেটিভ কল — কিন্তু, এটা আমাদের দেশে গড়পড়তা জল মেশানোর কাজ; নিজের বক্তব্যকে খুব স্মার্টলি এবং ক্ল্যান্ডেন্সটাইনলি, মানে, চোরাগোপ্তাভাবে গেঁথে দেওয়ার মাধ্যম। দিস ইজ স্যাড, ড্যুড, বাট ট্রু। এখন তোর হাতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ছ’খানা অপশন আছে। হোয়াট আই মিন টু স্যে ইজ — সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে নিজেকে এনরোলড করানোর জন্য তুই ছটা সুযোগ পাবি। দুটো এইচ এস দেওয়ার পর, আর দুটো, যদি নিয়ম পাল্টে গিয়ে না থাকে, তাহলে পরের দু বছরে দু’বার করে। কিন্তু আর ইউ শিওর যে এই ছটা সুযোগে তুই একটা ভালো ক্যাম্পাসে এন্ট্রি নিতে পারবি? আমি যেটা জানতে চাইছি, সেটা হলো, সবটাই কী তোর একার এবিলিটির, এক্সপার্টাইজের ডোমেইনে আছে? থিংক টোয়াইস, ড্যুড — থিংক ক্রিটিক্যালি, কীপিং দ্যাট ক্রীপি কোয়ালিটেটিভ অ্যাপ্রাইজাল, ইয়াহ, দ্যাট কাউন্সেলিং স্টাফ ইন ইয়োর মাইন্ড। পারবি তুই? তুই কি এতোটাই কনফিডেন্ট? যদি তাই হোস, তাহলে কম্পিউটার সায়েন্সই তোর বেস্ট অপশন।
***-কে কিছুটা মিয়োনো লাগে, ঢাকনা খুলে রাখা কৌটোতে মুড়ি যেমনঃ ‘তুমি কি আমার কাছ থেকে গ্যারান্টি চাইছো?’
আমি একটু অবাকই হইঃ ‘আমি? আমি কেন চাইতে যাবো? ইট’স ইয়োর লাইফ। দেয়ারফোর, ইট’স ইয়োর কল। আমাকে কেন গ্যারান্টি দিতে যাবি তুই? এটা তোর লাইফ — এটা তোর কেরিয়ার, তুই তোর জীবনে সফল হলে আমার কী, আর না হলেও বা আমার কী!’
লজ্জা পেয়ে যায় সে ছেলেঃ ‘নাহ, মানে আমি ঠিক তোমাকে মিন করতে চাই নি।’
আশ্বস্ত হই ও করি আমি অতঃপর, ওকেঃ ‘ওহ আই সী, সলিলকি।’
*** তাকায় আমার দিকে, পূর্ণচোখে। আমি বলিঃ ‘স্বগোতক্তি। নিজের সঙ্গে...
আমাকে সে থামায়ঃ ‘ওর ইংরেজীটা কী বললে, তুমি?’
আমি আরও একবার বলিঃ ‘সলিলকি।’
কয়েকবার নীরবে জিভ চলে তার। এভাবে আমি আমার দিদি (দিদিমা) আর মাম্মাম (ঠাকুমা)কে পান খেতে দেখেছি। দোখনো বাংলায় একে বলে — পাগলানো।
*** সরব হয়ঃ ‘হ্যাঁ, মানে, নিজেকে আমি কনফিডেন্ট ভাবতে পারি, কিন্তু গ্যারান্টি দিতে পারি না।’
‘তাহলে প্ল্যান বি?’ আমি মূহুর্ত দেরী করি নাঃ ‘সেকেন্ড অপশন কী তোর? অ্যাকাডেমিক্স?’
মাথা নাড়ে *** ‘নাহ্, ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই।‘
আমি অবাক হই ‘কেন? ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়, এমনটাই তো আমি জানি।’
*** বলেঃ ‘আমিও বইতে তাই পড়েছি, কিন্তু ওয়েস্ট বেঙ্গলের সাম্প্রতিক অবস্থা যা, আমি, আমরা আর ভরসা পাই না।’
আমি জানতে চাইঃ ‘এস্পেশ্যালি টীচারস’ স্ক্যামের পর থেকে। ইজন্ট ইট?’
হেসে ফেলে সে ছেলে। আমি জানতে চাইঃ ‘তাহলে ভাজ্য হলো, ভাজক হলো, ভাগফলও বোধহয় একটা বেরোলো, নাকি রে?’
সদর্থক মাথা নাড়ে ***। তারপর অস্ফূটে বলে ওঠেঃ ‘হ্যাঁ।’
আমি উত্তরমালা দেখতে চাইঃ ‘তাহলে? ভাগশেষ কী কিছু পড়ে আছে? তোর কাছে?’
*** বলে ফেলেঃ ‘মেডিকেল। কিন্তু আমি ডাক্তারী পড়তে চাই না, বিশ্বাস করো।’
আমি হেসে ফেলিঃ ‘আর্রে চিল ড্যুড, ভারতবর্ষে জন্মেছিস। চাই না বললে চলে নাকি রে! আ বেগার ক্যান্ট বি আ চুজার।’
***-কে দৃশ্যতই অসহায় লাগে। আমি বলিঃ ‘শোন ***, ডাক্তার মানেই কিন্তু রোগীর বুকে স্টেথো বসানো নয়।’
*** একটু নড়ে-চড়ে বসে। আমি আবারও বলিঃ ‘কিংবা লোকের শরীরে ছুরি কাঁচি চালানোও নয়।’
*** অস্ফূটে জিজ্ঞাসা করেঃ ‘তাহলে?’
আমি হেসে ফেলিঃ ‘তুই তো দেখছি আমাকে কেরিয়ার কাউন্সেলর ঠাউরে ফেললি রে, ***। ভালো কথা, তোর কোনও দিন রক্ত পরীক্ষা হয়েছে।’
এই প্রসঙ্গ সে ছেলে একদমই আশা করে নি, বোঝাই যায়। বেশ বিহ্বল লাগে তার স্বরঃ ‘হ্যাঁ, এই তো কিছু দিন আগেই জ্বরে পড়েছিলাম। জ্বর ছাড়ছিলো না, বাবা-মা গিয়ে মিশন থেকে তুলে আনলো। তখন হয়েছিলো।’
আমি জানতে চাইঃ ‘তোর ল্যাব রিপোর্টে আন্ডার সাইন্ড কে ছিলো? মানে, সই কার ছিলো?’
*** ঝটিতি উত্তর করেঃ ‘অন্য কোনো ডাক্তারের। তবে আমি তাকে চিনি না। আমার ব্লাড টেস্ট করতে বলেছিলো অন্য ডাক্তার। তার চেম্বার সোনারপুরে।’
আমি দাঁড়ি টানিঃ ‘দেয়ার ইউ গো, বয়। সোনারপুরের ডাক্তার চেম্বার করে, আর ল্যাবের রিপোর্টে যে ডাক্তার সই করেছে, সে চেম্বার করতেও পারে, নাও পারে। ল্যাব তাকে ল্যাব রিপোর্ট পেরুজ, আই মিন, খুঁটিয়ে দেখার জন্য, অ্যাট লিষ্ট, থিওরিটিক্যালি, তাকে টাকা দেয়। এবার সে বাড়তি টাকার জন্য চেম্বার খুলে পেশেন্টের বুকে নল ঠেকাবে, নাকি, ঠেকাবে না — সেটা তার সিদ্ধান্ত।’
***-এর চোখে ঝিলিক। সে হেসে ফেলেঃ ‘এটা কিন্তু মন্দ নয়।’
আমি কড়ারে আসার চেষ্টা করিঃ ‘কিন্তু এইরকম ২-৩ টে ল্যাবে এনগেজড হতে গেলে তো এম বি বি এস আর প্যাথলজি নিয়ে এম ডি করতে হবে। তুই বাংলাদেশের হলে বলতাম, প্যাথলজি নিয়ে এম ডি করা লাগবে।’
সে রাজী হয়ে যায়ঃ ‘বুঝেছি। বেশ বায়োলজিই নেবো না হয়, থাক কম্পিউটার সায়েন্স।’
আমি মাথা নাড়িঃ ‘দ্যাট’স অ্যান এক্সিকিউটিভ ডিসিশন আই মাস্ট স্যে। সিগারেট? উপস্, সরি।’
*** একটা পরিপূর্ণ হাসি দেয়ঃ ‘না, না, তুমি খাও না।’
আমিও হাসিঃ ‘এখন থাক, পরে খাবো ‘খন। তাহলে? একটা কনক্লুশনে আসা গেলো, কী বল্?’
***-এর বিপন্নতা কিন্তু কমে নিঃ ‘কিন্তু আমি মাস্টারমশাই-আন্টি কাউকে পাচ্ছি না। আমি তো চিনিও না এদিকের কাউকে বিশেষ।’
আমিও দিশেহারা হয়ে পড়ি এবারঃ ‘এই সেরেছে। এটা তো আমার কম্মোই নয়। আমি তো লেখাপড়া থেকে অনেক দূরে থাকি রে। একা থাকি। আর দূরেও থাকি।’
*** হেসে ফেলেঃ ‘শুধু ইংরেজীর জন্য একজনকে মা পেয়েছে। তুমি পিন্টু স্যারকে চেনো? এরকম কোনও নাম শুনেছো?’
আমি দিশেহারাই থাকিঃ ‘না তো, সোনারপুরের এদিকে?’
*** আমায় জানান দেয়ঃ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। কাছেই গো। ওই যে নতুন কো-অপারেটিভ স্টোরটা যেখানে আছে না —
আমি হেসে ফেলিঃ ‘তুই পুরোনো কো-অপারেটিভ স্টোর চিনিস?’
***-ও হেসে ফেলেঃ ‘নাহ্, সবাই বলে কি না…
আমি তাকে জানাইঃ ‘এখান থেকে হর্ত্তুকিতলা যাচ্ছিস। নহবৎখানার ট্রান্সফর্মা — ফেলে গেলি, কাঠচেরাই হতো আগে — ফেলে গেলি…
*** সচকিত জিজ্ঞাসা করেঃ ‘অলোকদাদু, মানে, তোমার বাবার আসল বাড়ী যেখানে?’
আমি মাথা নাড়িঃ ‘আমার বাবা-কাকা-জ্যাঠাদের আসল বাড়ী ঢোকার মুখের রাস্তার পরের বাড়ীটাতেই ছিলো পুরোনো কো-অপারেটিভ স্টোর। হ্যাঁ, কী বলছিলি যেন, হ্যাঁ, নতুন কো-অপারেটিভ স্টোর, তারপর?’
বিশ্বস্ত ইনফর্মারের মতো *** আমায় বলে যেতে থাকে ‘উল্টোদিকে একটা রাস্তা ঢুকে যাচ্ছে। ওই যে গো, যে দিকে বর্ষায় খুব জল জমে না?’
আমি এবার বুঝে যাইঃ ‘আই নো হিম, আই মিন, আই ডোন্ট নো হিম ডায়রেক্টলি, বাট ইয়াহ, আয়্যাভ হার্ড অ্যাবাউট হিম। ইয়েপ, হি হ্যাজ আ গুড রেপুটেশন অ্যাজ অ্যান ইংলিশ টিউটর। হি ইজ আ রিয়েল গুড ওয়ান। তুই অবশ্যই তার কাছে পড়তে পারিস। তোর ইংরেজী নিয়ে তেমন ওরিড হওয়ার আর কোনও প্রয়োজন নেই।’
***-কে সহর্ষ হয়েও বিমর্ষ দেখিঃ ‘কিন্তু পিন্টু স্যার রাজী হচ্ছেন না। ইতঃস্তত করছেন।’
আমি অবাক হই সামান্যঃ ‘কেন রে? ছাত্র হিসেবে তোকে ওঁর মনে ধরে নি নাকি?’
ছেলেটাকে ঈষৎ বিষণ্ণ শোনায়ঃ ‘ঠিক আমার জন্য নয়। রিয়ার জন্য।’
আমার বেশ বোম্বাচাক লাগে ‘বেগ ইয়োর পার্ডন, বয়। রিয়া? হু ইজ শী বায় দ্য ওয়ে? হচ্ছিলো তোর আর পিন্টু স্যারের কথা — এর মধ্যে রিয়া কোত্থেকে এলো?’
*** মুচকি হাসেঃ রিয়া আমার মায়ের বন্ধুর মেয়ে। আমাদের ব্যাচেই পড়ে। কাকিমা, মানে, রিয়ার মা-ই পিন্টু স্যারের খোঁজ এনেছেন। আমরা হয়তঃ একসঙ্গেই পড়বো।’
আমিও মুচকি হাসিঃ ‘দ্যাট’স নাইস। পড়তে যাওয়ার আগেই সহপাঠি পেয়ে যাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। আর তোর তো দেখছি, মাথার ওপর কপাল, সহপাঠির জায়গায় সহপাঠিনী।’
সে ছেলে কিন্তু কোর্ট ছেড়ে বেরোয় নিঃ ‘কিন্তু ওর জন্যই বোধহয় পিন্টু স্যার এক পা এগোচ্ছেন, তো দু পা পিছোচ্ছেন।’
আমি জানতে চাইলামঃ ‘আর সেটা তিনি করছেন কেন?’
*** ব্যাখ্যায় আসেঃ ‘আসলে ওদিকটায় তো বর্ষায় খুব জল জমে…
আমি আক্ষরিক বিস্মিত হইঃ ‘জল জমে তো জল জমে। তার সঙ্গে পড়ানোর বা না পড়ানোর… আয়্যাম সরি ড্যুড, আই জাষ্ট ক্যান্ট ফিগার ইট আউট।’
*** আরও ইলাস্ট্রেট করতে বাধ্য হয়ঃ ‘নাহ, মানে, নোংরা জল ডিঙিয়ে পড়তে যেতে হবে। আর গোটা বর্ষাকাল জুড়েই ওদিকে জল জমে থাকে। তাই পিন্টু স্যার বলছিলেন…
আমি এবার ভীষণ অবাক হয়ে যাইঃ ‘তা বর্ষাকালে তো পচা জল পাড়িয়ে পড়তে যাওয়ার মজাই আলাদা। তোর রিয়া বুঝি খুব সুন্দরী, খুব ফর্সা?’
*** লাল হয়ে যায়ঃ ‘তা বলতে পারবো না।’
আমি ফের অবাক বনে যাইঃ ‘একটু আগে বললি না, রিয়া তোর মা’র বন্ধুর মেয়ে, তা দেখিস নি তাকে কোনও দিন?’
*** সামান্য বিস্রস্তঃ ‘না, না, দেখবো না কেন, দেখেছি। অনেকবার দেখেছি।’
আমি জানতে চাইঃ ‘এক্সকিউজ মী মাই বয়, বাট ইজ দিস পোলাইটনেস জাষ্ট বিকজ ইউ’ভ লিভড ইন আ হোস্টেল?’
*** চুপ করে যায়। একটা সময় বলেঃ ‘আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।’
আমি বাংলায় কাস্টোমাইজড হতে চাইলামঃ ‘একটা মেয়ে ডানাকাটা পরীর মতো সুন্দরী, নাকি নয়, এটা না বলাটা বুঝি হোস্টেল লাইফ থেকে শেখা ভদ্রতা?’
হেসে ফেলে ছেলেঃ ‘না, না, ভালো দেখতে। মিষ্টি দেখতে ওকে।’
আমিও হেসে ফেলিঃ ‘কেস ক্লোজড। তাহলে বোধহয় পিন্টু স্যার রাজী হচ্ছেন না রিয়ার কথা ভেবেই।’
*** আনমনা বলেঃ ‘সেরকম তো কিছু বলেন নি।’
আমি বললামঃ ‘ওয়েল, দ্যাট মাইট বি পার্ট অফ হিজ সেন্স অফ কার্টসি। ভালো কথা, প্রেম-ট্রেম করিস?’
সজোরে মাথা নাড়ে সে ছেলেঃ ‘না, না। আমি তো বয়েজ হোস্টেলে পড়ে এলাম। তুমি তো জানো।’
আমি নিজের জায়গা ছাড়ি নাঃ ‘স্টিল, এনি ক্রাশ?’
*** আরও জোরে মাথা নাড়েঃ ‘না, না। আমি খেলতে ভালোবাসি।’
আমি অবাক হয়ে পড়িঃ ‘তার সঙ্গে প্রেমের কী সম্পর্ক? খেলা কে না ভালোবাসে? ওহ্, তুই তো হোস্টেলে ছিলিস, ভুলেই গিয়েছিলাম। তোর সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন? তুই গ্যে?’
*** আমার থেকে ঢের বেশী অবাক হয়ঃ ‘এহ্, না, না, এসব তুমি কী বলছো?’
‘আর ইউ কাইন্ড অফ অ্যান্টি-লাভ?’ সামান্য চোখ সরু করে জিজ্ঞাসা করি আমি।
*** আবারও চওড়া হাসেঃ ‘না, না, তা কেন হবো। আমি তো আমার বাবা-মাকে খুব ভালোবাসি।’
আমি আবারও জানতে চাইঃ ‘আর গ্যেও নোস, রাইট?’
*** এবার আমায় রিজেক্টই করেঃ ‘ধ্যেত, কী যে বলছো তুমি তখন থেকে!’
আমি বললামঃ ‘***, গিম্মি আ ব্রেক। আই’ল বি ব্যাক ইন ম্যাগি মিনিটস।’
৩।।
ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। মা’র ঘরের দরজা ঠেলে গিয়ে দেখলাম, জয়িতা মাকে খেতে দিয়েছে। দরজা থেকেই মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মা’র কোনও কষ্ট হচ্ছে কি না। মা খেতে খেতে মাথা নেড়ে আমায় আশ্বস্ত করলো। জয়িতা জানালো, মা’র অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৯। হার্ট রেট ৮৮। আমি মা’র ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে সিগারেট টানতে লাগলাম তাড়াতাড়ি। ***-কে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না। আমার তো সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছে জাগে মাত্র। কয়েক টান টানার পর সে ইচ্ছে চলেও যায়। সিগারেটকে বাড়তি বলে মনে হয় তখন।
ফিরে এসে, হটসীট, আই মিন, নিজের ডেস্কটপের সামনের গেমিং চেয়ারে বসেই বলে উঠিঃ ‘বাবা-মাকে ভালোবাসা, আর একটা মেয়ে, অবশ্যই তাকে তোর ভালো লাগতে হবে। কিন্তু একবার প্রেমে পড়ে গেলে সেটা কী আলাদা, ***?’
*** চুপ করে থাকে। আমি জোর করিঃ ‘নো, টেল মী ড্যুড। লেম্মি ইনটু ইয়োর ওয়র্ল্ড, প্লীজ। ইজ দেয়ার এনি ডিফারেন্স?’
খুব আস্তে, প্রায় শোনাই গেলো না, কিন্তু *** বলে দেয়ঃ ‘না।’
আমি যথেষ্ট বিস্মিত সুর রাখিঃ ‘হোয়াই আর ইউ সো শাই, ল্যাড? ইউ নো… সী… ওয়েল, ডু ইউ রিড নিউজপেপারস?
সে ছেলে মাথা নাড়ছে দেখে আমি বলে যেতে থাকিঃ ‘দেখ, আজকের পৃথিবীটাকে — ইন্ডিয়া ইজ গন্না ফ্লারিশ, কী বুমিং ইকোনমি আমাদের! ওদিকে এ ধমকাচ্ছে ভূগোল থেকে মুছে দেবো, ইতিহাসে পুরে দেবো, সে বলছে, পৃথিবীতে এখন একজন ডিক্টেটরের দরকার। আর একজন বলছে, আমাদের দ্বীপের দিকে হাত বাড়ালে ভাতে মেরে দেবো… মরছে কারা, মরবে কারা? উই পিপল। উই দ্য কমোনারস উইল সাফার। ইতিহাস সাক্ষী এসবের। হিটলার জাদু করলো, আর মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের প্রাণ গেলো। জাপান ফুঁসে উঠলো, তাকে থামাতে আমেরিকা অ্যাটম বোম্ব ফেললো, মরেছিলো কারা? সাধারণ মানুষ। এর বিরুদ্ধে লড়তে গেলে আমাদের হাতে অস্ত্র কী? কী আছে বল আমাদের হাতে? আমেরিকায়, ইউরোপে আর্মস অ্যাক্ট অনেক লুজ, সেখানে অনেকের ঘরেই আগ্নেয়াস্ত্র আছে। আর আমাদের কী আছে — কিচেন নাইফ ছাড়া? বল্, তুই-ই বল আমাকে।’
*** মাথা নীচু করে শুনছিলো, মুখ তুলে বললো, খুব বিমর্ষ গলায় বললোঃ ‘আমাদের কিছুই নেই। আমাদের বাড়ীতে তো কিচেন নাইফও নেই। মা বঁটিতে মাছ কাটে। বাবা মাংস কাটিয়ে আনে। বাজার থেকে।’
আমি বললামঃ ‘আর তার জন্য তোকে এতো মর্বিড লাগছে! আর্রে বোকা, আমাদের কাছে অনেক এফেক্টিভ, অনেক ধারালো অস্ত্র আছে।’
***-কে সামান্য বিপর্যস্ত লাগেঃ ‘আমাদের কী আছে?’
আমি বলে যেতে থাকিঃ ‘কেন, ভালোবাসা আর শান্তি। দ্যাখ, তুই শুনিস নি, কিন্তু আমি তোকে শোনাবো… আমেরিকা যখন কার্পেট বোম্বিং করছিলো ভিয়েতনামের ওপর, তখন আমেরিকা থেকেই জন লেনন গেয়ে উঠেছিলেনঃ গিভ পিস আ চ্যান্স। গোটা আমেরিকা জন লেননের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠেছিলোঃ ‘অল উই আর স্যেয়িং ইজ গিভ পিস আ চ্যান্স।’ প্রেসিডেন্ট নিক্সন বাধ্য হয়েছিলো যুদ্ধ থামাতে। তোর বাড়ীতে কিচেন নাইফ নেই — অ্যান্ড ইউ শ্যুড বি প্রাউড অফ ইট।’
আমার স্বর চড়ে গিয়েছিলো। আর *** খুব আস্তে আস্তে নীচু গলায় বলে উঠলোঃ ‘আমি গানটা শুনেছি। মানে, আমার মুখস্থ। আমাদের মিশনে এই গানটা খুব গাওয়া হতো।’
আমি আনন্দে বেজে উঠিঃ ‘ওহ মাই মাই, তুই জানিস গানটা! তাহলে নিশ্চয়ই রুবি ডোন্ট টেক ইয়োর লাভ টু টাউন গানটাও তোর শোনা?’
*** নঞর্থক মাথা নাড়েঃ ‘না, এটা শুনি নি। কার গাওয়া?’
আমি উত্তর করিঃ ‘কেন্নি রজার্সের।’
*** জিজ্ঞাসা করেঃ ‘তাই? আমি কেন্নি রজার্সের নাম শুনেছি। তবে তার গান শুনি নি কোনও দিন।’
আমি চওড়া হয়ে যাইঃ ‘আর্রে, এই গানটা নিয়ে আমার যা ভেগ আইডিয়া ছিলো, তোকে কী বলবো। আমি যখন প্রথম প্রথম শুনতাম, ভাবতাম এটাও আমেরিকা-ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষিতে গাওয়া গান। কিন্তু একটা জায়গায় বুঝলি, আমার কাঁটা লাগা হতো। গানটার লিরিকে একটা জায়গায় ‘ক্রেজি এশিয়ান ওয়ার’ কথাটা বলা আছে। কিন্তু আমেরিকা তো এশিয়ার দেশ নয়। একদিন ডেস্কটপে গানটা চালিয়েছি, দেখি, গানটার কম্পোজার মেল টিলিস। আমি তো জানতাম এই গানের কম্পোজার কেন্নি রজার্স। তো, এই মেল টিলিসটা আবার কে রে বাবা? গুগল করে করে জানলাম, এই গানটা আদৌ আমেরিকা-ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষিতে গাওয়া গানই নয়, এই গান তৈরী হয়েছিলো দক্ষিণ কোরিয়া-উত্তর কোরিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষিতে। দক্ষিণ কোরিয়া আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ লাগলো, অ্যামমম — পঞ্চাশের দশকের কথা এটা, আমি ভুলও হতে পারি, টাইমটা তোকে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, আসলে অনেক দিন আগে এসব পড়েছিলাম তো, এখনও পারা যেত, গুগল করলেই দেখে নেওয়া যেত সঠিক সময়টা, ওই যুদ্ধের আর কি, কিন্তু থাক গে এখন, এখন আমরা আড্ডা মারছি…’ দীর্ঘশ্বাস ফেলি আমি। ‘যুদ্ধ যখন বাঁধলো দুটো দেশের মধ্যে, তিন বছর বা তার কিছু সময় ধরে চলেছিলো সেটা, অনেকটা ওই আগেকার দিনের হিন্দুদের মড়া পোড়ানোর মতো রে, এখন তো ওদের বা আমাদের — হোয়াটএভার ইউ’ড লাইক টু কল ইট, ইলেক্ট্রিক ক্রিমেট্যর, আই মিন, বৈদ্যুতিক চুল্লী এসে গেছে, কিন্তু আগেকার দিনে ওই ম্যানুয়াল চিতায় মড়া পোড়ানোর সময় একবার করে চিতার আগুন নিভে আসতো, তখন আবার তাকে খুঁচিয়ে দিয়ে জাগিয়ে দিতে হতো, ইউ নো দ্য ওয়র্ড আঙরা?
*** কলকলিয়ে ওঠেঃ ‘হ্যাঁ, আগুন যখন লাল হয়ে ভিতরে ধিকিধিকি জ্বলে…
আমি কিউ পেয়ে যাইঃ ‘দেন ইউ নো ইট। সাব্বাস, ***। ওয়েল, ডু ইউ নো দ্যাট কাঁহাবাত? দ্যে স্যে, যে কাঠ খায়, সে আঙরা হাগে। — ডু ইউ নো ইট টু?’
হেসে ফেলে ***, বোধহয় হাগা শব্দটার জন্যঃ ‘হ্যাঁ, শুনেছি এটা আমি।’
এই প্রবাদটা মনে রাখিসঃ ‘আগামী কয়েক বছরে… আগামী কয়েক বছরে কেন, গোটা বেঁচে থাকা জুড়ে তোর এটা লাগবে। এটার দায় সরাসরি বইবার বয়সে তুই এবার এসে গেলি, ইট… ইট’স আনফরচুনেট ফর ইউ। ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। বা, ভাবিতে উচিত ছিলো প্রতিজ্ঞা যখন। এনিওয়ে, তখন আঙরা হয়ে আসা আগুনকে খুঁচিয়ে দিতে হতো, চিতায় ঘি, মাখন ঢালার ক্ষমতা কোনও দিনই অ্যাভারেজ বাঙালীর ছিলো না। তখন বড়ো জোর, ডালডা ঢালা হতো, আমি বেশ কয়েকবার কেরোসিনও ঢেলে দিতে দেখেছি গোটা ব্যাপারটাকে ক্যুইকলি র্যাপ আপ করার জন্য। লাস্ট রাইটস… অ্যান্ড দ্যাট টু, স্বস্তার নীল কেরোসিন, আর এখন তো আর ইলেক্ট্রিক চুল্লীর সাড়ে আটশো-নশো ডিগ্রীতে মানুষ বেশ আমোদে-আহ্লাদে পুড়ে যায়। এনিওয়ে, যে কোনও লম্বা যুদ্ধই ওই আগুন-আঙরার মতো, বুঝলি, প্রথমে ধকধক করে জ্বলে ওঠে, তখন রিসোর্স প্রচুর, লং রানে আঙরা হয়, কেননা, দেশের মানুষের পেট শুকিয়ে আমসি হচ্ছে, তখন তাকে খুঁচিয়ে দিতে হয় — বাইরের দেশের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে, লোকের ইমোশনে সুড়সুড়ি দিয়ে। যুদ্ধ নিয়ে কেউ যদি আর অ্যান্ড ডি করে, এসবের ব্যাখ্যা সে দেবে, দিতে পারবে। তা দক্ষিণ কোরিয়া আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ লাগলো যখন, তখন তো উত্তর কোরিয়া, অ্যাজ ইট হ্যাড বিন আ কম্যুনিষ্ট কান্ট্রি, ফটাক্সে চিন আর রাশিয়াকে পাশে পেয়ে গেলো। আর তখন তার তেবরই আলাদা। দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তিধর দুটো দেশের একটা তাদের পাশে, ঘ্যাম বাড়বে না! তোর কী মনে হয়? ওদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ক্যাপিটালিস্ট দেশ, তারা ওয়ারফেয়ারে মাথা না ঘামিয়ে নিজেদের ইকোনমির ডেভেলপমেন্ট নিয়ে বেশী মাথা ঘামিয়েছে…’
শ্বাস নেওয়ার জন্য থেমে যাই আমি। দেখি, *** আমার দিকে বেশ উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে, অতএব আবারও শুরু করতে হলোঃ ‘প্রথমে তারা বিস্তর ক্যাল খেলো বুঝলি, এই অভিষেক শর্মার মতো টাঙিয়ে টাঙিয়ে ক্যালালো দক্ষিণ কোরিয়াকে উত্তর কোরিয়া। তারপর যা হয়, আগে তো দেশ বল্, মানুষ বল্, দেশের ন্যাচারাল রিসোর্স বল্ — আগে তো এগুলো বাঁচবে, সারভাইভ করবে, তবে না ডেভেলপমেন্ট। তাই দক্ষিণ কোরিয়াকে পৃথিবীর কাছে হাত পাততেই হলো। আর ঠিক তখনই নড়ে চড়ে বসলো ইউ এন।
*** অস্ফূটে জানতে চাইলোঃ ইউ এন মানে? ওই দেশগুলোর…
আমি বললামঃ ‘ইয়াহ্ ***, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ অর্থাৎ সম্মিলিত রাস্ট্রপুঞ্জ। তো, ইউ এন তখন সেনা পাঠালো দক্ষিণ কোরিয়ায়, বাট ইট ওয়জ আ কন্ডিশনাল হ্যান্ড হোল্ডিং সাপোর্ট যে, যে সেনা বাহিনী যাচ্ছে তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে ডিফেন্ড করবে। ওদেরকে দিয়ে অ্যাটাক-ফ্যাটাক করানো চলবে না। অন্ততঃ খাতায়-কলমে এটাই চুক্তির মূল শর্ত হয়ে রইলো।’
*** দেখলাম, যুদ্ধের গল্প শুনতে ভালোবাসে। তাও কিনা আবার ব্যাক স্টেজ স্টোরি, আর সেই বিটিএস-টাও বলছে কিনা একজন অ্যামেচারে। সে ছেলে জিজ্ঞাসাই করে ফেললোঃ ‘তারপর?’
দম নিয়ে আবারও শুরু করলামঃ ‘দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে তখন এটাই অনেক ছিলো। উত্তর কোরিয়ার লাগাতার আক্রমণের সামনে একটা ছাতা তো মিললো, বৃষ্টিতে ভিজে নিউমুনিয়া হয়ে মরে তো আর যেতে হলো না ইন্সট্যান্ট এফেক্টে। তারা ইউ এন-এর শর্তে বিনা দ্বিধায় রাজী হয়ে গেলো। কিন্তু রিয়েলিটির পিকচার দেখা গেলো, একটু আলাদা, বুঝলি ***?’
*** দেখলাম বেশ আগ্রহী হয়ে পড়েছেঃ ‘কীরকম?’
বললামঃ ‘দক্ষিণ কোরিয়াকে ওয়ারলাইক সাপোর্ট দেওয়ার কথা ছিলো ইউ এন-এর। তারা সেটা দিয়েও ছিলো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো, ইউ এন পল্টনের ৮০% সৈন্য আমেরিকার। সেই যুদ্ধে আহত এক সৈনিকের ব্যক্তিগত জীবন ফাঁকা হয়ে আসার গান এটা। খুব করুণ গান। তার প্রিয়তমা রুবি তাকে তার কান্ট্রিসাইডের বাড়ীতে ফেলে রেখে, সে কিন্তু তখন অঙ্গু, হুইলচেয়ার একমাত্র সহায় তার, কোনও এক বিকেলে চলে যাচ্ছে শহরে, ভালোবাসার খোঁজে... এটা স্বাভাবিক, তার একটা জীবন আছে, জৈবিক চাহিদা আছে। ড্যু ইউ নো হাউ দ্য হিউম্যান রেস মেকস বেবিজ?
***-কে দেখলাম প্রথমে সামান্য কুঁকড়ে যেতে, তারপর সটান সোজা বসে সে মৃদু স্বরে বললোঃ ‘হ্যাঁ।’
আমি তো বোধহয় খুশীই হলাম বেশঃ ‘তবে তো মিটেই গেলো। দেখ ***, এই একটা জিনিস আমাদের সময় ছোটদের কাছ থেকে আড়াল করা হতো। আমি আজও বুঝি না, কেন। একটা লোনসাম অ্যাডোলেসেন্ট নিজের ঘরে বসে ব্যাঙের প্রজনন পড়ছে, মানুষেরটা না জেনে — এটা, এটা, দিস সীমস ফানি টু মী। ইট’স রিডিক্যিউলাস। আর এটা জানলেই একটা ছেলে বা মেয়ে বড়ো হয়ে গেলো। অ্যাডাল্ট। কিছু তেমন না পড়েই। কন্টেম্পোর্যারি ওয়র্ল্ডকে সিঙ্ক না করেই সে প্রাপ্তবয়স্ক কিন্তু সেটা বায়োলজিক্যাল, এবং প্রাপ্তমনস্ক, এটা কিন্তু মাই বয়, নন-বায়োলজিক্যাল। অথচ আমাদের এই ট্রপিক্যাল ওয়েদারে, একটা মেয়ের পিরিয়ডস শুরু হয় চোদ্দতে। বারো-তেরোতেও অনেক মেয়ের পিরিয়ডস শুরু হয়ে যায়। এগারোতেও হয়। আর একটা ছেলের নকচারাল এমিসন হুইচ ইজ পপুলারলি নোন অ্যাজ ওয়েট ড্রিমস, সেটা শুরু হয় ওই লেট চোদ্দতেই। তার পরেও কতো ধানাই পানাই। আরে, দ্যে আর দ্য কলস ফ্রম নেচার, অ্যান্ড ইউ ক্যান্ট গো এগেইন্সট নেচার ফর লং। আমাদের সময় এই না বলার জন্য কতো জিনিস ট্যাবুড হয়ে পড়েছিলো, তুই জাষ্ট... ওয়্যেল, ইট’স জাষ্ট বিয়ন্ড ইয়োর ইমাজিনেশন। এখন দেওয়াল ভাঙছে। আগে তো একটা মেয়ে পিরিয়ডস অনেক দূরের কথা, খিদে পেয়েছে, বা তেষ্টা পেয়েছে, বা হিসি পেয়েছে, বলতে পারতো না, অ্যাজ ইফ মেয়েদের খিদে পাওয়া বারণ, নেচার’স কল নিষিদ্ধ! জাষ্ট ভাব, একটা মেয়ে, উমম, এই ধর ১৫ বছরের... তা সে কতো দিক আর একা সামলাবে! স্কুলে গেছে, মেন্সট্রুয়েশন সাইকেল শুরু হয়েছে। সে কাউন্ট রাখতে পারে নি। জিনিসটা তো তার কাছে খুব পুরোনো নয়, যে বলা যেতে পারে, সে অ্যাকাসটামড। কোয়াইট ন্যাচারালি, সে প্যাড আনতে ভুলে গেছে। এখন তার স্কার্টে একবার যদি রক্ত লেগে যায়... রক্ত যেন আর স্কার্টে লাগলো না, সোজ্জা গলায় গিয়ে লাগলো, আর সেটাও আবার অন্য মানুষের রক্ত। মানে, আমি বলতে চাইছি, এটা খুন করার চেয়েও যেন বেশী লজ্জার ছিলো একটা সময়।’
*** আমায় একটা পিস অফ ইনফর্মেশন দিলোঃ ‘এখন তো অনেক গার্লস স্কুলে প্যাডের ভেন্ডিং মেশিন বসে গেছে।’
আমার স্বরে আশা উপচে এলোঃ ‘গ্রেট ড্যুড। তুই বয়েজ হোস্টেলে থেকেও জানিস এটা। আর আমাদের সময়, আমার মনে আছে, আমার সেই ন্যাংটোবেলা থেকে একই স্কুলে পড়ে আসা একটি মেয়ে, একদিন তার মায়ের সঙ্গে আমাদের বাড়ীতে এসেছিলো। তাদের কথাবার্তা আমি বিশেষ শুনছিলাম না। আমি তখন ব্যোমকেশ পড়ছিলাম। শরদিন্দু অমনিবাস। তখন আমরা ভাড়াবাড়ীতে থাকতাম, একটাই ঘর... তো আমার মা ওদের গল্প-গাছা চলাকালীন থামিয়ে আমাকে মটরভাজা কিনে আনতে বলেছিলো। তখন দশ পয়সায় এক ঠোঙা মটরভাজা পাওয়া যেতো। আমি ছোটবেলায় মটরভাজার ফিদা ছিলাম। ভালো কথা, তুই দশ পয়সা দেখেছিস?’
হাসতে হাসতে সে ছেলে জানালো আমায়ঃ ‘হ্যাঁ। পাঁচ পয়সা, দু পয়সাও দেখেছি। আমাদের বাড়ীতে একটা করে আছে। বাবা জমিয়ে রেখেছে।’
এ ছেলে মাঝমধ্যেই আমাকে অবাকে ফেলেঃ ‘লাকি ইউ। তা আজ বুঝি, পিরিয়ডস নিয়েই হয়তঃ কথা উঠেছিলো, যেটা আমার মা চায় নি যে আমি শুনি। অথচ আমার বয়সী একটা মেয়ে কিন্তু সেটা শুনতে পেরেছিলো। বুঝলি ***, এই শ্যাডল ডিসক্রিমিনেশনগুলো ভয়ঙ্কর ক্ষতি ডেকে আনে। এগুলোই হচ্ছে সেই কানালস, যেগুলো দিয়ে মোস্ট আন-ওয়ান্টেড কুমীরগুলো আসে। আমরাই এই খাল কাটি, তারপর নিজেরাই তাতে ডুবে মরি। যেমন ধর, পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব — এগুলো কী পবিত্র ব্যাপার না? কিন্তু এগুলো যদি টোটেম হয়, তাহলে আমার মা, যার পিরিয়ডস না হলে আমি জন্মাতামই না, আমার বাপ-মায়ের বাবা-মা ডাক শোনাই হতো না, অর্থাৎ তাদের পিতৃত্ব, মাতৃত্ব — সব ইন দ্য ভোগ অফ মা হয়ে যেত, সেই মেন্সট্রুয়েশন সাইকেলটা কিন্তু চলে গেলো ট্যাবুর ঘরে। শুধু যে সবার সামনে আলোচনা বারণ, তাই নয়; সো কল্ড যত পবিত্র কাজ আছে, যেমন ধর, হিন্দুদের পুজো, পিরিয়ডস চললে একটা মেয়ে সেখানে ঢুকতে পারবে না, রমজান মাসে রোজা চলছে, বিকেলের দিক, একটা মেয়ের পিরিয়ডস শুরু হলো, বাস, তার সারা দিনের উপোস, আল্লাহ’র ভোগে। আনন্দের কথা, এগুলো আমরা কাটিয়ে উঠছি। পিরিয়ড পভার্টি বলে একটা টার্ম এখন চালু, জানিস। মানুষ অন্ততঃ বলতে তো শিখছে। স্কার্টে পিরিয়ডস-স্টেইন লেগে গেলে একটা মেয়ে লজ্জা পাচ্ছে এখনও ঠিকই, কিন্তু বাড়ীতে তো ফিরতে পারছে। আমি যদি কোথাও গিয়ে ঘামি, যদি আমার গরম লাগে, আমি বলতে পারবো না যে জানলা খোলো, কী ফ্যানটা জোরে করে দাও, কিংবা তকদীর ভালো থাকলে, এসিটা জোরে করো, টার্বো মোডে দাও? যদি বলতেই না পারি, তাহলে অমন জায়গা বাবা আমার মাথায় থাকুক, আমি বরং সেখান থেকে পাতলা হয়ে যাই — তাহলে পিরিয়ড কী এমন প্রবলেম করেছে। এই একই লজিক, যে কোনও সেক্সুয়াল অ্যাক্টিভিটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তাই না? তোর কী মনে হয়?’
*** আপত্তি জানায়ঃ ‘তুমি কি খুব ওপ্যেন মাইন্ডেড হতে বলছো এইসব ব্যাপারে? মানে, মানুষ যা ইচ্ছা সেটাই করবে?’
আমি বলে ফেলি দম না নিয়েইঃ ‘নোপ। নেভার। আমরা ওরিয়েন্তাল। পূর্বী। উই মাস্ট স্টিক টু আওয়ার ওরিয়েন্তাল ভ্যালুজ। এটা অস্তিত্বের প্রশ্ন ***, এটা... এটা শিকড়ের প্রশ্ন। হলো তো, এনাফ হলো, এই বিশ্বায়নের নামে একতরফা ইউরোপায়ন। দেখ ***, এই অক্সিদেন্তাল, মানে, পাশ্চাত্য ব্যাপার-স্যাপার বলতে আমরা অনেকেই আমেরিকার কথা ভাবি। এবং ভুল ভাবি। তুই তখনও এই পৃথিবীর আলো দেখিস নি, আমারই বয়স তখন তোর মতো, কি তোর চেয়ে কিছু বেশী, সেসময় রোজ বিকেলে সিপিআই(এম) পার্টির মিছিল বেরোত, আর তাতে হরেকরকম শ্লোগান। কিন্তু একটা শ্লোগান কমন ছিলো — মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কালো হাত, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। বয়স যত বেড়েছে, বুঝলি ***, তত এই শ্লোগানটা শুনে আমার হাসি বেড়েছে। মার্কিন পলিটিক্স ইজ আ ত্যাঁদোড় ওয়ান, দেয়ার ইজ নো ডাউট ইন ইট, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের কি একটাই রঙ? সাম্রাজ্যাবাদের নানান রঙ, ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ... অ্যাজ ইউ ক্যান সী ইট, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ — তারও একটা নাম আছে। ইউ নো ***, ক্রাইমের কতো বিভাগ, সে তুই এইচ এস দে, তোর ফ্রী টাইমে গল্প করা যাবে ‘খন, তার আগে তুই অমিতাভ বচ্চনের দিওয়ার আর শক্তি সিনেমাটা দেখে আসবি।’
*** খুবই বিস্মিত, ইন ফ্যাক্ট, সে জানতে চাইতে গিয়ে হেসেও ফেলেঃ ‘কেন?’
আমার কথা দম দেওয়া কলের বাজনার মতো বেজে যেতে থাকেঃ ‘তোর বুঝতে সুবিধা হবে বলে। আরে শোন, ক্রিমিনোলজির যত থিওরী আছে, প্রত্যেকটার উদাহরণে চার্লি ব্রনসনের নানান্ হলিউড বি মুভির উদাহরণ আছে। যাক গে, যেটা বলছিলাম তোকে, ক্রাইমেরও একটা ধরনকে বলা হোয়াইট কলার ক্রাইম। হাইয়ার-হাইয়েস্ট লেভেলে যতো মানি লন্ডারিং হয়, এগুলো তার মধ্যে পড়ে। তাহলে অপরাধের মধ্যে যদি রঙ থাকতে পারে, সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে থাকবে না? আর থাকলে, সব রঙ আমেরিকার কাছেই আছে? নো ড্যুড, অতো বড়ো প্যালেট নিয়ে কোনও দেশ বসে নেই। বরং আমার যেটা মনে হয়, সবচেয়ে বেশী আগ্রাসন এসেছে ইউরোপ থেকে। তুই কল্পনাও করতে পারবি না, স্ক্যান্ডিনেভীয়ান দেশগুলো কী অ্যাগ্রেসিভ। ওরা নিজেদের বাঁচাতে মরীয়া এখন। ওদের জন্মহার কয়েক দশক ধরে নেগেটিভ। ওদের হিউম্যান রিসোর্স হু হু করে কমে যাচ্ছে। ওরা বাঁচতে চেয়ে নিজেদের কালচারাল ট্রেইটগুলোকে আরও ক্ষতিকর বানিয়ে পৃথিবীর কাছে আসছে। পৃথিবীর, পৃথিবীর না হলেও এই আমাদের মতো পূর্বীদের কাছে সুইডেন একটা বিরাট থ্রেট। তা এগুলো সাম্রাজ্যবাদ নয়? আর আসলে কী জানিস ***, আমেরিকা রীতিমত রক্ষণশীল দেশ। আমার অনেক ভারতীয় বন্ধু আমেরিকায় আছে, অনেক আমেরিকান ছেলে-মেয়েও আমার বন্ধু। আমি এই আমেরিকান বন্ধুদের কিন্তু বায় নেম, বায় জেন্ডার চিনি না, আস্তে আস্তে, অন্যদের রেফারেন্স থেকে জেনেছি, কে বুড়ো, কে জোয়ান, কে ছেলে, কে মেয়ে। তো, আমেরিকা বিয়িং অ্যান অ্যাসেম্বল্ড কান্ট্রি... ওদের প্রাইমাল ভ্যালুজ আর নেইও, অনেকরকম মূল্যবোধ মিশে মিশে সেটা এখন দো-আঁশলা, মাল্টি-আঁশলা বললে ব্যাপারটা আরও খোলতাই হবে, এবং রীতিমত কনজারভেটিভ দেশ। আমাদের যা ক্ষতি হওয়ার, ওয়েল, তারাপদ রায়ের কবিতা পড়েছিস তুই?’
*** মাথা নাড়ে, আলতো বলেঃ ‘না।’
আমি বলিঃ ‘নো অফেন্স, বয়। আমার কাছে আছে ওঁর একটা ভালো অ্যান্থোলজি, নিয়ে যাস। তারাপদ রায়ের কবিতা পড়ার এটাই বেস্ট এজ। তো, ওঁর একটা কবিতা আছে, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে — পড়িস। একশো নব্বুই বছর কিন্তু আমরা ইউরোপের একটা দেশের কলোনি ছিলাম। অবভিয়াসলি, অনেক ভালো গুণ আমরা অ্যাডাপ্ট করেছি। তারাও যে এক্কেবারে খালি হাতে ফিরেছে, তা নয়। কিন্তু লেট নাইন্টিজের বিশ্বায়নের পর থেকে আমরা লাতাড়ে ইউরোপের খারাপ দিকটাকে শ্যাডো করে যাচ্ছি। আরও মজার ব্যাপার যেটা, সেটা হলো, ওরা কিন্তু না নিয়েছে আমাদের এককণা ভালো, না নিয়েছে এককণা খারাপ। অতএব, এই ট্র্যাজেক্টরিতে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের হিসেব নিজেদের মতো করেই বুঝে নিতে হবে। আয়্যাম নেভার গন্না অ্যাডভোকেট ফ্রী-সেক্স, অর এনি কাইন্ড অফ ওভারকীলিং ফ্রীডম। একজন ভারতীয়, দিনের শেষে ভারতীয়ই থাকবে। মেয়েরা জিনস পরবে না? অবশ্যই পরবে। কিন্তু একজন ভারতীয় হিসেবে আমি তাদের কাছ থেকে এইটুকু প্রত্যাশা বোধহয় করতে পারি যে, স্কুল ইউনিফর্মের স্কার্টের লেন্থ যদি নী-রোল অবধি হয়, তাহলে তুমি প্লীজ ভাই সেটাকে গুটিয়ে এতটাও মিনি করে ফেলো না যে, মেট্রোতে বসতে গেলে তোমার প্যান্টির ক্রুশ্যে বা লেশ এজিং দেখা যাবে। আই ফিগার, ইট ডাজন্ট প্যে অফ মাচ ইদার। শর্ট রানে কিছু ফায়দা তুমি লুটে নিতে পারো, কারণ পুরুষেরা তো মোটেও সুবিধার নয়, ইজন্ট ইট? কিন্তু লং রানে সেই ফায়দাকে টিকিয়ে গেলে তোমাকে এলিজিবিলিটি মার্ক ডিঙোতেই হবে। বোঝাতে পারলাম?
*** বোধহয় কিছু বোঝে কারণ সে পজিটিভ মাথা নাড়ে। আমি বলে যাইঃ ‘পিরিয়ড। যেটা বলছিলাম, ইউ এন সেনা প্রোভাইড করলো দক্ষিণ কোরিয়াকে, যার ৮০% আমেরিকার। ইউ এন-এর সঙ্গে আমেরিকার এই একটা অদ্ভূত ব্যাপার আমি দেখি, এটা তুইও এবার থেকে দেখতে পাবি, ইন এভরি ইউ এন থিওরী, আমেরিকা ইজ অ্যাবসেন্ট; বাট ইন এভরি ইউ এন ইমপ্লিমেন্টেশন, ইট’স মোস্টলি আমেরিকানস। আয়রনি অফ দ্য মিলেনিয়াম। এই গানটাতেও একটু আগে যেমন আমরা আলোচনা করছিলাম — একটা আমেরিকান সৈনিক… যুদ্ধে আহত হয়ে হুইলচেয়ারে… রুবি তার গার্লফ্রেন্ড বা বউ… সেটা ইম্পর্ট্যান্ট নয়… এক মানুষ ভালোবাসা ডিঙিয়ে একটা মেয়ে… পারহ্যাপস হার আনস্যাটিসফায়েড লিবিডো… লোকটাকে ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে… এটা নৈতিক না অনৈতিক কাজ — সেটা পরের কথা, কিন্তু যদি লোকটার সাইড থেকে যদি ভাবি, একটা যুদ্ধ, একটা লোক, যে কিনা পয়সার জন্য লড়তে গেলো, আর ফিরে এলো একটা পৃথিবীতে যেখানে সে সম্পূর্ণ একা, যেখানে তাকে আর ঘড়ি দেখে সময় মাপতে হয় না, দেওয়ালে সূর্যের ছায়া দেখেই সে সময় ঠাহর করতে পারে, যার কোনও বন্ধু নেই, কোনও স্বজন নেই, যার কোথাও যাওয়ার নেই, কেউ তাকে দেখতে আসে না, কেউ তাকে ফোন করে না, যার কাছে ঝিল্লীধ্বনি, মানে, ঝিঁ ঝিঁ’র ডাক ছাড়া শোনার কিছু নেই… জানিস ***, আমি তো রাতে জেগে কাজ করি, রাত নিঃঝুম, আমি একটা অদ্ভূত শব্দ শুনতে পাই, অনেকটা একতারার মতো একটা স্ট্রিং ইন্সট্রুমেন্টকে কে যেন খুব মেকানিক্যালি বাজিয়ে যাচ্ছে, আমি জয়িতাকে জিজ্ঞাসা করে দেখেছি, সে তো কিছুই শুনতে পায় না, আর আমার জিম রীভসের গানটা মনে পড়ে, আই হিয়ার দ্য সাউন্ড অফ দ্য ডিসট্যান্ট ড্রামস…
*** চমকে ওঠেঃ ‘এটা কোন্ গান?’
আমি হেসে ফেলিঃ ‘এটা আর একটা গান। ভালোবাসার গান, তবে সম্পূর্ণ আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে গাওয়া…
*** হতাশ হয়ঃ ‘আমি এটা শুনি নি।’
আমি বলিঃ ‘শুনবি। আমিই তোকে শোনাবো। তবে পরে। আজ না। টুড্যে ইজ নট দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়র্ল্ড। তো সেই লোকটা, যে সব কিছু হারিয়ে তার গার্লফ্রেন্ড বা রুবিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলো। তাও সে জানতো, সে বেশী দিন আর নেই… তবুও সেই রুবি তাকে একলা রেখে, তার আকুল ‘আমাকে ছেড়ে যেও না’র ওপর ঠাস করে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন সেই একা লোকটা একটাই কথা বলে ওঠে, ইফ আই ক্যান মুভ, আই’ড গেট মাই গান, অ্যান্ড পুট হার ইন দ্য গ্রাউন্ড… এটা কোনও রাগ নয়, কোনও প্রতিহিংসা নয়, সে একা, সে রুবিকে তার পাশে পেতে চায়, তার সঙ্গ পেতে চায়, কিন্তু সেটা সে যখন পেলো আর না, তখন… আর কিছু না হোক, রুবির মৃতদেহটা তার কাছে থাকলে তো আর সে একা হয়ে যাবে না…
*** বোধহয় গরম মোম হয়ে গেছেঃ ‘লোকটা কী একা!’
আমি বলে উঠিঃ ‘যুদ্ধ তাকে একা করে দিলো। সে কিন্তু পেটের জন্য যুদ্ধ করতে এসেছিলো। সুস্থ থাকলে আর শপিং মলে গেলে সে কিন্তু দুটো ছেলের মধ্যে থেকে আলাদা করে বলে দিতে পারতো না — কে নর্থ কোরিয়ান আর কে সাউথ কোরিয়ান। মানুষ জীবিকা খোঁজে বাঁচার জন্য, আর এর জীবিকাই একে খাদের ধারে নিয়ে গেলো, আর তারপর… ঠেলে খাদে ফেলে দিলো। জাষ্ট পুট ইনটু দ্য অ্যাবিস। কিরে ***, ভালোবাসা জিনিসটা খারাপ? তুই তো এবার কো-এড স্কুলে পড়তে যাবি, কোনও মেয়েকে ভালো লাগলে কী বলতে লজ্জা পাবি? এ তো তোর অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে রে!
*** চুপ করে বসে থাকে, যেটা আমি কেন জানি না, সহ্য করতে পারি নাঃ ‘কনফিউজড, মাই বয়? ভালোবাসা নিয়ে যদি কনফিউজড হয়ে যাস, তাহলে জীবনের বড়ো বড়ো সমস্যার সামনে পড়লে তো কেন্নো হয়ে যাবি রে! ভালোবাসার চেয়ে পবিত্র আর কিছুই নেই এই পচে, ফুলে ঢোল হয়ে ওঠা পৃথিবীটাতে। কাম অন্, শাউট আউট দিস লাউড। লেট’স প্র্যেঃ ভালোবাসার ভালো হোক, ভালোবাসা ভালো থাকুক।’
‘কিন্তু তেমন মেয়ে না পেলে…’ খুবই বিধ্বস্ত শোনায় ***-কে।
আমি মাথাটা একটু পিছনে নিয়ে যাই, হেড-রেস্টে রেখে জানতে চাইঃ ‘সো, হোয়াট’স ইয়োর ভাইব অফ দ্যাট… দ্যাট প্রিটি স্যুইট গার্ল রিয়া?’
*** ইতস্ততঃ করছিলো খুব, একটা সময়ে নিজেকে কম্পোজ করে উঠতে পারলো দেখলামঃ ‘দেখো, রিয়াকে আগে থেকে আমি চিনতাম, আর রিয়ার কয়েকজন বন্ধুদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে।’
আমি শুধিয়েই ফেলিঃ ‘রিভার্স স্বয়ম্বর?’
*** মুচকি থেকে চওড়া হাসিতে ছড়িয়ে যায়ঃ ‘ধ্যেত, তুমি মাঝেমাঝে এমন একটা একটা কথা বলো… আসলে তা নয়…’ ছেলে চেয়ারে সোজা হয়ে বসেঃ ‘রিয়া বা ওর বন্ধুদের সঙ্গে আমার নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। আমার খালি মনে হয়েছে ওরা যেন কেমন একটা… না, খারাপ নয়, কিন্তু ঠিক বড়ো যেন হয় নি। দেখো, বড়ো তো আমিও পুরো হই নি, কত কিছু জানি না। কিন্তু ওরা… ওরা… কী বলবো… আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না তোমায়…
আমি জানতে চাইঃ ‘কিন্তু প্রত্যেকেই সুন্দরী। ঠিক?’
*** এই উত্তর আশা করে নি, তবে এ ছেলের কম্পোজার সহজে ভাঙে নাঃ ‘হ্যাঁ, কম-বেশী সবাই-ই সেই রকম।’
আমি জানতে চাইঃ ‘তার মানে আউটলুকের স্কেলে এরা প্রত্যেকেই তোর কাছে চলেবল। কিন্তু গোলমাল পাকাচ্ছে থটসের ওয়েভলেন্থ। ঠিক বললাম কি?’
*** ভীষণ আগ্রহী হয়ে পড়েঃ ‘একদম। আমি এটাই বলতে চাইছিলাম।’
‘আর এরা যে তোর লেভেলে এখনও এসে উঠতে পারে নি, এটা হদিশ করতে পেরে…’ আমি খুব চেরিশ করে বলতে থাকিঃ ‘তোর মধ্যে বেশ একটা অহংকারও জন্মেছে, কী বলিস?’
‘না, মানে, ঠিক অহংকার নয়,’ *** হাতড়াতে থাকে শব্দঃ ‘আসলে হোস্টেলে থাকার জন্য আমরা যা যা জানি, যে যে ভাবে দেখি বিষয়গুলোকে, সেভাবে এরা… তুমি কি একে অহংকার বলতে চাও?’
‘উমমম, অহংকারের কাছাকাছি কিছু একটা বলতেই পারি।’ আমি আবার টক-মিষ্টি আচার খাওয়ার স্বাদে বলতে থাকিঃ ‘তা তুই এত ফিজেট করছিস কেন? অহংকার জিনিসটা তো ভালো।’
‘অ্যাঁ! ভালো? অহংকার ভালো!’ *** মুহ্যমান হয়ে পড়ে।
আমি তাকে জাগানোর চেষ্টা করিঃ ‘হ্যাঁ, একটা বেসিক মিনিমাম ভ্যানিটি তো ভালোই। মন্দ কীসের। অহংকারটাকে তুই নিশ্চয়ই নিজের কাছে রাখবি। লোকের কাছে ড্রাম পিটিয়ে বলে বেড়াবি না।’
*** মাথা নাড়ে, আসলে এই মাথা নাড়াটা মানুষের নয়, পুতুলেরঃ ‘কেন বলবো? কেন বলতে যাবো?’
‘আচ্ছা এটা বল্’ আমি সামান্য গাঢ় হইঃ ‘রিয়া, তার ওই বন্ধুরা... সবাই কী সায়েন্স?’
*** কনফার্ম করে আমায়ঃ ‘পিওর।’
আমি আর কিছু নিশ্চিত হতে চাইঃ ‘আর এদের কারোর ম্যাচুরিটিই তোকে খুশী করে নি। তা এরা লেখাপড়ায় কেমন?’
*** সহর্ষে জানায়ঃ ‘রিয়া তো ওদের স্কুলের ফার্স্ট গার্ল। বাকীরাও বেশ ভালো। কিন্তু...
আমি মাথা নাড়িঃ ‘ইয়াহ ড্যুড, আয়্যাম টু ইন সার্চ অফ দিস ‘কিন্তু’। কিন্তু হোয়াট?’
***একটু ধরা গলায় ছন্নছাড়া বলতে থাকেঃ ‘কোথাও গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এরা টেক্সটের থেকে নোটসকে বেশী গুরুত্ব দেয়। মানে, রিয়াকেই দেখছিলাম, ওর বন্ধুরা যার কাছে পড়বে তিনি একটা টেক্সটের নোটসের কটা ভ্যারিয়েশন দেন, সেগুলো আপডেটেড, নাকি, অনেক পুরোনো — এসব নিয়ে আলোচনা করছিলো বেশী। আর কী ভীষণ কনফিডেন্স ওদের যে, মুখস্থ করে ঠিক নামিয়ে দেবে।’
আমি খুঁজে নিইঃ ‘হুম, ক্র্যামিং ইজ আ চীপ থিং। আর তুই বুঝে পড়তে চাস। তোর এই অহংকার তুই করতেই পারিস। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছিস কি ***, ওরা কিন্তু বেশ সিরিয়াস। জান লড়িয়ে দেবে। আর সেটা ড্যে ওয়ান থেকেই। এবার তুই স্ট্যাটিক থাকিস, তাহলে একদিন তো তোকে ওরা ধরেই ফেলবে। তারপর টপকেও যাবে। তখন তোর এই ভ্যানিটির কী হবে? ডিসম্যান্টল্ড হয়ে যাবে তো সেটা। তাই না? আর সেটা হলে ফর দ্য টাইম বিয়িং অহংকার পুষে তোর কী লাভ?’
*** বুঝে ফেলে চট করেঃ ‘হ্যাঁ আমাকেও প্রথম দিন থেকেই লেগে পড়তে হবে।’
আমি সঙ্গে সঙ্গে কিউ দিইঃ ‘আর সেটা তোর মতো করে। অহংকারকে পোষা আর সেই ভ্যানিটি যাতে লং রানে ডিরেইলড না হয়ে যায়, সেজন্য নিজেকে খাটানো... আল্টিমেটলি, অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ড্যে, তোরই সাবলিমেশন হবে। হবে না?’
*** রাজী হয়ঃ ‘সেটা ঠিক।’
আমি বলিঃ ‘তাহলে ভালোবাসার মতোই একটু অহংকারও তো ভালোই দেখা যাচ্ছে। তা ভ্যানিটি নিয়ে নাহয় একটা দাঁড়াবার জায়গা হলো। ভালোবাসা নিয়ে তো কিছু হলো না!’
*** হেসে ফেলেঃ ‘কী করে হবে? এখনও তো সেরকম মেয়ের দেখাই পেলাম না।’
আমি ***-কে আশা জোগাইঃ ‘২০২৬-এর পৃথিবী বেশ ছোট হয়ে গেছে। পেয়ে যাবি। খুব শিগগিরিই তোর একটা ক্রাশ তৈরী হতে যাচ্ছে। অ্যান্ড হিয়ার গোজ আ টাইট রোপ ফর ইউ।’
*** অবাকই হয়ঃ ‘মানে?’
আমি একটু ফেসিলিটেশনে আসিঃ ‘ক্রাশ, ভালোবাসা — তোর বয়সে এগুলো কিন্তু খুব ডিভাইন, মানে, আধ্যাত্মিক কিছু না, বায়োলিজি মেনেই এগুলো কিন্তু পার্থিব। এখানে ভালোবাসা একা আসে না। সঙ্গে আসে সেক্সুয়াল কিউরিওসিটি, সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশন, সেক্সুয়াল এক্সপেরিমেন্ট, সেক্সুয়াল অ্যাফিনিটি। আর টাইটরোপটা ড্যুড এখানেই।’
*** জানতে আগ্রহীঃ ‘যেমন?’
আমি শ্বাস ছাড়ি আর কথা শুরু করতে দিইঃ আমাদের দেশে ২০১২ সালে আমাদের দেশে একটা আইন আসে। তার নাম প্রোটেকশন অফ চিল্ড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট, ২০১২। এই আইনটা কিন্তু হুট বলতে ছুট আসেনি, ২০০৫-০৬ সালে চাইল্ড অ্যাবিউজের ওপর সারা দেশ জুড়ে একটা বিরাট সার্ভে হয়। সেখান থেকে স্টাডি। তাতে উঠে আসে ভয়ংকর ভয়ংকর সব তথ্য। সেসব খুব তেতো কথা বুঝলি, ***। শুনলে তোর গা গুলোবে। তবুও কিছু ঘটনা তোকে সময় করে বলবো একদিন। তোদেরই জানার সবচেয়ে বেশী অধিকার। কিন্তু একটা জিনিস খুব পরিচ্ছন্ন বোঝা গেলো শিশুরা, বিশেষ করে আমাদের দেশের গার্ল চিল্ড্রেনরা খুব একটা ভালো নেই। দেশের মধ্যে বারবার একটা খারাপ ঘটনা রকমফেরে ঘটে যাচ্ছে। স্টেট রেস্পন্স কী হতে পারে তোর মনে হয়? দেশ তো কোনও মানুষ নয় যে খারাপ কাজ করার কারোর কান ধরে দু গালে দুটো থাবড়া মারবে। দেশ যেটা পারে, সেটা হলো — রাষ্ট্র সমস্যাকে অ্যাড্রেস করে নতুন আইন আনতে পারে। তা ২০০৮-এর প্রথম দিকে অফেন্সেস এগেইন্সট চিল্ড্রেন বলে একটা বিল আসে। কিন্তু বিল মানেই তো আর সেটা আইন নয়। ওয়েল ড্যুড, ডু ইউ নো দ্য স্ট্রাকচার অফ আওয়ার পার্লামেন্ট?
*** বলে ওঠেঃ ‘তুমি কী লোকসভা আর রাজ্যসভার কথা বলছ?’
আমি বলেই ফেলিঃ ‘নাহ, এই জেন জি কিন্তু আমাদের থেকে ওয়্যে অ্যাহেড। আমরা তো তোর বয়সে জানতাম পার্লামেন্ট মানে স্টেডিয়ামের মতন দেখতে একটা কিছু। মানে, প্রণয় রায়ের নিউজ শো-তে অমন একটা লোগো দেখাতো কি না। কারেক্ট বয়, একটা বিল এলে তাকে পার্লামেন্টের দুটো সভাতেই ভোটে, মেজরিটি কাউন্টস্-তে পাশ হতে হয়। তারপর সেটা গেজেট ম্যান্ডেট হয়ে আইন হিসেবে আমাদের জন্য লাগু হয়। তা এক্ষেত্রে, ওই বিল এলো, কিন্তু পাশ হলো না। তার বদলে ২০১২ সালে প্রোটেকশন অফ চিল্ড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট আসে। এর অ্যাব্রিভিয়েশনটা হয়তঃ তোর পরিচিত। পকসো আইন।
*** আমায় আশ্বস্ত করেঃ ‘হ্যাঁ জানি। কাগজে পড়েছি। হোস্টেলে। বাড়ীতেও পড়ি। দেখতে পাই।’
আমি আর থামি না, এখানে থামা নেইঃ ‘তোকে বলি ***, এই পকসো আইন এসে কী কী করলো। তার আগে তুই আমায় বল, ভালোবাসা, অ্যান্ড দ্যাট অ্যাট ইয়োর এজ, ইজ অ্যান অ্যাবসোলিউট গ্রেস ফ্রম দ্য অলমাইটি। বাট অল গুডস দ্যট লুক গুড ফ্রম আ ডিস্ট্যান্স আর নট ফিজিবল অর প্যালপেবল। অ্যান্ড — সে একা আসে না। তোর বয়সে তো একা আসে না-ই, হল্লাহাটির সঙ্গে চুম্মাচাটিও থাকে। আমাদের বয়সে এসে... ওয়্যেল, এটা তোদেরই মতো ছিলো... এই কিছু দিন আগে পর্যন্তও ছিলো। আর এখন আমায় দ্যাখ, দু দিন শ্যেভ করিনি, গাল ভর্তি সাদা দাড়ি। আমরা এখন চুম্মাচাটি তো অনেক দূরের কথা, হল্লাহাটিও করতে পারি না বিশেষ। তুই জানিস, আমি একটা সময় ভালো ক্রিকেট খেলতাম; তাই বলে এখন কী পারবো, কুড়ি ওভার ধরে ব্যাট করে যেতে। ঠ্যাঙাতে ঠাঙাতে? এখন আমরা দর্শক, খেলার দেখার; ভালোবাসার ক্ষেত্রেও, একটা জায়গায় বসে কিছু কথা বলার। ভালো কথা, এখন কিন্তু অভিষেক শর্মার চাইতে ঈশান কিষাণ বেশী ভালো ফর্মে আছে না? তবে অভিষেক শর্মার অফ ফর্ম হয় না, একদিন তিনটে বল স্লটে পড়লে আর ওর ব্যাটে সুইট স্পটে লাগলেই ছেলেটা আবারও তার নার্ভ ফিরে পাবে।’
*** দেখলাম ঈশান কিষাণের ডাই হার্ড ফ্যানঃ ‘তুমি জানো, ঈশান রোজ গীতা পড়ে? আমার মনে হয়, এটা ওর ব্যাটিংকে আরও ধারাবাহিক করে তুলেছে। তবে অভিষেক যেদিন রান পায়, সেদিন আর পুরো খেলা দেখার দরকার পড়ে না। আমরা ইন্ডিয়ার ব্যাটিং দেখে নিয়ে নিজেরা খেলতে চলে যাই।’
আমি নিশ্চিত হতে চাইলামঃ ‘তাহলে তুই মনে করিস যে ধারাবাহিক স্পট অন থাকতে গেলে যে কম্পোজারটা লাগে, সেটা আমরা আমাদের শিকড় থেকেই পাই। গীতা বা বাইবেল বা কোরাণ তো আজকের নয়।’
***-কে উচ্ছ্বসিত দেখায়ঃ ‘অবশ্যই’।
আমি একটু আনমনা হয়ে গেলাম, আসলে এত শব্দ খুঁজতে হচ্ছিলো আমায়... স্কুল ট্রেনিংয়ে ট্রেনি এবং ট্রেনার — উভয়েরই একটা মাইন্ডসেট থাকে। কিন্তু *** এই কথাগুলো তো ঠিক শুনতে আসে নি আজঃ ‘একটা বাউন্ডারি তোকে কিন্তু আগে থেকে সেট করে রাখতে হবে রে ***, নইলে বিপদ। আর এক্স্যাক্টলি এইখানে টাইটরোপ। কেমন জানিস? ধর, তোর একটা গার্লফ্রেন্ড হলো। একটা রিলেশনশিপের বন্ডিংটা তোর বয়সে কিন্তু শুধু মিষ্টি মিষ্টি কথা দিয়ে হয় না। আর তাছাড়া মানুষের হাত ধরবে না মানুষ! গার্লফ্রেন্ডের ক্ষেত্রে তো চুমু মাস্ট। আর চুমু কি একতরফা খাওয়া যায়? দুজনেরই কনসেন্ট থাকতে হবে। কিন্তু এই পকসো আইন যখন ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের সঙ্গে এঁটে গেলো — গার্ল চাইল্ডদের প্রোটেকশন দিতে গিয়ে বোধহয় কিছুটা ওভার ডু করে ফেললো। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক, কারণ মানুষ ধরে ধরে তো আর আইন বানানো যায় না, আইন ব্ল্যাঙ্কেটলি এনফোর্সড হয়। আর এই আইন ওয়র্স কিছু সিচুয়েশন থেকে গার্ল চিল্ড্রেনদের বাঁচানোর জন্যই শেপ পেয়েছিলো। তো, এই আইনে দেখা গেলো — ১৮ বছরের নীচে একটি মেয়ের কনসেন্ট আদৌ কনসেন্ট নয়। অর্থাৎ ফিজিক্যাল ইন্টিম্যাসি — সেটা যদ্দুর যাই ঘটে থাকুক না কেন, ইফ ইট গেটস রিপোর্টেড, অ্যান্ড ইফ দ্য ম্যাটার ইজ প্রোডিউসড বিফোর কোর্ট, অর বোর্ড, অ্যাজ দ্য কেস ম্যে বি, ওই এনটায়ার ইনসিডেন্ট যেখানে তোর গার্লফ্রেন্ডের পূর্ণ সম্মতি ছিলো, দ্যাট উইল নট গেট কাউন্টেড। ইন্সটিড, গোটা ব্যাপারটাকে দেখা হবে ফোর্সফুল অ্যাক্সিডেন্ট হিসেবে, যেখানে তোর গার্লফ্রেন্ড ভিক্টিম, আর তুই পার্প্যিট্রেট্যর।’
*** চমকে ওঠেঃ ‘সে কী? কেন?’
আমি ম্লান হাসিঃ ‘সবাই তো ভালোবাসার মাহাত্ম্য বুঝে ভালোবাসে না রে! কেউ কেউ একটা মেয়ের ভালোবাসা পাওয়ার আকুলতাকে এনক্যাশ করে ভুল বুঝিয়ে। ইন দ্য নেম অফ লাভ, ট্রু ক্রাইম কিন্তু নানারকমের ঘটে। এই দেশে। অন্য সব দেশে। যেমন ধর, পাচার। হিউম্যান ট্র্যাফিকিং। একটা মেয়েকে ভালোবাসার ভান করে, তাকে একটা সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাকে ফ্লেশ ট্রেডে, মানে, অনেক দূরের কোনও রেড লাইট এরিয়ায় বেচে দেওয়া। খুস্টিন ইজ ইয়োর নেম বলে দারুণ একটা সিনেমা আছে এটার ওপর। লুক্সেমবার্গের ছবি। লিলিয়া ফর এভার বলে তো একটা মারাত্মক সিনেমা আছে লুকাস মুডিসনের। অবশ্য দুটো ছবির কোনওটাতেই কোনও আন্ডার এইট্টিন গার্লকে ভিক্টিম হিসেবে দেখানো হয় নি, তারা অ্যাডাল্টই ছিলো। কিন্তু অ্যাডাল্ট বলে কী স্বপ্ন দেখতে মানা তার? তোর কী মনে হয়?’
*** সহমত হয় আমার সঙ্গেঃ ‘না, তা কেন হবে। স্বপ্ন দেখেছে বলেই তো ঈশান কিষাণ এই কামব্যাকটা করতে পারলো।’
আমি তারিফ করিঃ ‘নাইস এক্সাম্পল। তাহলে তো একটা আন্ডার এইট্টিন মেয়েও এই স্বপ্নটা দেখতে পারে।’
*** আমায় পাল্টা মারেঃ ‘একজন আন্ডার এইট্টিন ছেলের কী স্বপ্ন দেখা মানা?’
আমি হতাশ মাথা নাড়িঃ ‘তুই যেটা ভেবে বললি, অ্যাজ অফ নাও, সেটা প্রায় মানা। অন্ততঃ আইন মানার কথাকে ডিসকার্ড করে নি। আর করে যখন নি, তখন স্বপ্ন দেখা মানা ধরতে হবে। অন্ততঃ, আপাততঃ।’
*** মাথা নাড়ে। তার মুখে বিরক্তিঃ ‘আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই আইনটা ভালো না।’
আমি আরও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়িঃ ‘মন্দ আইন সংশোধন না হয়ে যতক্ষণ না ভালো হচ্ছে, ততক্ষণ এই মন্দ আইনকেই মেনে চলতে হবে। দেয়ার ইজ নো আদার ওয়্যে, ড্যুড—
*** কিছু বলতে যায়। কিন্তু তাকে আমি থামিয়ে দিইঃ ‘আমাদের সংবিধানে বলা আছে যে হাজার হাজার অপরাধী ছাড় পেয়ে যায় তো যাক, কিন্তু একজন নিরপরাধ যেন সাজা না পায়। ফলে কী হয় — আমাদের দেশে পুলিশ কাউকে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে অ্যাপ্রিহেন্ড, আই মন গ্রেফতার করে কোর্টে প্রোডিউস করলে ‘পর পুলিশের ওপরই দায় থাকে অনুসন্ধান বা তদন্ত করে তাকে দোষী বলে প্রমাণিত করার। কিন্তু অক্সিদেন্তাল জুরিসপ্রুডেন্স এমন বলে না। তারা বলে, তোমার নাম যখন এসেছে, তোমার দায় নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার। আর এই পকসো আইন আর পণের জন্য বধূ হত্যা — এই দুটো আইন কিন্তু পশ্চিমাদের ধাঁচের। এবার তুই আমায় বল, স্কুলে আগে ব্যাকপ্যাক নিয়ে যাবি, নাকি, বডি ওর্ন সিসিটিভি?’
*** চমকে উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আমি বলে যেতে থাকিঃ ‘আর এই কারণেই তোকে আমি বাউন্ডারি কথাটা বলেছিলাম। দ্যাখ, তুই এতদিন হোস্টেল লাইফ লিড করেছিস। হয়তঃ সেটা খুব রিচ, কিন্তু সেটা কনফাইন্ডও। নাও ইউ আর সাপোজড টু মুভ ফ্রীলি অ্যাক্রস দ্য লোকালিটি। এখানে কোথায় বুবি ট্র্যাপ পাতা থাকবে, তোর পক্ষে কি আগেভাগে আন্দাজ করে নেওয়া সম্ভব?’
*** জিজ্ঞাসা করেঃ ‘বুবি ট্র্যাপ কী?’
আমি পাল্টা জিজ্ঞাসা করিঃ ‘তুই টেনিদা পড়িস নি।’
*** উজ্জ্বল, সদর্থক মাথা দোলায়ঃ ‘মুখস্থ বলতে পারো।’
আমি জিজ্ঞাসা করিঃ ‘ক্যামোফ্লেজ গল্পটা মনে আছে তোর?’
*** সময় নিয়ে হাসেঃ ‘“মিস্টার, উই উইল কাট ইউ।” তারপর তো টেনিদার কুকুর আর টেনিদার খেলা।’
আমি নিস্তেজ স্বরে বললামঃ ‘বললাম, ক্যামোফ্লেজ গল্পের ক্যামোফ্লাজ রাস্তায় নামলে বুবি ট্র্যাপ। ধর, তুই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মানুষের তৈরী করা পথ দিয়ে যাচ্ছিস। বহু জায়গায় গাছপালা ছড়ানো। তুই কি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবি, সব গাছপালাই নির্দোষ, কারোর নীচে একটা গর্ত রাখা নেই?’
*** বললোঃ ‘ডুয়ার্সে প্যালারাম তো এমনই একটা গর্তে পড়েছিলো। তখন একটা শজারু আগে থেকে পড়ে ছিলো। আর তারপর চিতাবাঘটাও পড়লো।’
আমি বললামঃ ‘বুবি ট্র্যাপ অমনই। বায় দ্য ওয়্যে, তোর হোস্টেলে নেমকলিং চলত না?’
*** আবারও হেসে ফেলেঃ ‘প্রচন্ড।’
আমিও হেসে ফেলে বললামঃ ‘এটা বোধহয় বাঙালী জাতটার একটা বৈশিষ্ট্য। তা এটা তো এখনও চলবে নাকি? বন্ধুবান্ধব তো আর পাল্টে যায় নি।’
হেসে ফেলে ***। আমি আবার বলিঃ ‘এটা আমাদের মজ্জায় মিশে গেছে। এটা তোর নতুন স্কুলেও হবে। কোনও একটা ছেলে, তার নিজের আচরণের জন্য মার্কড হয়ে যাবে, তারপর তোরা তাকে কর্ণারাইজ করবি। নিছক মজাই এটা। কারণ ব্যাপারটা সিরিয়াস দিকে গেলে তোরাই আবার সেই ছেলেটাকে বুকে টেনে নিবি। এর অন্যরকম হলে অবশ্যই সেটা অপরাধ। কিন্তু ওয়ান ব্যাড মর্নিংয়ে তিতিবিরক্ত হয়ে যদি তোদের সেই বন্ধু পুলিশের কাছে চলে যায়, আর গিয়ে, রাগের মাথায় মিথ্যে করে অভিযোগ সাজায় যে তোরা কয়েকজন দল বেঁধে তাকে সোডোমাইজ করেছিস, তাহলে? মনে রাখিস, এই পকসো কিন্তু ইউনিসেক্স, ইউনিজেন্ডার অ্যাক্ট।’
*** ধূসর-পিঙ্গল স্বরে জিজ্ঞাসা করেঃ ‘সোডোমাইজ কী?’
আমি বলিঃ ‘মূল শব্দটা হলো সোডম। এস ও ডি ও এম। তুই বাড়ীতে গিয়ে ডিকশনারি দেখে নিস। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমার বুকসেল্ফের বাঁদিকে একটা ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারি দেখতে পাচ্ছিস? দেখে নে।’
*** উঠে গিয়ে বুকসেল্ফের কাঁচ সরিয়ে ডিকশনারি বের করে পাতা উল্টোতে থাকে। নিজের চেয়ারে বসে থাকি আমি, সফল ফাঁসুড়ের মতো আস্তে আস্তে অক্সিজেন নিতে থাকি, কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়তে থাকি। একটা সময় ***-এর মুখ থেকে বেরোনো ‘উহঃ’ কানে আসে। আমি কিছু বলি না।
*** বুকসেল্ফ থেকে খুব ধীর পায়ে হেঁটে চেয়ারে এসে বসে। বসেই জিজ্ঞাসা করেঃ ‘আচ্ছা, তোমাদের সময় এসব কিছু ছিলো না, তাই না?’
আমি বলিঃ ‘নাহ রে, আমাদের সময়টা এমন ছিলো না। খুব স্বচ্ছ, নির্মল ছিলো আমাদের পড়ন্ত কৈশোর। কিংবা হয়তঃ এমনই মাডি গ্রে ছিলো। আমরা টের পাই নি, আর আজকের পৃথিবী শিক্ষিত হয়ে সেসবকেই প্রেক্ষিত করে আজকের পৃথিবীটাকে বাঁচাতে চাইছে। আই'ল বি রাইট ব্যাক। ওয়েট ফর মী ফর আ কাপল অফ মিনিটস, ড্যুড।’
৪।।
বেরিয়ে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাই আমি। এটার কিন্তু কোনও প্রয়োজন ছিলো না। আসলে আমি ***-এর কাছ থেকে পালিয়ে এলাম। ওদের সময়কে সামান্য ঠাহর করতে পেরেই সে জানতে চেয়েছে আমাদের সময়টা কেমন ছিলো। এর পরেই কি অবধি প্রশ্ন এসে উঠতো না, যে — ওই বয়সে আমার ক্রাশ কেউ ছিলো কিনা? নির্জলা মিথ্যে বলার চাইতে পালিয়ে আসা ভালো। আই অলসো নীড আ বিট অফ টাইম টু গেট ব্যাক ইন দ্য গ্রুভ — তারপর না হয় ফিরে গিয়ে ওকে অন্য প্রসঙ্গে চুবিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু ***-এর কাছ থেকে পালাতে পারি আমি, নিজের কাছ থেকে কী করবো? ক্রাশ... ১৯৯০, ৯১, ৯২ — তারপর ফাঁকা। এম্পটি জোন। ধূসর এক শুঁড়িপথ, সাবস্টিটিউট হিসেবে সাহিত্য, সিনেমা, অন্য কোনও মেয়ে যাদের নাম পর্যন্ত আমার মনে নেই, অনেক দিন ধরেই নেই, অতঃপর জয়িতা, নোঙর, নান্দীকার থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল, গাদা গাদা প্রাইভেট পড়ানো, বেলার দিকে জুয়া খেলা, প্যান্টে ঢুকতে নারাজ — এমন মোটা ওয়ালেট নিয়ে বাড়ী ফেরা, ফিরে জুয়ায় জেতা দুশো মিষ্টি দই শেষ পাতের ভাত, শেষ দুপুরে আধাঘন্টা-একঘন্টা ঘুম, তারপর আবার দুটো ব্যাচের পড়ানো... সাড়ে আটটার মধ্যে ফ্রী হয়ে যাওয়া... শ্মশান... বাংলা মদ... একা।
২০০০ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল... প্রথম ছবি, ব্রেথলেস। রেট্রোস্পেকটিভ — এলিসেও সুবিয়েলা (আর্খেন্তিনা), হোমেজ — গোদার। তারপর জয়িতা নামের সেই নতুন মেয়েটা আমার একটা একটা দিক ধরে শান দিতে লাগলো। আমায় সাহস দিলো, গান, সাহিত্য সিনেমার নিজস্ব পৃথিবী-পড়ানো-জুয়া-মদ থেকে বেরিয়ে গঙ্গার ধার... প্রথম প্রথম মনে হতো ডিটক্সিফিকেশন ক্যাম্পে চলে এসেছি। মাস্টার্সে ভর্তি হওয়া... জানিই না কী পড়তে এসেছি, কেন পড়তে এসেছি, অথচ সেখানেই কিনা তৈরী হলো একরাশ বন্ধুবান্ধব, যারা কেউই বয়সে আমার কাছের নয়, সেইসব বিষমবয়সী বন্ধুত্ব আমায় চলকে দিলো, আরও আচম্বিতভাবে পেলাম স্যার-ম্যাডামদের ভালোবাসা। জয়িতাও ভর্তি হলো। কোর্স শেষ হলে দেখলাম আমার মধ্যে আগুন ফুরোয় নি। বুড়ো, কিন্তু অব্যবহৃত আগুন নিয়ে খেলা শুরু হলো।
আমি শিখে এসেছি — একবার মাটির দিকে তাকাও, দেখো, মাটি প্রতীক্ষা করছে, তুমি মানুষের হাত ধরো, সে কিছু বলতে চায় — তাহলে আমি এ কি সেফ গার্ড দিচ্ছি ***- কে, কী শেখাচ্ছি আমি তাকে! তাছাড়া পকসো অ্যাক্টের কোথাও তো হাত ধরতে মানা নেই! আমার ভিতর থেকে চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারটা বলে ওঠেঃ ‘ওই হাত ধরাই আস্তে আস্তে বিছানার দিকে নিয়ে যায়, তোরও যেত। তুই সুযোগের অভাবে সৎ।’
আমি তাকে ওড়াতে চাই ‘ফাক অফ। ফোট বাল।’
চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারঃ ‘সান অফ আ বিচ, বুঝেও বোঝো না, অ্যাঁ? প্রিভেন্টিভ মেজারস আর অলওয়েজ প্রেফারড টু কিউরেটিভ মেজারস — ডোন্ট ইউ নো ইট, ফাকার?’
আমিঃ ‘তাই বলে একটা মেয়ে, সে তো বন্ধু, হাত ধরতে পারবে না?!’
চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারঃ ‘বাউন্ডারি মানে কী — বেড়ার ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে দেওয়া? পকসো অ্যাক্টে বুকড হলে কী হবে? নিজেকে নিজে প্রমাণ করতে পারবে যে, সে নির্দোষ ছিলো? যদি বা সামহাউ বেরিয়ে আসে, আসতে পারে, যে স্টিগমা চারপাশ তাকে দেবে, জুভেনাইল জাষ্টিসের ১৬ খানা প্রিন্সিপলের মুখে মুতে দিয়ে — ছেলেটা মেইনস্ট্রিম সোসাইটিতে ইনক্লুডেড হতে পারবে আর? তার আর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া হবে বলে তোর মনে হয়?’
আমিঃ ‘তাই বলে এত রিজিড ডিসক্রিমিনেশন?’
চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারঃ ‘তাকে আগে বাঁচতে হবে। নিজেকে বাঁচিয়ে ট্রেন ডেসটিনেশনে পৌঁছতে পারলেই এনাফ।’
আমিঃ ‘এইরকম জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন!’
চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারঃ ‘জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন কোথায় দেখলি বল তো! আরে উল্লুক, সে অন্য ছেলে বন্ধুদেরও যতটা সম্ভব কম ছোঁয়ার চেষ্টা করবে। পকসো ইউনিসেক্স, ইউনিজেন্ডার অ্যাক্ট। আর ও কতটা এলজিবিটিকিউদের ব্যাপারে এক্সপোজার পেয়েছে — তুই জানিস?’
আমিঃ ‘তাহলে একটা ছেলে বাঁচবে কী করে?’
চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারঃ ‘একা।’
আমিঃ ‘পীয়ার গ্রুপ বলে কিছু থাকবে না?’
চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারঃ ‘সেফ ডিস্টেন্স মেইনটেইন করলেই থাকবে। নো ফিজিকাল টাচ, অ্যান্ড দ্যাট’স দ্যাট।’
আমিঃ ‘তাহলে তুমি মানুষের হাত ধরো - সে কিছু —’
চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারঃ ‘থিওরেটিক।’
আমিঃ ‘মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষের পাশে —’
চাইল্ড প্রোটেকশন প্র্যাক্টিশনারঃ ‘জাষ্ট কাট দ্য ক্র্যাপ।’
৬।।
ফিরে আসি আমি। নিজের চেয়ারে বসি। ***-এর দিকে তাকাই। তারপর দেওয়ালের দিকে। অতঃপর বলে যেতে থাকিঃ দেখ ***, আমাদের মধ্যে পকসো অ্যাক্ট নিয়ে কথা হচ্ছিলো। আমি তোকে বোর্ড, মানে, চিল্ড্রেন ইন কনফ্লিক্ট উইথ ল, মানে, আইনের সঙ্গে সংঘাতে থাকা শিশু —
*** আমার কথা কেটে দেয়ঃ ‘তুমি কথাগুলো এভাবে বলছো কেন?’
থেমে যাই। প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারি নাঃ ‘মানে? এভাবে মানে? কোন্ভাবে?’
*** জিজ্ঞাসা করেঃ ‘তুমি তো তাদের কথা বলতে চাইছো, যাদের বয়স আঠেরোর কম। আর যারা অপরাধ করেছে — তাই তো?’
ধরমকাঁটা। আমি দেওয়াল ছেড়ে সীলিংয়ের দিকে তাকাইঃ ‘ওয়েল, প্রিসাইজলি ইয়েস। অ্যান্ড আই উড লাইক ইউ টু অ্যাড্রেস দেম ইন দ্য সেম ম্যানার অ্যাজ ওয়েল।’
*** প্রায় বাক্যহারা হয়ে পড়েঃ ‘মানে? কিন্তু কেন?’
আমি ব্যাখ্যা করার ব্যর্থ চেষ্টা করিঃ ‘বিকজ দ্য স্টেট ওয়ন্টস ইউ টু অ্যাপ্রোচ দ্য এনটায়ার ফ্রেম ইন দিস ফ্যাশন। অ্যান্ড ইট'স দ্য অ্যাক্ট দ্যাট স্ট্যান্ডস দেয়ার বিটুইন ইউ অ্যান্ড দেম অ্যাজ অ্যান ইন্টারফেস। ওয়েল, যেটা বলছিলাম — বাউন্ডারি... নিজের সীমানা এবং অন্যের সীমানা — এখানে আর কোনও গার্লফ্রেন্ড, ক্রাশ নয়; তোরটা তোর, অন্যেরটা অন্যের। তুই এখানে শুধু নিজের কথা ভাব, অন্যদের কথা ছাড়। যে কোনও অভিযোগ, যেটা পকসো অ্যাক্টের পারভিউতে আসে, সেটা কিন্তু ফেলোনি, আই মিন এই আইনের ভাষায় হেইন্যস নেচার অফেন্স। অর্থাৎ জঘন্য, কুৎসিত অপরাধ। এই জাতীয় অপরাধ, এর মধ্যে খুন, ডাকাতি — এসবও আছে, কিন্তু তার বিচার পদ্ধতি পকসো আইনের থেকে আলাদা, সেখানে পুলিশকে প্রমাণ করতে হবে তুই দোষী, হোয়্যারঅ্যাজ, পকসো অ্যাক্টের ক্ষেত্রে তোকে প্রমাণ করতে হবে তুই নির্দোষ... হাউএভার, যে শিশুর বয়স ১৬ থেকে ১৮, এবং যাদেরকে এই হেইন্যস নেচার অফেন্সে অ্যাপ্রিহেন্ড, মানে গ্রেফতার করা হয়েছে — তারা... তাদেরকে কিন্তু জুভেনাইল জাষ্টিস বোর্ড, যারা এসবের বিচার করার জন্য রয়েছে, সেই তারা কিন্তু চিল্ড্রেন’স কোর্টে প্রোডিউস করতে পারে, যদি তারা মনে করে, অপরাধ তেমনই গুরুতর। চিল্ড্রেন’স কোর্টকে তুই জুভেনাইল জাষ্টিস বোর্ডের চাইতে হাইয়ার কোর্ট, অর্থাৎ উচ্চতর আদালত মনে করতেই পারিস। এবার সেখানে, মানে, চিল্ড্রেন’স কোর্ট কিন্তু সবকিছু তলিয়ে দেখবে, এবং যদি তাদের কাছে ডিফেন্স ঠিক করে খাড়া করা না যায়, এবং পকসো আইনের ফেব্রিকটাই এমন যে খুব বেশী ডিফেন্ড করা যায় না, তাহলে — তাহলে... তাহলে চিল্ড্রেন’স কোর্ট, হ্যাঁ, তারা একটা শিশুকে আন্ডার দ্য সান কোনও অফেন্সের জন্যই ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট, অর্থাৎ, ফাঁসি, বা লাইফ ইম্প্রিজনমেন্ট দিতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু চাইলে সর্বোচ্চ সাত বছরের জন্য ইন্সটিটিউশনাল কারেকশনের রায় দিতে পারে। এবার দেখা যাক, এর ডিস্ট্রিবিউশনটা কীরকম — ধর, তোর বয়স এখন ষোলো প্লাস। তো, একজন অভিযুক্ত যদি এক্স্যাক্ট তোর বয়সী হয় এবং খুব বিরল ধরনের নারকীয় অফেন্স করেছে হিসেবে সাব্যস্ত হয়, তাহলে আঠেরো বছর বয়স হওয়া অবধি সে থাকবে স্পেশ্যাল হোমে, তারপর প্লেস অফ সেফটিতে একুশ বছর পর্যন্ত। কতো হলো? তিন আর দুই সমান সমান পাঁচ বছর। আর শেষ দু বছর কিন্তু জেলে কাটাতে হবে।’
চমকে শিউরে ওঠে ***। আমি তার এই শিহরণের ওপর আর একটু পাষাণ চাপিয়ে দিই, আমার আর কী... যে ফাঁসুড়ে একবার ফাঁসী চড়িয়েছে, তার দু নম্বর থেকে তো দ্বিধা থাকার কথা নয়ঃ ‘জুভেনাইল জাষ্টিস মেকানিজমে কিন্তু ফ্রেশ স্টার্ট বলে একটা কথা খুব চালু। অর্থাৎ নতুন করে সবকিছু শুরু করতে দেওয়া। এর মানে কী — এর মানে হলো পুরানো যা কিছু নেগেটিভ রিপোর্ট — তার সমস্তকে ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু অভিযুক্ত শিশুর বয়স এই হেইন্যস নেচারের অফেন্স করার সময় যদি ষোলো বা তার বেশী হয়, এবং যদি সে আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত না হয় এবং দণ্ডপ্রাপ্ত হয়, তাহলে কিন্তু তার ফ্রেশ স্টার্ট হবে না। এর মানে, খুব সিম্পল — তার কোনও কাজকর্মের রেকর্ড কিন্তু রয়ে যাবে, অর্থাৎ সরকারী চাকরি পাওয়ার পথে যেটা বড়ো একটা বাধা, সেটা যদি বা সামহাউ পেরোনোও যায়, পাসপোর্ট আর ভিসা পাওয়ার স্পেসটা কিন্তু এইসব রেকর্ড স্কুইজ করে দেবে। তুই... তোর ড্রিম কেরিয়ার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, যাদের কেরিয়ার অপ্টিমাইজড হয় বিদেশে। রাইট?’
মাথা নাড়ে ***। মুহ্যমান সে। তার দীর্ঘশ্বাসে সেটা লেখা থাকে। আমি স্পষ্ট পড়তে পারি। আমি বলে দিইঃ ‘দ্য বলগেম ইজ নাও ওয়াইড ওপ্যেন, অ্যান্ড দ্য বল ইজ ইন ইয়োর কোর্ট। অ্যানালাইজ ইয়োর ট্র্যাজেক্টরি অ্যান্ড ডিসাইড অ্যাকোর্ডিংলি। আয়্যাম ডান হিয়ার। যেটা বলার বাকী সেটা একটা বাক্য — আমি জানি, গোটা ব্যাপারটা তোর... তুই ভেবে নিয়েছিস একটা মেয়ের প্রেক্ষিতে, যে তোর প্রব্যাবল গার্লফ্রেন্ড। কিন্তু এটা অ্যাজেন্ডার। আমি যেটা বলতে চাইছি — এটা তোর বন্ধুদের মধ্যে যারা বায় সেক্স অ্যান্ড বায় জেন্ডার ছেলে, সেই তাদের ক্ষেত্রেও ইক্যুয়ালি অ্যাপ্লিকেবল।’
প্রায় গোটা একটা মিনিট চুপ করে থাকে ***। মুখ তার নীচু। সে আমার ঘরের মেঝে দেখছে। তারপর মুখ তোলে সে। তার মুখে ম্লান হাসি। সে বলেঃ ‘জানো, নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছে যে, পাঁচ বছর তো হোস্টেলে কাটিয়ে এলাম। একটা ঘরে আমরা চার জন করে ছেলে থাকতাম। তা এমন অভিযোগ আমার নামে নেই। আমাদের কারোর নামেই নেই অবশ্য।’
আমি অর্গল তুলিঃ ‘লেট’স ক্লোজ দিস চ্যাপ্টার হিয়ার। অ্যান্ড ইয়েপ, ইউ পিপল আর লাকি। হোয়াট মোর ক্যুড আই স্যে! আর হ্যাঁ, একবার আবার — আমাদের সময়টা এমন ছিলো না। পিরিয়ড।’
খুব করুণা হলো ***-এর ওপরঃ ‘আচ্ছা তোকে একটা ব্রিদার দিই তাহলে। তুই যেরকম মনখারাপ করে বসে আছিস… শোন্, প্রেম যদি করতেই হয়, এই সামনের দু বছরের মধ্যে, তাহলে তুই তোর থেকে দু বছরের বড়ো, মানে, ফার্স্ট ইয়ারের কোনও মেয়ের সঙ্গে করবি।’
***-কে দেখে মনে হলো সেই ছেলেটা যে একটা বহুদিনের পরিত্যক্ত বাড়ীতে ঢুকতে গিয়ে এন্ট্রাসের মুখে জমা মাকড়সার জাল, ধুলো সরাচ্ছেঃ ‘এতে কী লাভ হবে?’
আমি হেসে ফেলিঃ ‘কিছুই তেমন নয়। তবে কিনা, জীবনের প্রথম প্রেমে ফিজিক্যাল ইন্টিম্যাসি তো প্রায় অবধারিত, তাই তোর ক্ষেত্রে এমনটা হলে, তুই যেহেতু আঠেরো বছরে কম, তুই হয়ে যাবি ভিক্টিম, আর তোর গার্লফ্রেন্ড এইট্টিন প্লাস হওয়ায় হয়ে যাবে পার্প। তখন তাকে অ্যাপ্রিহেন্ড করা যাবে। পকসো আইনে চেই ব্যাপারে কোনও উল্লেখ নেই, কিন্তু এরকম একটা ব্যাপার হলে আমরা লড়ে দেখবো। আমাদের জেতার চ্যান্সই বেশী।’
*** আমার দিকে চেয়ে এমনভাবে একটা হাসে যার কোনও মানে আমি বের করতে পারি না। আমি জাল গোটাতে নামিঃ ‘তাহলে, একটা সামারি বানানো যাক, কমক্ষণ তো আড্ডা মারছি না আমরা, কী বল? তোর তো ডিনার টাইম পেরিয়ে গেছে বোধহয়।’
*** হেসে ফেলেঃ ‘হোস্টেল হলে আমরা এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছি। আজ অবশ্য সব ছাড়, মা-বাবা জানে, আজ আমার দেরী হবে।’
আমি বুকে বল পাইঃ ‘ তাহলে... লেট’স মেক দ্য সামারি ফার্স্ট —
এক. কম্পিউটার সায়েন্স নয়, বায়োলজি অর্থাৎ পিওর সায়েন্স নিয়েই পড়তে যাচ্ছিস তুই।
দুই. ইংরেজী তুই পিন্টু স্যারের কাছেই পড়বি। এবং বর্ষার জল পাড়িয়েই পড়তে যাবি। ইয়োর ফ্রীঞ্জ বেনেফিট ইজ — একটি সুন্দরী মেয়ে সান্নিধ্য। তবে সেই সান্নিধ্য নিতে নিতে এই মেজারমেন্টটাও নিতে ভুলিস না, যে, রিয়া লেখাপড়াটা কেমন করছে।
তিন. কিছু অহংকার মনের মধ্যে সযত্নে তুই পুষবি, যার কথা পৃথিবী জানবে না। কিন্তু পাশাপাশি, সেই অহংকার যাতে দীর্ঘস্থায়ী হয়, এবং ফাঁপা না হয়, তার দিকে খেয়াল রাখবি।
চার. লম্বা হোস্টেল লাইফ কাটানোর জন্য অনেক ম্যাচুরিটি তোর মধ্যে আগে ক্রীপ করেছে, আবার কনফাইন্ড লাইফ লিড করার জন্য তুই বাইরের পৃথিবীকে খুব বেশী চিনিস না। স্যুইডিশ ভাষায় একটা শব্দ আছে — লগম — এল এ জি ও এম, এটা নিয়ে ওদের গর্বের শেষ নেই যে, এই একই অর্থ বোঝাতে বাকী পৃথিবী দুটো, তিনটে এমনকি চারটে শব্দও ব্যবহার করে, সেখানে ওরা পাঁচ অক্ষরের একটা শব্দে মানেটাকে বুঝিয়ে দেয়। লগমের মানে হলো — নট টু মাচ, নট টু লিটল, বা জাষ্ট রাইট, বাংলায় এর কাছাকাছি শব্দ যথেষ্ট, বা ঠিকঠাক। যখন বাইরের পৃথিবীতে, তখন তুই সকলের মাঝে থেকেও একা, নিজের বাউন্ডারি মেইনটেইন করবি। আর লগম -এই শব্দটাকে অন্যের সঙ্গে ইন্ট্যার্যাক্ট করার সময় মাথায় রাখবি।
পাঁচ. এই দু বছরে তোর আমার ফ্রী টাইমে আমরা নানা ধরনের গান নিয়ে আলোচনা করবো।
সো, উই আর ডান ফর টুড্যে।’
*** আহত স্বরে জিজ্ঞাসা করেঃ ‘আর স্যার-ম্যাডাম? তুমি এখানে কিছু করে দেবে না আমায়?’
আমি হেসে ফেলিঃ ‘হ্যাঁ রে ***, আমি তোদের মেইন্সট্রিম লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছি বছর আটাশ আগে, আমি কোথা থেকে জানবো? তুই কি কাউকেই স্পট করতে পারিস নি?’
হেসে ফেলে *** বললোঃ ‘দেশবন্ধু পার্কের দিকে একটা কোচিং সেন্টারের কথা জানতে পেরেছি — সেখানকার ফিজিক্স টীচার খুব ভালো। এইচ এসের জন্য মাসে আটশো করে নেন আর এইচ এস প্লাস জে ই ই হলে ষোলোশো।’
আমি চেয়ারের ব্যাকরেস্ট থেকে ঠলে উঠিঃ ‘এক্সকিউজ মী, মাই বয়। ক্যুড ইউ প্লীজ রিপিট?’
*** খুব শান্ত স্বরে বললোঃ ‘এইচ এসের জন্য মাসে আটশো। জে ই ই হলে মাসে আরও আটশো। অর্থাৎ, এইচ এস প্লাস জে ই ই হলে ষোলোশো।’
ঠিক এইসময় একরাশ জলের বোতল ভরে জয়িতা ঘরে ঢুকছিলো, আমি তাকে বললাম ***-এর সম্ভাব্য ফিজিক্স টীচারের ফীজ স্ট্রাকচার। জয়িতার অবস্থাও আমারই মতো। সে ঠোঁট উল্টোলো। *** ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিলো জয়িতার দিকে। তার কাছ থেকে মনপসন্দ জবাব না মেলায় আমার দিকে ফিরে খতিয়ান দিতে বসলোঃ ‘কেন, ঠিকই তো আছে। জে ই ই-এর জন্য তো অন্য দিন ক্লাস হয়। মাসে চারটে।’
আমি হেসে ফেললামঃ ‘অহ্, এটা তোর কাছেও র্যাশানাল! তব কেয়া... আগর মিঞা-বিবি রাজী তো, হামলোগ য্যয়সা পাজি আর কী করতে পারে...। আর বল?’
*** বলে যেতে থাকলোঃ ‘বাংলা আর বায়োলজির জন্য দুজন ম্যাডামের নাম পাওয়া গেছে। তবে আমি —
থামিয়ে দিলাম ***-কে। দিতেই হলো। বললামঃ ‘হিয়ার আই ক্যান সী স্টাম্বলিং স্টাডস। আগে বায়োলজিকে ধরা যাক, ক্লাস ইলেভেন টুয়েলেভের বায়োলজি কিন্তু মিয়্যার ব্যাঙের জননতন্ত্র নয়। অনেক ইন ডিটেইলসে যাবে ম্যাটারটা। হিউম্যান রেসকেও ধরবে। তুই কি একজন মহিলার কাছ থেকে এগুলো শুনতে শিখতে আন-ইজি ফীল করবি না?’
*** একটা আড়মোড়া ভাঙে।
আমি বলে উঠিঃ ‘দেন ফাইন। গো অ্যাহেড। কিন্তু বাংলার টীচার একজন মেয়ে এতে আমার তীব্র রিজার্ভেশন আছে।’
*** জিজ্ঞাসা করেঃ ‘কেন?’
আমি খুব স্বর রেখে বলে যেতে থাকলামঃ ‘***, ঘটনাটা দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, মেয়েরা সাহিত্যের কিচ্ছু বোঝেন না। আমি গ্লোবাল উইমেন ধরে বলছি। যদি মেয়েরা সেটা বুঝতেন, তাহলে তার রিফ্লেকশন সাহিত্য রচনাতেও আমরা নির্ঘাত পেতাম। তো, এক ভার্জিনিয়া উল্ফকে বাদ দিলে মেয়েদেরকে কোনওদিনই প্রথাকে ভেঙে তছনছ করে দিয়ে নতুনভাবে কিছু লিখতে দেখা যায় নি। আমি মহিলা লেখকদের জন্য যে কোনওরকম ভাঙচুর দেখতে প্রস্তুত আছি। ছেলেদের জন্য কিন্তু তা নয় — ছেলেদের ক্ষেত্রে নতুন কো-অর্ডিনেটের সন্ধান না পেলে শুধু ভেঙে দেওয়ার জন্য ভেঙে দেওয়া একদমই এক্সপেক্টেড নয়। এতে মানুষের শান্তি ভাঙে। মহিলা লেখকদের জন্য সেই শান্তিকেও, যা কিনা পরম, আমি বাজী রাখতে রাজী আছি। আমার খুব প্রিয় লেখিকা আশাপূর্ণা দেবী, মেয়েদের কথা, তাদের কষ্ট, যন্ত্রণা, সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, হাহাকার সব উঠে এলো তাঁর কলমে, আমরা অভিভূত হলাম, কিন্তু তাঁর পরে যাঁরা এলেন, তাঁরাও মেয়েদের কথাই বললেন, কিন্তু সেটা একদমই প্রথাগতভাবে। সাহিত্য কলম ধরলেই হয় না। অক্ষর কুঁদে কুঁদে শুদ্ধ বাংলা লিখতে জানলেই লেখক হওয়া যায় না। আমি বাংলা গদ্য সাহিত্যের কথা বলছি। পদ্যে বাঙালী অনেক এগিয়ে গিয়েছে। ভারতীয় মেয়েদের সমস্যা অনেক, কিন্তু বিদেশী মেয়েদের, ইউরোপে অন্ততঃ ফ্রীডম অনেক বেশী, কিন্তু কই, মেয়েরা তো পারলেন না। আমার মনে হয়, মেয়েদের পক্ষে এটা সম্ভবও নয়। ওয়েল, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বা কোনও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চ্যান্স না পেলে তো তুই মেডিকেলে ভর্তি হবি। তখন তোর কাছ থেকেই জেনে নেবো মেয়েদের এই অক্ষমতার পিছনে হিপোক্যাম্পাস, অ্যামিগডালা, আর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আদৌ কোনও ভূমিকা রাখে কিনা, রাখলে, কী রোল তারা প্লে করে? নাকি, গোটা কারণটাই কন্ডিশনিংয়ের মধ্যেই পড়ে আছে। বায় দ্য ওয়্যে, তোর বয়সী ছেলেদের আড্ডা আর মেয়েদের আড্ডার কনটেন্ট, আড্ডা মারার জঁর, মানে, ধরন কিংবা ডিকশন মানে, কি কী শব্দ দুটো গ্রুপ ইউজ করছে — খেয়াল করিস তো।’
***-কে উচ্ছ্বসিত শোনালোঃ ‘মেয়েরা ভীষণ অন্য কারোর সম্পর্কে তার আড়ালে কথা বলে। কিন্তু ছেলেরা অমন নয়, আমাদের আড্ডায় যে কোনও বিষয় সরাসরি আসে।’
আমি একটু নিরস্ত করলাম ছেলেটাকেঃ ‘এত তাড়াতড়ি সিদ্ধান্তে আসিস না। কে বলতে পারে, মেয়েদের আড্ডার ওই আড়ালে কথা বলা হয়তঃ ভূমিকা মাত্র। তারপরই হয়তঃ খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা ওঠে। ইউ আর জাষ্ট সাপোজড টু কীপ ইয়োর আইজ ওপ্যেন নাও। অ্যান্ড ইউ নো, সীয়িং ইজ বিলিভিং। ওটা একঝলকে হয় না, ওটা পর্যবেক্ষণের ব্যাপার। ইউ নীড টু পেরুজ ইট। পেরুজ মানে খুঁটিয়ে দেখা।’
ঘাড় নাড়ে ***। আমি বলিঃ ‘তাহলে লিট গ্রুপের জন্য দুজন টীচার ছেলে। কারণ মেয়েরা এবং সাহিত্য — ঠিক এক ড্র-তে ঠিক পড়ে নি, বুঝলি। আলাদা গ্রুপে আছে। এখন তো গ্রুপের খেলা চলছে। নক-আউট ফেজে দেখা যাবে কী স্ট্রাকচার দাঁড়ায়।
তবে সাহিত্যের ক্ষেত্রে মেয়েরা বোঝে না — এরকম একটা জেনেরিক স্টেটমেন্টের তলায় এটাও মেনশনড থাকুক যে, মেয়েরা সাহিত্য না বুঝে সাহিত্যের যেটুকু ক্ষতি করেছে, সাহিত্য বুঝে তার থেকে ঢের বেশী ক্ষতি করেছে ছেলেরা।’
*** ধাঁধায় পড়ে যায়ঃ ‘মানে?’
আমি কৈফিয়ত দিতে থাকিঃ ‘একটা এক্সাম্পল নেওয়া যাক। তুই স্ট্রেঞ্জার বলে কোনও শব্দ শুনেছিস? ইংরেজী শব্দ?’
*** মাথা নাড়ে সদর্থক। বলেঃ ‘হ্যাঁ।’
আমি জানতে চাইঃ ‘ওর বাংলা মানে কী? জানিস কিছু?’
*** আমতা আমতা করেঃ ‘স্ট্রেঞ্জার মানে হলো... কি বলবো... অপ... অপরিচিত... মানে, চিনি জানি না এমন... মানে...
আমি ধমক দিইঃ ‘অতো কুঁইকুঁই করছিস কেন? স্ট্রেঞ্জার মানে তো অপরিচিতই। অচেনাও বলা যায়। বিদেশী বললেও কেউ কান মুলে দেবে না। ঠিকই তো বলেছিস!’
*** ব্যাখ্যাত হয়ঃ ‘না, মানে ঠিক শিওর ছিলাম না কিনা —
আমি ওর বিনয়কে পাত্তা দিই নাঃ ‘ধর কোনও একটা ভাষায় দ্য, মানে টি এইচ এ — দ্য-কে, লে বলা হয়। এবার সেই ভাষাতেও স্ট্রেঞ্জার শব্দটা একটু আলাদাভাবে আছে — এট্রেঞ্জ্যের। তাহলে সেই ভাষা থেকে ল্যেট্রেঞ্জ্যের শব্দটা ইংরেজীতে অনুবাদ হলে কী হবে?’
*** ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে থাকে। আমি বলে উঠিঃ ‘স্টপ ওভারথিংকিং। ওভারডান টাস্কস রিয়েলি অ্যানয় মী।’
***-এর মুখে তবুও কোনও কথা নেই। আমি তিতিবিরক্ত হতে থাকিঃ ‘তুই তো স্ট্রেঞ্জার শব্দের মানে বলতে পারলি দেখলাম। তা ওটা কোন্ ভাষা থেকে তরজমা করলি? মঙ্গল গ্রহের কোনও ভাষা থেকে নাকি?’
*** খুব মৃদুস্বরে বলেঃ ‘ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ।’
আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠিঃ ‘আর আমি তো বললাম, ল্যে এর ইংরেজী অর্থ দ্য। তাহলে বলছিস না কেন?’
*** মরীয়া বলে দেয়ঃ ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার।’
আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়িঃ ‘কামাল হ্যায়, ইয়ার। একজন শিক্ষিত ছেলের পেটে লাথি মেরে তার কাছ থেকে উত্তর বার করতে হচ্ছে — এটা লজ্জার। শোন, যেটা জানিস, সেটা, হতেই পারে, ভুল জানিস, কিন্তু সেটা না বলাটা আনবিয়ারেবল। ফ্রম লিসনার'স সাইড। তোর ভুল জানাকে কারেকশন করে দিলেও তুই যদি কারেক্টেড ভার্সনটা মগজে আপডেট করে না নিস, তবে তোর লজ্জা। তার আগে তোর লজ্জা পাওয়ার মতো কিছু নেই।’
*** জড়তামাখা হাসেঃ ‘আসলে আমি বুঝতে চাইছিলাম, তুমি আলোচনাটা কোন্দিকে নিয়ে যেতে চাইছ?’
আমি ওকে উত্তর করলামঃ ‘আমার ভাবনার দিকে। তুই আমার ভাবনাটাকে ধরতে চাইছিলি, কিন্তু ওটার প্রয়োজন নেই। ওটা আপনিই আসবে তোর কাছে আসবে বলেই উদাহরণটা নেওয়া। তো শোন, ল্যেট্রেঞ্জ্যের যদি কোনও উপন্যাসের নাম হয়, তাহলে তার ইংরেজী অনুবাদের নামটা, তুই যেমন বললি, দ্য স্ট্রেঞ্জার হওয়াই উচিত। কিন্তু যদি তার নাম পাল্টে দ্য আউটসাইডার করে দেওয়া হয়, তাহলে ড্যুড, কেসটা কিন্তু জন্ডিস হয়ে গেলো।’
*** জিজ্ঞাসা করলোঃ ‘কেন?’
আমি নড়েচড়ে বসলামঃ ‘বেশ তো। একটু তলিয়ে ভেবে দেখা যাক ব্যাপারটাকে। মূল উপন্যাসের নাম হলো গিয়ে তোর, বাংলায় বলা যাক — অচেনা বা অপরিচিত। আর ইংরেজী অনুবাদের নাম — বহিরাগত। আউটসাইডার, সামথিং দ্যাট কামস ফ্রম দ্য আউটসাইড, রেসট্রিক্টিভ ক্লজ, তাই দ্যাট, হুইচ নয়। এই নামে কী হলো? — নাহ, নামে কী আসে যায় ব্যাপারটা লিটারেচারে খাটে না; আমাদের একটা টেক্সট পিস দিয়ে ছোটবেলায় লিখতে বলা হতো, নামকরণ সঠিক কিনা লিখো। সে যাক, আমাদের ছোটবেলার প্রসঙ্গ থাক, কারণ এবার প্রসঙ্গ উঠলে আমাদের চিতাবেলার প্রসঙ্গ উঠবে।’
*** লজ্জা পেয়ে যায়, অগ্রাহ্য করতে চায় আমাকেঃ ‘ধ্যাত। তুমি এক একটা কথা কী যে বলো না —
আমি গাঢ় হইঃ ‘সত্যের স্বাদ কখন কেমন বলা খুব টাফ, কেননা সত্যি খুব সন্দেহজনক সত্যি। তাছাড়াও সত্যি প্রতিনিয়ত বদলে যায়, আর সেই কারণেই চরম বা পরম সত্য বলে পৃথিবীতে কিছু নেই —
সহসা আমার যেন সাড় ফেরেঃ ‘উপস। এই... মানে, ভুল কথা ভুল জায়গায়। ভুলে যা। ভুলে যা। গিয়েছিস? এহেম, ইয়ে, কী করবি বল, সত্যের স্বাদ তেতো হলেও সেটা সত্যি। সে যাক, যে কথা হচ্ছিলো, অচেনা যে তাকে তো আমি চিনি না, ল্যেট্রেঞ্জ্যের একটা উপন্যাস, সেখানে যাকে এট্রেঞ্জ্যের বা স্ট্রেঞ্জার বলা হয়েছে, সে কোনও আননোন ফরেন বডি নয় — একটা মানুষ। রক্ত-মাংসের একটা গোটা মানুষ। তা সে মানুষটাকে আগে চিনবো, জানবো, তবে না বলতে পারবো সে আউটসাইডার না ইনসাইডার। লেখক নিজে লিখেও তাঁকে ঠিক চিনতে পারলেন না, আর অনুবাদকে অনুবাদ করে চিনে ফেললেন! আর যদিও বা এই চেনা সঠিক চেনা হতোও, সেটা কি কেউ অন্যকে আগে থেকে জানিয়ে দেয় নাকি, যে কিনা বইটা পড়ে নি? এ তো মার্ডার মিস্ট্রি বইয়ের মতো হয়ে গেলো, কেউ পড়তে যাওয়ার আগেই তাকে খুনী কে, সেটা জানিয়ে দেওয়া। যদিও এই ক্ষেত্রে অনুবাদকেরা মোটেও ঠিক ছিলেন না, তাঁরা সাহিত্যের তাত্ত্বিকদের আগে থাকতে মাথায় রেখে অনুবাদ করেছিলেন, যে জন্য নামটা অমন হয়েছে। এঁরা বেশী বুঝে বুজকুড়ি মেরে গিয়েছিলেন, বুঝলি ***। মেয়েরা বোঝেন নি আজও যে, সাহিত্য কোথায় থাকে, আর ছেলেদের মধ্যে, যাঁরা বোঝেন, তাঁদের ৮০% হার্মফুল। এঁরা ভাষার আগে ভাষার ব্যাকরণকে রাখেন। তোকে আমি আরও কিছু উদাহরণ দেবো। তবে আজ নয়, পরে। তুই পরিষ্কার বুঝে যাবি কোন্টা দুধ, আর কোন্টা জল।’
*** কিছু বলে না। সে বোধহয় হড়পা বানে অনেক দূরে সরে গেছে। আমি বলে যেতে থাকিঃ 'তাহলে বায়োলজি, অ্যাজ ডিসকাসড অলরেডি, ইজ ইয়োর কল। আমাদের ইতিহাস গার্গী আর মৈত্রেয়ীদের কথা বলে, প্রফেসর নীনা গুপ্ত’র মতো কন্টেম্পোরারি ম্যাথ উইজার্ডও আমাদের চোখের সামনে, আমরা ডঃ পারিমালা রমন, ডঃ সুজাতা রামদোরাই-এর নামও শুনেছি। তবুও আমি তোকে সাজেস্ট করবো, তুই অঙ্কটাও কোনও মাস্টার মশাইয়ের কাছে শেখ। এতক্ষণ মেয়েদের অনেক নিন্দে করলাম। এবার যেঝানে মেয়েরা অনন্যা, অসামান্যা — আয় সেদিকটাও দেখি, মহিলাদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে কানেক্টিভিটি তুলনামূলকভাবে বেশী, এবং তার জন্য মেয়েরা ছেলেদের থেকে অনেক বেশী মাল্টিটাস্কার, শ্যাডল ডিটেইল ধরে ধরে কাজ করতে পারেন তাঁরা, মহিলাদের হিপোক্যাম্পাসে প্লাস্টিসিটি মানে, নতুন নিউরন তৈরীর হার ছেলেদের থেকে বেশি, যে জন্য মেয়েদের টেম্পোর্যারী মেমোরি বেশী। আর নতুন নিউরনগুলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে কানেক্টিভিটিতে একটা পজিটিভ ইন্টারপ্লে করে, যার জন্য মেয়েরা খুব মেথডিক্যাল হয়ে থাকেন। সেদিন একটা জার্নালে পড়ছিলাম এগুলো। মেডিকেল সায়েন্সে নিশ্চয়ই এগুলো পড়ানো হবে। এগুলো বলার উদ্দেশ্য একটাই মেয়েরা টীচার হিসেবে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর বায়োলজির খুব ভালো টীচার হবেন। তুই বায়োলজিতে তো একজনকে পেয়েই গিয়েছিস, তোর কোনও হেজিটেশনও নেই… গ্রেট, এবার ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি’র জন্য একজন করে দিদিমণি খোঁজ। তুই যে স্কুলে পড়তে যাচ্ছিস, ওই স্কুলে আমার এক বন্ধু, সে মেয়ে, পড়ায়। আমরা ইলেভেন-টুয়েলভে একসঙ্গে পড়েছি। তার সুভাষগ্রামে বাড়ী। দেখি, তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবো।’
***-কে নিশ্চিন্ত শোনায়ঃ ‘যাক, একটা ভাবনা আপাততঃ কাটলো।’
আমি ওকে হতাশ করলামঃ ‘নাহ, কই, কাটে নি তো। কোনও ব্যাপারে না আঁচালে তুই শিওর হতে পারিস না যে, তোর খাওয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। এনিওয়ে, টেক্সট বুক কিনে ফেল। আমাকে যিনি অঙ্ক শিখিয়েছিলেন, তিনি রিটায়ার করেছেন, রিসেন্টলি। আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলবো। আর এবার তোর একটা মোবাইল, ট্যাব উইথ কলিং ফেসিলিটি হলে ভালো হয়, দরকার। আর একটা ব্রডব্যান্ড কানেকশন। দেখিস ***, ইন্টারনেট পেয়ে গেলে সোশ্যাল মিডিয়ায় গিয়ে যেন হুজ্জোতি বাধাস না। ওগুলো সময় পোড়ানোর পক্ষে মোক্ষম।
একটু থামি আমি। তারপর বলি, জানি না অনেকক্ষণ ধরে ক্লান্ত থাকার জন্যই কি না, জানি ক্লান্ত শোনায় আমার গলাঃ ‘এইখানে তোকে কিন্তু নিজের কাছে নিজে সৎ থাকতে হবে। ইন্টারনেটে পর্ন দেখবি না — এমন নীতি জ্ঞান আমি তোকে দিতে চাই না। আমি শুধু বলতে চাই যে, বেলার দিকে, কিংবা দুপুরের দিকে যখন বাবা দরজা নক করবে, ব্রাউজারের ট্যাব পাল্টে তুই মা’কে বেলাতে আর বাবাকে দুপুরে ধোঁকা দিতেই পারিস, কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণে না রাখলে কিন্তু বিকেলবেলায় নিজেকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য কিছু আর পড়ে থাকবে না, কেননা ততক্ষণে তোর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বপ্ন, তোর কেরিয়ার তোকে ধোঁকা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। হয়তঃ তোকে এটা অনেকেই এই ফর্ম্যাটে না হলেও অন্য ফর্ম্যাটে বলেছে, কিন্তু ব্যাপারটাকে অবজেক্ট-স্পেসিফিক করে দিলাম। আর একটা তথ্য তোকে দেওয়া দরকার — প্রবলেম্যাটিক পর্নোগ্রাফি ইউজ বা পি পি ইউ বলে একটা টার্ম নানা রকম সার্ভে থেকে উঠে আসছে, ডব্লু এইচ ও-এর ইন্টারন্যাশানাল ক্ল্যাসিফিকেশন অফ ডিজিজ এর ১১ নম্বর সংস্করণ কিন্তু এটাকে ইমপালস্ কন্ট্রোল ডিসঅর্ডার বলে হেঁকে দিয়েছে। ডিসঅর্ডার বলার কারণ হিসেবে দেখিয়েছে, মানুষ পর্নের প্রতি আগ্রহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, ভুল জেনেও বারবার একই কাজ করে ফেলছে, আর সেটা জীবনে সমস্যা তৈরি করছে। জীবন বলতে দাম্পত্য জীবন, কেমন? যদি বা পর্নকে ট্যাঁকে করে নিয়েও যদি বা একটা ভালো সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কোনও মতে হয়েও যাস, যদি বা একটা ভালো জায়গাতে চাকরী মিলেও যায়, তাহলেও ইউ মাইট নট গেট আ গুড লাইফ। আমি এই প্রসঙ্গ এখানে শেষ করছি। পিরিয়ড।
থামি। আবারও শুরু হইঃ ‘আর একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট, এটা আমি এক্কেবারে প্রথমে তোকে করেছিলাম, কিন্তু তখন করা আমার উচিত হয় নি, কারণ তুই মিথ্যে বলতিস। কিন্তু এখন ঘরের রঙ পাল্টে গেছে, এখন আমরা অনেক ইন্টিমেট হয় গিয়েছি। এবার তোকে জিজ্ঞাসা করাই যায়ঃ ডু ইউ স্মোক?’
*** আলতো করে জিজ্ঞাসা করলোঃ ‘তুমি তখন আমায় শুধু জিজ্ঞাসা করো নি। অফার করেছিলে। তা তখন বা এখন, আমি যদি সত্যি বলি, তুমি কি আবার আমায় সিগারেট অফার করবে?’
আমি নিরাসক্তভাবে বললামঃ ‘নাহ্, ডায়রেক্টলি অফার করবো না। তবে প্যাকেটটা রেখে উঠে যাবো। তুই ধরিয়ে নিলে ফিরে আসবো। জানবো ওটা তোর পকেটেই ছিলো। আমি তোকে দিই নি, কিংবা তুই আমার প্যাকেট থেকে নিস নি। সিগারেট বিড়ি খাস?’
হেসে ফেলে ***। তারপর বলেঃ ‘না গো, আমার কোনও নেশা নেই।’
‘আই সী’ বলে ফেলি আমিঃ ‘বেশ ডিপ্লোম্যাটিক্যালি অ্যান্সারটা করলি তো! এনিওয়ে, তোর হোস্টেল লাইফের দিকে ঝাড়ি মারার কোনও উদ্দেশ্য আমার ছিলো না। এখনও নেই। আমি যেটা বলতে চাইছি, সেটা হলো, এবার তোর নয়ুন স্কুল, নতুন বন্ধু যদি সিগারেট বিড়ি ধরে ফেলিসও বা, যেদিন ধরবি, সেদিনই বাড়ীতে এসে বাবা-মাকে বলে দিবি। মনে রাখিস, তোর যে কোনও অ্যাক্টিভিটি ভালো অথবা খারাপ, কিংবা যেটা ভালো বা খারাপ কোনওটাই নয়, তুই জাষ্ট ইনভলভড আছিস — তোর বাবা-মা সেটা তোর মুখ থেকেই সরাসরি শুনতে চাইবে। দ্বিতীয় কারোর মুখ থেকে নয়। আর গ্র্যাস, অ্যালকোহল প্রসঙ্গে একটাই কথা, দেখ ***, যদি তোর ড্রিম কেরিয়ার রিয়েলিটিতে শেপ পায়, তাহলে কলেজ জীবনে তোকে মদ-গাঁজা খেতেই হবে। তোর পীয়ার প্রেশার তোকে বাধ্য করবে। ওটা নাহয় ওইসময়ের জন্যই তুলে রাখ। আর কী... এবার একটা বোল্ড পিরিয়ড।
‘ওহ্, ভালো কথা—’ আমি জানতে চাইঃ ‘ইংরেজীতে যেটা স্ট্রেঞ্জার, ফ্রেঞ্চে সেটাই এট্রেঞ্জ্যের — তোর কী এটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিলো?’
*** উদাস স্বরে বলেঃ ‘দুটো দেশ কাছাকাছি। ভাষাদুটোও বোধহয় একটাই ভাষা মানে, ল্যাটিন থেকে এসেছে। আর দুটো শব্দ যে সমার্থক, সেটা তোমার প্রশ্ন করার ধরন থেকে টের পাচ্ছিলাম।’
অবাক হই, হতেই হয়। একটা উত্তর করার আগে এই জেন জ়ি কত ভাবে! আমাদের সময় তো মুখে এলো, বলে ফেললুম - পোঁদে এলো, হেগে ফেললুম চলত। আসলে এত দায় তখনই নিতে হয় নি আমাদের। আর এরা তো একটা ভুল উত্তর করলেই লো ই কিউ’র রেল্মে চলে যেতে বাধ্য হবে। অস্তিত্ব রাখা কী আজব চীজঃ ‘তবু একটা উত্তর করতেই কী হেজিটেটই না করছিলি! তবে ইংরেজীর অরিজিন কিন্তু ল্যাটিন নয়। আমি যতদূর জানি, ইংরেজী ভাষা এসেছে জার্মানিক উপজাতিদের ভাষা থেকে। আর তার হরফ ল্যাটিন। যেখানে ফ্রেঞ্চের উৎসই হলো স্ল্যাং ল্যাটিন, এটা অবশ্য ওরা বলে, আমি ঠিক স্ল্যাং শব্দটা ইউজ করতে চাই না, এটা কলোকীয়াল ল্যাটিন — এমন কিছু একটা ধরলেই ভালো। ওরা ফ্রেঞ্চের উৎস হিসেবে রোমান্টিক ল্যাটিনও বলে, এবং সেটারও মানে আমি বুঝি নি। তবে ফ্রেঞ্চ ভাষা তৈরীই হয়েছে ল্যাটিন থেকে, এর সহজ মানে একটাই — ফ্রেঞ্চের স্ক্রীপ্টটাও ল্যাটিন থেকে পাওয়া।’
*** শুধোয় আগ্রহেঃ ‘আর ল্যাটিন কোথা থেকে এলো?’
আমি ফ্যাসাদে পড়ে যাই। বিস্রস্ত শোনায় বোধহয় আমার স্বরঃ ‘তুই দেখছি আমাকে মিস্টার নো ইট অল ধরে নিলি! মুশকিলে ফেললি। আমি কোনও জেন্টলম্যান জিম নই, কোনও স্মার্ট অ্যালেক-ও নই। আমার যদ্দুর ধারণা যায়, বুঝলি ***, ল্যাটিন স্ক্রিপ্ট গ্রীকদের থেকে নেওয়া। গ্রীক স্ক্রিপ্ট ওয়জ ডীপলি ইন্সপায়ার্ড বায় আলেফ ল্যাঙ্গুয়েজ। এটা ফিনিশদের ভাষা, যেখানকার স্বরধ্বনিগুলোকে গ্রীকরা স্ক্রিপ্টিং করেছিলো। না হলে ভাওয়েল ছাড়া ভাষা হতো ইউরোপের। স্ক্যান্ডেভিয়া বল, সাউথ ইউরোপ বল — সবার। গ্রীকদের প্রতি সেজন্যই বোধহয় কৃতজ্ঞ এরা, আর সেই কৃতজ্ঞতাই গ্রীকদের ইউরো মোডে রেগুলারাইজ করানোর দিকে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নকে লিড করেছিলো। আদারওয়াইজ, ইনিশিয়ালি, গ্রীস ফাম্বল্ড আ লট ইন দ্য মার্কেটপ্লেসেস ড্রিভেন বায় ইউরো।’
‘আমার একটা প্রশ্ন আছে।’ এলান দেয় ***।
নাৎসী গিলোটিনের সামনে ছাপ্পামারা ইহুদীদের মুখও নিশ্চয়ই এমন হয়ে থাকবে, আমার যেমন হয়ঃ ‘বল্।’
*** খুব আস্তে আস্তে সুতো ছাড়তে থাকেঃ ‘তোমার সঙ্গে আগেও গল্প গুজব করেছি আমি। আমি দেখেছি, তুমি অকারণ বাংলার মধ্যে ভীষণ ইংলিশ ঢুকিয়ে দাও। তিন-চার খানা বাক্য ইংলিশে বলো। ঠিক আছে, তুমি না হয়, আমি ধরেই নিলাম যে, ইচ্ছে করে করো। কিন্তু এটা আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, এই প্রবণতা আমাদের জেনারেশনে... দেখো, কেউ ইংলিশ ভালো বলছে, তার প্রতি এনভিয়াস আমি নই, আমি অনেকের মতো পারি না হয়তঃ, কিন্তু একদিন পেরে যাবো। কিন্তু অকারণ ইংলিশ বলা... যেখানে আমি জানি, তারা সেই জায়গাটা বাংলায় রীতিমত ভালো বলতে পারবে... এইটা আমায় বিরক্ত করে, দুটো বাক্য... পুরোপুরি বাংলায় বললো, এবং ঠিক বললো, কিন্তু দুটোকে জুড়ে দিলো ‘বাট’ দিয়ে। ‘কিন্তু’ শব্দটা ওরা ভালোই জানে। কিন্তু জোর করে বাট বলছে।’
হেসে ফেললামঃ ‘তা মন্দ কী — একটা সিনোন্যিম তো বাড়ছে কিন্তু শব্দটার। এটা তো ভালোই।’
‘না’ *** প্রতিবাদ গেড়ে দেয়ঃ ‘ওরা এটা ডেলিবারেটলি করছে, ইচ্ছে করে করছে, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার জন্য।’
আমি আবারও হেসে ফেলিঃ ‘তাতেই বা দোষের কী আছে? ভাষার মধ্যে একটা সিগনেচার ক্রিয়েট করা — এটা খারাপ কোথায়, দিনের শেষে বাংলা ভাষাটারই তো একটা লাভ হলো। হলো না?’
*** প্রতিবাদ জারী রাখেঃ ‘না, হলো না। এই করে করে কিন্তু শব্দটা হারিয়ে যাচ্ছে। অযথা একটা শব্দকে মুছে দেওয়া হচ্ছে।’
আমি বলিঃ ‘তুই যাদের কথা বলছিস, তারাই কী একমাত্র বাংলা বলে? এই তো, তুই বলছিস। আমি বলছি। একটা ব্যালান্সড ডিসট্রিবিউশন না হয় আমরা মেইনটেইন করে যেতে থাকবো।’
‘তুমি বুঝছ না’ দৃশ্যতঃ বিরক্ত ***, তার বিরক্তি বাধাহীন থাকেঃ ‘এটা এরা করবে কেন? কী দোষ করেছে এই কিন্তু’র মতো শব্দগুলো—
আমি ওকে থামাইঃ ‘কারোর কোথাও দোষ নেই, ড্যুড। চিল। বাংলা ভাষা কোনওরকম জম্বি শেপ পেতে যাচ্ছে না। বরং এতেই ভাষা বাঁচছে। এবার কী তুই কেনকী নিয়েও আপত্তি করবি?’
উত্তেজিত হয়ে ওঠে ***, ওর হাত-পা শক্ত হয়ে উঠতে দেখি আমিঃ ‘একদম। অবশ্যই করবো। এটা একটা হিন্দির ফালতু অনুকরণ। এবং এটা অর্থহীন।’
আমি আমার কথা বলিঃ ‘এই রে, তুই তো বিশুদ্ধতাবাদী বৈয়াকরণিকদের মতো কথা বলছিস রে! কাম অন্ বয়, লুজেন আপ আ বিট। ভাষার ক্ষেত্রে যে সর্বংসহা হবে, গেম, সেট, ম্যাচ তার।’
*** অবাক হয়ঃ ‘মানে?’
আমি বলতে যেতে থাকিঃ ‘মানে আর কিছুই নয়, যা যা ইনপুট আসছে, প্রোডাকশন প্রসেসে সব ঢেলে দাও দ্বিধা না করে। ভাষার টুলো পন্ডিতদের একটা রুটি-রুজির দরকার ছিলো — তো, তারা ভাষার দরোয়ানগিরি করছে। কিন্তু ভাষা বহতা নদীর মতো। তার বিরাট খাত। এবং যে ভাষাটাকে ভালোবাসে, সে সেই খাতটাকে আরও চওড়া, আরও গভীর করে দেবে। সে সব নেবে। গ্রহণ করবে। হাসিমুখে গ্রহণ করবে। আমি একটা আমার একজাম্পল আগে দিই — প্রোবাবলি, বা হয়ত বানান আমি ইচ্ছে করে ভুল লিখি। হ উন্তুসত-অ ত বিসর্গ। যেখানে অ্যাক্সেপ্টেড বানান হ উন্তুসত-অ ত-এর ওকার। এক মাত্রার মধ্যে। আমি মানি না। ভাষা আমার, যখন টাকা নিয়ে কাজ করবো, তখন অ্যাক্সেপ্টেড বানান লিখবো। অন্য জায়গায় আমার যেমন ইচ্ছে হবে। আবিষ্কার বানান আমি বহু জায়গাতেই দন্তেস’য় ক লিখেছি। বেশ করেছি। ওসব অ-আ ভাওয়েল ছাড়া বাকী স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে মূর্ধন্য ষ দিতে হবে — এমন জ্যাঠামো আমি মানি না। ভাষা যে নিদান দিচ্ছে, তারও, ভাষা আমারও। তাছাড়া ভাষা অনেক আগে, ব্যাকরণ তাকে ফলো করা বশংবদ কুত্তা ছাড়া আর কিছু নয়। আর তাই, তাই আমার কাছে আমার বানান প্রমিত। অ্যাজ সিম্পল অ্যাজ দ্যাট। আমি ইংরেজীর ক্ষেত্রে এটা পারি না। আমি ইউ এস বানানবিধি, ওদের সিন্ট্যাক্স, সিমান্টিক্স ফলো করি, করার চেষ্টা করি। আমার অফিসে হায়ার অথোরিটি একদিন জিজ্ঞাসা করেও চেপে গিয়েছে, কারণ ইংরেজী তারও মাতৃভাষা নয়। তুই বেশ ওরিড দেখছি বাংলা ভাষাকে নিয়ে। আমি এ প্রসঙ্গে তোর সঙ্গে ভিভিড ডিসকাশনে যাবো, কিন্তু তুই তার আগে দন্ত্যে স, তালুব্য শ আর মুর্ধন্য ষ -এই তিনটের উচ্চারণ ফারাক করে করে শোনা আগে।
*** কিছু বলতে জেগে ওঠে। আমি তাকে থামাইঃ ইংরেজদের কাছে ফ্রম দ্য ভেরী বিগনিং, ফ্রম দ্য ভেরী অনসেট, ফ্রম দ্য ভেরী কমেন্সমেন্ট, ফ্রম দ্য ভেরী ইনিশিয়েশন ছিলো তো। তবু তারা অ্যাব ইনিশিও নিয়েছে ল্যাটিন থেকে। পুরো স্ক্রিপ্টটাকে নিয়ে নিজেদের মতো করে উচ্চারণ করেছে। আমেরিকানদের কাছে মার্কেট ছিলো, মার্কেটপ্লেস ছিলো, আউটলেট ছিলো, শপ ছিলো, শপিং মল ছিলো, রিটেইলার ছিলো, রিটেইল চ্যেইন ছিলো, ফেয়ার ছিলো — তবুও বাজার শব্দটাকে তারা ইনক্লুড করেছে। আমরাও তেমন নিয়ে যাচ্ছি। নেওয়ার সময় তুমি বাবা ভিখিরি, ভিখিরি হয়ে এটা নেবো, ওটা নেবো না — এসব তুমি করতে পারো না। আর যদি না নাও? তোমার ভাষাটা মজে আসা নদীর মতো হবে। তুমি ভাষাকে ভালোবাসলে রেগুলার বেসিসে সেখানে ড্রেজিং করবে। তুমি নতুন কিছু দিতে চাইছ — ভালো কথা, গড়াটাই তো কাজ, কিন্তু যাকে গড়লে, তার প্রয়োগ করে করে থাকে তো প্রতিষ্ঠা দিতে হবে, সেই পিতিষ্ঠে করা, মৃন্ময়ীকে চিন্ময়ী করে তোলার পদ্ধতির নামই হলো ভাঙা। হোয়াট আই মিন টু স্যে ইজ — ভাষাকে ভালোবেসে গড়ার দিকেই তুমি মন দেবে, কিন্তু সেই মনের একটা অংশ, আ স্লাইস অফ দ্যাট কনসেন্ট্রেশন থাকবে ভাঙার দিকে। নইলে যেটা গড়ছ তুমি, সেটা অ্যাক্সেসেপ্টেড বা রিজেক্টেড কিছুই হবে না — সেটা জাষ্ট অজানা থেকে যাবে।’
‘তার মানে তুমি বলতে চাও’ ***-এর অস্থিরতা থামে নি তখনওঃ ‘পোশাক পড়বে — সেখানে ড-এ শূন্য ড় আর বই পরবে — সেখানে ব-এ শূন্য র লিখলেও আমি কিছু বলতে পারবো না!’
আমি আবার হেসে ফেলি। তার পরে মুখটা কঠিন বানাই। বলিঃ ‘ডোন্ট এভার ট্রাই টু বী অ্যান এক্সট্রিমিস্ট। বইটা পড়ার জিনিস। ড-এ শূন্য ড়-ই থাকবে সেখানে। আর জিন্সটা পরার জিনিস। ব-এ শূন্য র-ই থাকবে সেখানে। ওটা ভুল লিখে স্বাধীনতা, অধিকার কপচালে ভুল।’
*** উত্তেজিত হয়ে ওঠে আবারওঃ ‘কিন্তু তোমার লজিক অনুযায়ী তো এটা—
আমি খুব শান্তভাবে বলিঃ ‘একটু আগে তোকে পকসো অ্যাক্ট বলার সময় বাউন্ডারির কথা বলেছিলাম, মনে আছে। এখানেও সেই একদম একই বাউন্ডারি। তবে অ্যাপ্লিকেশনটা আলাদা। দেখ ***, কে কী লিখবে, সেটা তার ব্যাপার। সেই লেখাটাকে কে কীভাবে নেবে, সেটা তার ব্যাপার। আমি তোকে যেটা বলতে পারি, ইউ জাষ্ট গো অন উইথ আ ফ্রী মাইন্ড, ফ্রী উইল। তবে…
থেমে যাই ইচ্ছে করে। ***-ও আমায় প্রতিধ্বনি করেঃ ‘তবে?’
আমি আলতো হেসে তাকে শলা দিইঃ ‘এই ডিসকাশনের ইম্মিডিয়েট এফেক্ট হিসেবে যেন পরীক্ষার খাতায় অধিকার দেখাতে যাস নি। ওটা নম্বরের ব্যাপার। তোকে পেতে হবে, আর দেবে অন্য কেউ। সে কম নম্বর দিলে তো আর তার কাছে ইন-পার্সন অ্যাপীয়ার করে বলতে পারবি না যে, অধিকার ফলাচ্ছিলাম। মাঝখান থেকে তোর নম্বর কমে যাবে। তাই বাউন্ডারী। আগুন রাখো মগজের ভিতর। মগজের বাহিরে, যেখানে, নম্বর বা টাকা আছে, এবং সেটা আছে অন্যের কাছে, এবং যদি সেটা তোর পাওয়ার হয়, তবে ইউ মাস্ট বি কাস্টোমাইজড। তার কাছে থেকে সেটা বাগাতে গেলে অ্যাক্সেপ্টেড নর্মসেই সেটা আনতে হবে। এখানে নর্মস হলো বানানবিধি।’
*** ফিরতিপথ ধরলে ওর মায়ের ফোন এসেছিলো। না, না, টিপ করে কিছুই হয় নি, আমার বউ *** -এর মাকে ফোন করে বলেছিলো যে এইবার *** নিশ্চিত বাড়ী ফিরছে। আর ওর এখন যে দশা, সেটা দেখেই বোধহয় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ লিখেছিলেন — নামিয়ে নাও জ্ঞানের বোঝা, বইতে নারি বোঝার ভার। জয়িতা ###-কে নাম ধরেই ডাকে, খেয়াল করেছি, কিন্তু ওই... মগজে বেঁধে নি। কিন্তু আজ যখন ### ফোনে আমায় চাইলো এবং আমি কথা বলতে শুরু করলাম তার সঙ্গে, আমি বুঝলাম, যে তার বয়স-ই আবার থেকে এগারো বছর কম। আর তার টীন ছেলের সঙ্গে আমি কিনা এতক্ষণ ক্রাশানুভূতি শেয়ারাচ্ছিলাম! আমার উদ্দেশ্য হয়তঃ তেমন খারাপ ছিলো না, কিন্তু এমন টপিকে কথা বলেছি, তার আংশিক হলেও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নিয়ে, যেগুলো হয়তঃ সে তার সমান বয়সের মেয়ে তো দূর, কোনও ছেলের সঙ্গেও বলেছে কিনা সন্দেহ। আমার একটা বিস্ময়বোধ, ###-এর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতেই তৈরী হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিলো। তাহলে কী সত্যিই এতটা বয়স্ক হয়ে গিয়েছি? এতটাই দূর চলে এসেছি যে, ফেলে আসা রাস্তায় আঁধার নামতে শুরু করেছে! কিন্তু মনে মনে যে আসি নি এখনও! তাহলে আমি ঠিক কোথায় আছি? একটা সময় নিজের থাকার জায়গাটা খুঁজতে এতটাই মরীয়া হয়ে যাই, যে ###-এর সঙ্গে কথা চলাকালীন নিজেকে চিমটি কাটছিলাম। এটা আমি? তাহলে আমার ভেতরে কে থাকে?
একটা সময় বুঝি, এই আওড় থেকে বেরোনোর রাস্তা একটাইঃ আমআকে কোনও অর্থহীন ঝাঁঝাঁলো, কানের পর্দা ফাটানো আওয়াজ শুনতে হবে। স্মিত মুখে কানে ইয়ার ফোন গুঁজে লিংকিং পার্কের গান চালিয়ে দিই। ইলেক্ট্রিক স্ট্রিং ঝামরাক কানে। তাদের আছড়ানি আমায় মাথাকে যদি কিছুক্ষণের জন্যও চিন্তাহীন করতে পারে, তাহলে ডিঙিয়ে যেতে পারা যাবে।
এখানে আর যা জানানোর — *** এরপরে আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলো, একজন গীটার শিক্ষকের খোঁজ আমি ওকে দিতে পারি কি না। আমি ওর চয়েস বোঝার জন্য ওর একটা প্রিয় গান জানতে চেয়েছিলাম। ও রূপম ইসলামের একটা গান উল্লেখ করে। ভাগ্যচক্রে, গানটা আমার শোনা। কিন্তু আমি বেটার রিলেট করবার জন্য ওকে মেটালিকা’র দ্য ড্যে দ্যাট নেভার কামস, দ্য ঈগলস-এর হোটেল ক্যালিফোর্নিয়ার দুটো ভার্সন, জনি ক্যাশ-এর রাইডারস অন দ্য স্কাই (লাইভ), পীট সীগর-এর হুইচ সাইড আর ইউ অন, জোন বায়েজের বাংলাদেশ ১৯৭১ গানগুলো চালাই এবং বুঝি, ওর আপাততঃ পছন্দ ইলেক্ট্রিক অ্যাকুইস্টিক গীটার। আমাকে এটার মাস্টার খুঁজতে হবে।
৭।।
*** চলে যাওয়ার একটা আজব মিশ্র অনুভূতি হচ্ছিলো আমার। তখনই রাতের খাবার খাওয়ার তাড়া ছিলো বলে আমল দিই নি। কিন্তু খেয়ে, পাম্প চালিয়ে রিজার্ভোয়্যার থেকে ওপরের ট্যাঙ্ক ভরে, বাড়ীর দরজা বন্ধ করে, মা'র জন্য কিছু প্রয়োজনীয় মেজারমেন্ট নিয়ে, সেগুলোকে লিখে নিজের ঘরে চেয়ারে এসে যখন বসলাম, দেখলাম, সেই মিশ্র অনুভূতিটা জমাট বাঁধতে শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু সেটাকে তখনও কন্ট্রিবিউট করে যাচ্ছে নানান ভাবনা। আমরা অননুতপ্তভাবে চাইল্ডলেস কাপল। আমাদের জীবিকা আমাদের বাচ্চা নেওয়ার কথা ভাবতেই দেয় নি — বলার এটাই যে, যে আসার সে আসলে আসতেই পারতো, কিন্তু তার আসার জন্য পথ তৈরী করা, তাকে উলু-শঙ্খধ্বনি দিয়ে নিয়ে আসা... নাহ, এমন অবস্থাতে ছিলাম না আমরা কোনওদিনই। আমার বাবা কয়েকবারঃ দিদিভাই, দাদুভাই করেছিলো বটে, মিথ্যে কথা কেন লিখতে যাবো — পাতি মধ্যবিত্ত পরিবারে যে কেত্তনটা হামেশা গাওয়া হয় আর কি... তা বাবাকে আমি থাবাড়ি দিতাম ‘চাষার মতো বালের কেত্তন গেও না তো, বাবা! দেখতে তো পাচ্ছ সময়টাকে, এর মধ্যে এই দেশে নতুন কাকে আনবো, কী অধিকারে আনবো। তাও বাধা তো দেওয়া হয় নি কোনও দিন কোথাও — আসার হলে সে নিজে থেকে আসবে। আমরা খাল কেটে, সরি বাবা, আই মিন, যেচে নিয়ে আসতে পারবো না। ভালো কথা, ইয়ং অ্যাসোসিয়েশন ক্লাবের ১০২৪-এর টায় আমাদের একটা কোয়ার্টার, আর একটা সেমিফাইনালে টীম আছে না? আর ন'এর পল্লীর ২০৪৮ তেও একটা কোয়ার্টার ফাইনাল আছে। আমি কিন্তু নেক্সট উইকে আসাম যাবো; চলো, তার আগে কোয়ার্টার দুটো খেলে নিই। পরশু ছুটি, তার পরের দিনও। তারপর একদিন অফিস। তারপর আবার দুদিন ছুটি। ইয়ং অ্যাসোসিয়েশনে কেউ কিছুই বলবে না, কিন্তু ৯'এর পল্লীতে কিন্তু আমাদের কেউ চেনে না। গেলাম না আর অপোনেন্ট ওয়াক ওভার পেয়ে গেলো — মানে হয় না।’
বাবার মন ঘুরে যেত, তাকে যেতেই হত, কারণকী, ব্যাপারটা — তাস, আর খেলাটা — অকশন ব্রীজ। বাবা বলতঃ ‘আজ সন্ধ্যেবেলা যাবো। তুই দুপুরে দেড় ঘন্টা ঘুমোবি। তার কম নয়, বেশীও নয়।’
বস্তুতঃ কাজের দৌলতে, শিশুদের নিয়েই আমার চলা। তাদের সুরক্ষা নিয়ে ভাবা। সেই সূত্রে এই দেশের নানান কোণে যাওয়া, জম্মু-কাশ্মীর, দক্ষিণ ভারত (তাও অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের ভাইজ্যাক বাদে বাকী সব জেলায় আমি গিয়েছি, ৪ মাসের ওপর হোটেলে থেকে পথশিশুদের ওপর কাজ করেছি), আর নাগাল্যান্ড বাদ দিলে — বাদবাকি দেশ আমার বুড়ী ছুঁয়ে দেখা, পরে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার দায়িত্ব নেওয়া, তাকে খুঁটিয়ে দেখা।
তো, এইসব কাজের সুরে সুর মেলাতে মেলাতেই আমার বেলা যেত সাঁঝবেলাতে। সন্ধ্যেবেলা বাড়ী ফিরলে 'পর তখন মা সুস্থ, বাবা তো চিরচাঙ্গা, তন্দরুস্ত ফরএভার — কিছু কথা বলেই নিয়েই আমি স্নান সেরে আমার ঘরে। আমার থেকে আগে ফেরে জয়িতা। ততক্ষণে ও-ও রিফ্রেশড হয়ে এক পেয়ালা চা নিয়ে আমার অপেক্ষায়। একটা হাগ, ভীষণ সাবধানী, শব্দহীনতা দিয়ে মোড়া একটা চুমু, সে দিনের কোনও কেজো-কিন্তু-মজার ঘটনা বলার থাকলে শেয়ার করা — এর মাঝে রাত্তির নটার ঘরোয়া তাস খেলতে যাওয়ার আগে, বাবা, কোনও কারণে আমাদের ঘরে এলে অবধারিত উঠে যেত, পুরানো দিনের কথা, শ্রী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। আর এই সময়টায় মা-ও এসে যোগ দিত। বাবা কার্ডস অন নাইন পি এম খেলতে চলে গেলে কখনও জয়িতা অফিসের বকেয়া কাজ (আমার সব কাজ অফিসে, আমি আমার কর্মজীবনের আদ্ধেকের বেশী দিন টিফিন খেয়েছি ফিরতি পথে) থাকলে সেটা নিয়ে, আর না থাকলে রান্নাঘরে যেত তার মানির কাছে। আর আমার ফুরসত মিলত নিজেকে বলার — সো, সান অফ আ বিচ, হাউ'জ ইয়োর ড্যে টুড্যে? ক্যুড ইউ মেক ইট ইয়োরস? ততক্ষণে ডেস্কটপ খুলে গেছে। আর মাদারির বাস্কো খুলে গেলে 'পর পৃথিবী জুড়ে শুধু ঝিল্লীধ্বনি। এর মাঝে নিজের সন্তান? বাবা, এই যোগটা (সরি, সামটা) করে দাও না। বাবা, এই ড্রয়িংটা তুমি করতে পারো? ক্রীপি বুলশিটস। আমাকে স্বার্থপর... হ্যাঁ, সে তো বলাই যায়। আমি তো অ্যাডমিট করিই যে, পরের দিনের কাজ ভালো করার জন্য আগের দিনের বাসী বিষাদের ঝাপটা ভয়ানক ক্ষতিকর। অতএব, যা আমার ভালো লাগে, ডেস্কটপ বা বই — রাত নটার পর থেকে আমার তখন আর কারোর দিকে না তাকিয়ে, কারোর কথা না ভেবে সেখানে সেঁধোনোর সময়।
জয়িতা চাকরি করে পারবারিক হিংসা থেকে মহিলাদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজে। তার কাছ থেকে সেই কেস স্টাডিগুলো শুনি, যার ভার ওর কাছে অসহনীয় হয়ে যায়। এমনিতেই ভারতবর্ষে যাঁরা এই ধরনের কাজ করেন, তাঁদের লিসনিং এবং ব্লটিং অ্যাবিলিটি গড়পড়তাদের চাইতে বেশী হওয়া উচিত বলে আমার মনে হয়। আর এই ডোমেইনের একজন কর্মী সৎ তো বায় ডিফল্ট হবেনই, একটু বেশী কমিটেড যে হবেন, সেটাও লেখা বাহুল্য;- আমি এটার সঙ্গে জুড়ে দিই এজিলিটিকে, অর্থাৎ শারীরিক এবং মানসিক কষকে। এনিওয়ে, যে কেসগুলো শুনতে পাই, তাতে করে সন্তান জিনিসটার প্রতি আমার বিবমিষা জাগে, কেনকি, আমিও তো কোনও এক জোড়া নারী-পুরুষের সন্তান। আর পৃথিবী সম্পর্কে, সভ্যতা সম্পর্কে ফিরে ভাবতে ইচ্ছে করে। সুতরাং, এক ধরনের ইনফারেন্স এইরকমঃ সন্তানের কাঙ্ক্ষা — জয়িতারও খুব বেশী নেই। প্রথম দিকে জানি না ছিলো কিনা, তবে এটা জানি নিশ্চিত যে, যদি বা থেকেও থাকে, এই কর্মাভিজ্ঞতা তার সেই কাঙ্ক্ষার শিঙে ফুঁকে ছেড়ে দিয়েছে। কী-ই বা আর করা যেতে পারতো, আফটার অল, বেঁচে থাকা মানেই শালা পাপী পেট কা সওয়ালের জবাবদিহি করতে থাকা।
৭ক।।
এটা বোধহয় বোঝা গেলো, এটা আমাদের পোস্ট চাকরী অ্যান্ড পোস্ট ম্যারেজ পারিবারিক ছবি। আর পোস্ট চাকরি, প্রি ম্যারেজ? সেখানে দেখা সাক্ষাৎ হতো কম। ফোনেই অ্যারাউন্ড দ্য ওয়র্ল্ড ইন থার্টি মিনিটস করতাম আমরা। অ্যালিয়াস ফ্রঁসেজ কিছু নতুন ছবি দেখাচ্ছে, কিংবা রঙ্গকর্মীর হোলি, বা গুড়িয়াঘর, কিংবা থিয়েট্রনের অসঙ্গত অ্যাকাডেমীতে আবার হবে, বা অ্যাকাডেমিতেই কয়েকজন নতুন ফটোগ্রাফারদের ফটোগ্রাফির এক্সহিবিশন হচ্ছে? অফিস থেকে ঘন্টাখানেক আগে বেরিয়ে... চলোওওও। তখন পকেটে রক্তাল্পতা নেই আর, ফিরতিপথে সাধ মিটিয়ে রেঁস্তোরাবাজি করতে পারতাম আমরা। তবে এখন আর এগুলোর দরকার পড়ে না — কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারের স্রোতে ইদানীং টান যাচ্ছে। সবাই আর অ্যাক্সেস করতে পারছেন না। সিনেমার ক্ষেত্রে বলতে পারি, এখন আমার কাছে যে পরিমাণ সিনেমা আছে, রেফারেন্স চেক করে, পড়ে, দেখে শেষ করতে পরের জন্মটাও ছোট। বইয়ের ক্ষেত্রে এমন কথা খাটে না — আমি পড়ি কম, কিনি আরও কম। তবে যা স্টকে থাকে, তাকে শেষ করার চেষ্টায় থাকি সবসময়। এখন এই ই-বুক এসে যাওয়ায় পিছিয়ে যাচ্ছি। ভাগ্যিস, এখনও আনন্দবাজার পত্রিকা হার্ড কপি বের করে। নইলে তো পিছিয়ে পঞ্চান্ন হয়ে যেতাম।
আর... ওহ হ্যাঁ, একটা কথা লিখতে ভুলে গিয়েছি, আমি আদ্ধেক বিয়েবাড়ী অ্যাটেন্ড করি না, সময় নেই বলে কাটাই, কাটিয়ে আসছি অনেক দিন হলো, কিন্তু বছরে দুবার টার্গেট রেখে একবার অন্ততঃ হিমালয়ের কাছে যাই। মন খুলে কথাবার্তা হয়। গিরিরাজ জানিয়ে দেন, আমি কতো কমে পড়ে আছি। তবে গত কয়েক বছর হচ্ছে না, মা'র অসুস্থতার জন্য। পাটিগণিত মেনে চললে, মা'র পরে সুদে-আসলে হিমালয়কে বুঝে নেবো — এই আশাতেই দিনের কিছু অক্সিজেন নিয়ে থাকি।
প্রি চাকরি-প্রি ম্যারেজ সময়টা আমি আগে একবার লেখার চেষ্টা করেছি। আমার অপরাপর লেখার মতো সেটাও — কিস্যু হয় নি। তবে, ওই — এইম্লেস লাইফ, শ্যাওলার মতো ভাসতে ভাসতে সময় পার করে যাওয়া, থ্যাঙ্কস টু বি এস এন এল, সাত ডিজিটের নম্বর আসার পর থেকে ক্রস ছাড়াই লম্বা কথোপকথন হতো। আমাকে আমার নিজস্ব পৃথিবী থেকে টেনে বের করে নিয়ে জয়িতা, আক্ষরিক ট্যাঁকে গুঁজে সর্বত্র নিয়ে গেছে, যের'ম জায়গায় গেলে আমার মন ভরে — সেটা গঙ্গার কোনও নির্জন ঘাট হতে পারে, বইমেলা হতে পারে। মনে পড়ছে, এই ব্যাপারটা প্রয়াত লেখক শ্রী কার্তিক লাহিড়ীর নজর এড়ায় নি। তিনি দৃশ্যতঃ বিরক্ত হতেন, কিন্তু ভারী মার্জিত স্বভাবের মানুষ ছিলেন তো, তিনি মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞাসা করতেনঃ ‘আজও কী তুমি একা আসো নি! তুমি কী একা বইমেলা থেকে বাড়ী ফিরতে পারো না? তোমাকে সোনারপুরে পৌঁছে দিয়ে তারপর তোমার বান্ধবী শিয়ালদহে ফিরবে? এতটা ট্যাক্সেশন বোধহয় কোনও ক্ষেত্রেই ভালো না।’
মনে আছে, কোনও একটা লেখা শুনে সেটা সম্মন্ধে কিছু বলার আগে কার্তিকদা জেনে নিতেনঃ ‘এটা তুমি লিখেছ, তোমার বান্ধবী জানে?’
এমনকি, ওঁর একটা উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া প্রেসে গেছে, কার্তিকদা, ফোনে, আমায়ঃ ‘এত ভালো আমি লিখি না। মনে হয় এই পাঠ প্রতিক্রিয়াটা তুমি তোমার বান্ধবীকে দেখাও নি।’
তবে একথা না লিখলে সত্য গোপন করা হবে যে, কিছু লেখক ছিলেন, তাঁদের নাম কমবেশী সবারই জানা, তাঁদের সঙ্গে আড্ডা আমার ওয়ান টু ওয়ানে বহুবার হয়েছে। তাঁদের কেউই আজ আর এই পৃথিবীতে নেই — ভীষণ মিস করি তাঁদের। শুধু এক কবি রয়ে গেছেন একলা মাধবীর মতো। তাও দেখা-সাক্ষাৎ আর হয়ে ওঠে না বিশেষ। অথচ একটা সময় ফি রোববার তাঁর বাড়ীতে যাওয়া ছিলো। সাহিত্য ভালোবাসেন — এমন অনেক বন্ধুবান্ধব আমি সেই কবির বাড়ীর আড্ডা থেকেই পেয়েছি। এঁরা প্রত্যেকে আমায় সম্মৃদ্ধ করেছেন।
আর, হ্যাঁ, ভালোবাসার প্রথম দিনগুলোও খেই পেলে মনের মধ্যে জাগে বৈকি!
এই তো, *** এসে সেই স্মৃতিই খুঁচিয়ে দিয়ে গেলো। এবং ভালোবাসার প্রথম দিনগুলোকেই যে শুধু খুঁচিয়ে দিয়ে গেলো তা নয়, ক্যালাইডোস্কোপে কতো যে প্যাটার্ন এলো... সেই ১৯৯০ থেকে যার শুরু। বারবার মনে পড়ছিলো পল সাইমনের দ্যাট ওয়জ ইয়োর মাদার গানটা। ইউ আর দ্য বার্ডন অফ মাই জেনারেশন, আই শিওর ড্যু লাভ ইউ, বাট লেট'স গেট দ্যাট স্ট্রেইট। ***-রা যত বড়ো হবে, ততই কিন্তু ফিকে হতে থাকবে সোনার খাঁচায় থাকা আমার দিনগুলো। তারা তখনই খাঁচা ভেঙে বেরোতে থাকবে, যাবে অজানায়, গাইবে — আকাশ অজানা তবু, খাঁচা ভেঙে উড়ে যায় পাখি। আর সেইসব পাখি উড়ে গেলে আমার বেঁচে থাকা আরও ফাঁপা হয়ে আসবে। জীবিত মৃত হতে থাকবো আমি। জ্যান্ত থাকবো, প্রশ্বাস নেওয়া, নিঃশ্বাস ছাড়াও চলবে, পরিচিতদের বলবোঃ ‘হাই?’, অপরিচিতদের বলবোঃ ‘নাইস টু মীট ইউ’, আর এদিকে আমার চামড়া রঙ মরে যেতে থাকবে।
***-এর মা-ই আমার থেকে সাত বছরের ছোট, জয়িতার থেকে পাঁচ বছরের। তবুও... মানুষের কী দেরীতে বাচ্চা হয় না? হয় তো। তাহলে তো *** হতেই পারতো আমাদের সন্তান। আমার সন্তানকে আমি নানাবিধ প্রোটেকশন মেজার চিনিয়ে দিচ্ছি, তাকে গাইড করছি ক্রাশ হ্যান্ডলিংয়ে — এর মানে তো অবধারিত এই-ই দাঁড়ায় যে, আমার ক্রাশ মারা গেছে। কিন্তু এই লেখাটা লিখতে লিখতেও ক্লান্ত হয়ে পড়লে ‘পর একবার আমি ফোন করেছিলাম আমার ক্রাশকে। সেই উত্তাপ, সেই আন্তরিক বন্ধুত্ব। আর এটা শুধু ক্রাশ কেন, অন্য বন্ধুদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই তো কয়েকদিন আগে শ্রী তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা গানের খোঁজে আমার খুব কাছের এক বন্ধুকে ফোন করেছিলাম। কথাবার্তা শুনে কারোরই বোধহয় মনে হবে না যে, আমরা এখন বাহান্ন। সকলেরই বোধহয় মনে হবে, এরা ষোলো-সতেরো না হলেও, ত্রিশের চৌকাঠ পেরোয় নি। অথচ ম্যাটারটা তা নয়। আর সেটা তেমন নয় বলেই আমার অবধারিত মনে পড়ে — ফুলের তোড়ার জন্য, হালকা রসিকতার জন্য আমার দুর্বলতাও নেহাত কম ছিলো না, কিন্তু আমি দেখছি, আমি প্রায় পার হয়ে এলাম, চোদ্দপুরুষের ভাগ্যে, নাকি, এমনি এমনি — আমার দুঃখের গল্পটা ঠিক জমজমাট হলো না, অথচ সাঁকোটা নেহাত কম লম্বা ছিলো না, নীচে ভয়ংকর চেহারা ছিলো জটিলা কুটিলা নদীর, তাছাড়া যেমন হয়ে থাকে, একটা গোলমেলে পাগলও ছিলো সঙ্গে, সঙ্গে, নিতান্ত সঙ্গে নয়, মনের ভিতর, তাকে কিছু বলতে হয় নি, যখন ইচ্ছে, সে তার সাধ্য মতো সাঁকো নাড়িয়ে গিয়েছে, তবুও পড়তে পড়তেও পড়ে যাই নি, সার্কাসের নিপুণ খেলোয়াড়ের মতো তাল সামলিয়ে এগিয়ে গিয়েছি সামনের দিকে। কিন্তু আমি দেখছি আমি প্রায় পার হয়ে এলাম। দূরে বাঁশবনের পিছনে সূর্য নেমেছে, আলো-আঁধারির হেঁয়ালি। আর রসিকতার বয়স নেই, আর ফুল চুরির সুযোগ নেই, আমি দেখছি, আমি প্রায় পার হয়ে এলাম (পার হয়ে এলামঃ শ্রী তারাপদ রায়, স্মৃতি থেকে লিখেছি, প্রথম দুটো ভার্স বাদ দিয়ে, প্রচুর ভুল যে হচ্ছে, সেটা লিখতে লিখতেই বুঝছিলাম। আপনারা যদি কেউ এ লেখা পড়েন তো, নিজ গুণে আমায় মাফ করে দেবেন।)
এছাড়াও শক্তির (শ্রী শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অন্যান্য সব কবিই শ্রদ্ধেয়, কিন্তু শক্তি — সে তার কিছু কবিতা নিয়ে আমার পাশে পাশে হাঁটে, সে আমার পরম বন্ধু, তাকে আমি শ্রী দিয়ে সাজাই না, এমনিতেই তার সাজ প্রচুর) অজস্র কবিতা আমার মনে ঘাই মেরে গেছে। আমি *** কে বুঝতে দিই নি, একবার জিম রীভস বলে ফেলেই নিজের আগল বন্ধ করে দিয়েছিলাম। শক্তির একটা কবিতা এখানে না বলে গেলে পাপ হবে — জয়িতা প্রসঙ্গে আমি এই কবিতাটাই বোধহয় বেশী আউড়েছি —
কেন অবেলায় যাবে? বেলা হোক, ছিন্ন করে যেও সকল সম্পর্ক। যেন গাছ থেকে লতা গেছে ছিঁড়ে একটি বিষণ্ণ লোক থাকে যেন হাস্যময় ভিড়ে
কেন অবেলায় যাবে? বেলা হোক, ছিন্ন করে যেও সকল সম্পর্ক। (স্মৃতি থেকে কিন্তু, মূল কবিতা থেকে অপসৃত হওয়া কিন্তু খুব স্বাভাবিক, মার্জনার ভিক্ষাপাত্র আগাম রাখা রইলো)।
বলে রাখা ভালো, ১৯৯৫ সাল শক্তির প্রয়াণবর্ষ। তা ওই সময়তেও আমি শক্তিকে পড়ি নি, তখন ধুমিয়েছ, ঝাউপাতা পড়ে ফেলেছি, জয়দেব বসুর ভবিষ্যৎ কাব্যগ্রন্থের মেঘদূত কবিতায় কুলাক বিরোধিতা আমায় ভাবাচ্ছে। জয়দেব বসু সিপিআই(এম) পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন, এর মানে একটাই হয়, তিনিও মার্ক্সবাদ নয়, মার্ক্সবাদে কাঁচি মারা এঙ্গেলসবাদেই বিশ্বাস করতেন, ইম্পোর্টেড থিওরী, তবুও কুলাক শব্দটা লিখিত হচ্ছে মানেই আগুনে পেট্রোল পড়ছে, বামপন্থা নিয়ে একজন সিপিআই(এম) পার্টির লোক — ভাবছে! আলিমুদ্দীন স্ট্রীটে বোধহয় সব কিছু অ্যালাওড হবে, এমনকি এই... এই প্রতীক উর রহমানের প্রশ্ন করার অধিকারও অনুমোদন পেয়ে যাবে, কিন্তু ভাবা অ্যাপ্রুভাল পাবে না। তো, সেই সময়ই শারদীয় আনন্দলোকে বোধহয় জয়দেব বসুর উত্তরযুগ নামে একটা উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিলো, সিপিআই(এম) পার্টি যাদেরকে দেবতা মানে, এবং যা কিছুকে সেইসব দেব-পুজোয় আচার হিসেবে ধরে, সেইসবের মূল ধরে টান মারার একটা চেষ্টা...
এনিওয়ে, শক্তিকে আমি পড়তে শুরু করি, ১৯৯৭ নাগাদ। ওই যে শক্তি এঁটে গেলো আমার সঙ্গে, সপ্তাহের শেষে শক্তির কিছু কবিতা আমি ফিরে ফিরে পড়ি।
৭খ।।
তো, কোয়ারেনটাইনড থাকাকালীন মা'র উদ্যোগেই তাস খেলতে বসতাম আমরা। মূলতঃ ফিশ আর র্যামী খেলা হতো। মা শুরুই করতোঃ ‘লোকটাকে আজ আমার বাম দিকে দে তো! দেখি, কেমন করে তাস খায়!’ লোকটা অর্থাৎ আমার বাবাঃ ‘আহ্হা, বউ বলে কতা। তুমি বরং আমার বাঁয়ে বসো। আমি তোমাকে অনেক কার্ড খাওয়াবো, দেখো।’ জয়িতা তাস শাফল করতে করতেঃ ‘তা তোমরা কী প্রেম করতে করতে আজ খেলবে নাকি! এ ভাই, আমার কিন্তু এ মাসের স্যালারি ঢোকে নি।’
একটু ফেসিলিটেট করি — ফিশ খেলা হলে পার কার্ড দু টাকা, উইকএন্ডে পার কার্ড পাঁচ টাকায় খেলতাম আমরা। র্যামি হলে শয়ে দশ টাকা, উইকএন্ডে কুড়ি টাকা। গ্যাঁট-গচ্চা না গেলে মানুষ কোনও শেখাতেই মন দেয় না — এটা ছিলো মম পিতাশ্রীর ফিলোজফি। আর বাবা জয়িতাকে ইনসিস্ট করতো, অকশন ব্রীজ আর ব্রে (বিবি পাশানো) খেলাটা শেখার জন্য। বাবার ভাষায়ঃ ‘হ্যান্ড প্লে পরে শিখবে, আগে তো অকশনিং করতে শিখুক।‘ প্রত্যেক ‘এসো, জয়ী’র প্রত্যুত্তরে মম অর্ধাঙ্গিনী বীরদর্পে এগিয়ে গিয়েছে। যেমন করে সে চাষা-বৃত্তির অনেকটাই আয়ত্ত করতে পেরেছিলো, তেমন করেই অকশন ব্রীজ আর ব্রে-কেও সাঁটিয়ে নেবে বলে বেশ কয়েকবার এগিয়ে গিয়েছিলো, আর হরবারেই মাথা নাড়তেঃ ‘টু টাফ। টু মাচ টাফ। ইট ইজ নট মাই কাপ অফ টি।’ ফিরে আসতো সে। বাবা, আমায়, পিছন থেকেঃ ‘ও কালভারসন, বউকে একটু জ্ঞানের ছিটে দিও।’ আমি মুখে গুটখা থাকায় মুখ তুলে অঁয়বঁয় করতে করতেঃ ‘টা’লে টো — ও টো টোমার পারনার হটে পাববে না। লাবব গি?’
এর পিছনে অনেক গল্প আছে। আমার পুরানো দিনের। হ্যাঁ, সেগুলোতেও আমার শেষ কৈশোর ঘাপটি মেরে বসে আছে অনেকখানি, তবুও আমি সে সবে গেলাম না। তবে একটা বলি এবং সেটা কৈশোরের নয় — ফিশ খেলতে বসে, জয়িতার একটা কার্ড ভুল ডিসকার্ডিংয়ের জন্য সে দানে আমি বাজি মারি। বাবার সাত তাস তৈরী ছিলো, সিক্স-কার্ড অ্যারে, বা তিন প্লাস তিন ম্যাচ হয়ে গেলেই আগেই নামিয়ে দিতো; সাতখানা তাস হয়ে গেছে বলে বাবা রিস্ক নিয়ে খেলছিলো। এদিকে, জয়িতার হাত ছিলো বাবার আন্দাজের বাইরে, বাবার লেফটে বসে বাবাকেই অকারণ ডজ করছিলো জয়িতা, ওর তিন তাস রানে ছিলো (পরে হ্যান্ড ওপ্যেনের পর দেখতে পেয়েছি), আর সেই সময়, নিজের কার্ড সাজানোয় খাপ খায় — এমন একটা তাস বাবা ডিসকার্ড করে, ফলে ও সিক্স কার্ড ট্রিক রেডি করার দিকে যায়। এদিকে, জয়িতার বাম দিকে বসে আমি যে ক্রমাগত ডেক হিট করছিলাম — এটা বাবা অনেকক্ষণ আগে থেকেই নজর করেছিলো। কিন্তু এটা স্পেক্যুলেট করতে পারে নি যে, দুটো জোকার আমার হাতে, আর আমি ওয়ান কার্ড টু মেইড অবস্থায় খেলে যাচ্ছি। এবার বাবা যেটা জয়িতাকে বললোঃ ‘তুমি তো দেখতে পেলে মা, বাবি স্পেড ডিসকার্ড করেই নি। তুমি স্পেডের মাঝের তাস ডিসকার্ড করলে! তোমার তো দুটো কার্ড রিডাডান্ট, একটা স্পেড, আর একটা ডায়মন্ড। তাহলে ডায়মন্ডটা ফেললে না কেন, মা! বাবি তো কন্টিনিউ ডায়মন্ড ফেলে যাচ্ছে।’
এই কথাটা এভাবে একবারে হয় নি। প্রথমে জয়িতা নিজের ভুল বুঝতে পারছিলো না। বাবা ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছিলো ওকে। আপনাদের কারোর বুঝতে যদি অসুবিধা থাকে, আমি অন্য একটা বলছি, ফিশ খেলার আত্মাটাকে বোঝবার জন্য। ধরুন, আপনার হাতে ডিসট্রিবিউশনের পরই, বা, দু-তিন হাত ঘোরার পরেই ছটা কার্ড রেডি। এবার আর খানিকক্ষণ খেলেই আপনি বুঝতে পেরে গেলেন, বাকী দু তাস আপনার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ আপনার কাঙ্ক্ষিত তাস সব আপনার বাম দিক দিয়ে, বা আপনার অপোজিটে থাকা (লেফট টু লেফট) লোকের হাত দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আপনি তো আর সেই দান নিজে জিততে পারবেন না। তখন আপনার চরম শত্রু, যে আপনার লেফটে আছে, সেই দানে, সে আপনার পরম মিত্র হয়ে যাবে। আপনি তাকে সবরকমভাবে চেষ্টা করবেন তাস খাওয়ানোর। সে খেতে থাকবে আপনার ডিসকার্ড করা তাস থেকে, সে স্ট্যাক থেকে সুবিধাজনক তাস পাবে, আপনি তার ডিসকার্ডিং ফলো করবেন, আর যখনই বিপদ বুঝবেন — নিজের তৈরী হওয়া ছয় তাস নামিয়ে দেবেন। এবার বাকী দুজন কী অবস্থায় আছে, সেটা ইনডিভিজুয়ালে জানে, আর জানলেও জানতে পারে ভগবান। তারা যদি অ্যাগ্রেসিভ খেলে, অর্থাৎ নিজের হাতে আট তাসের সিরিজ কম্পলীট করতে চায়, সানন্দে থাকুন, কারণ আপনার বাঁয়ের জন আট তাস নামালেই তাকে আপনাকে দিতে হচ্ছে - দু তাস (ছয় তাস আপনি অলরেডি নামিয়ে রেখেছেন), আর তার বদলে পাচ্ছেন ম্যাক্সিমাম ১৬ তাস (যদি বাকী দুজনই অ্যাগ্রেসিভ খেলে), আপনার নীট লাভ ১৬ - ২ = ১৪। যদি একজন ডিফেন্সিভ খেলে ৪ তাস নামিয়ে রাখে আগেই, তাহলেও আপনি পাচ্ছেন — ৮ + ৪ - ২ = ১০। যদি সবাই ডিফেন্সে খেলে, এমনকি একজন যদি ৭ তাস এবং অন্যে ৬ তাস নামিয়ে রাখে, তাহলে আপনার বাঁয়ের জনের লাভ কমে গেলো — সে পাবে আপনার ২ + আর একজনের ২ + আর এক জনের ১ = ৫ তাস। আর আপনার ক্ষতি — ২ তাস (বাঁয়ের জনকে, যে মেইড করেছে) + ১ তাস (যে ৭ তাস নামিয়েছে) + শূন্য (কারণ আপনি এবং আর একজন ৬ তাস করে নামিয়েছেন) = ৩ তাস।
এই খেলা ১৬ ডিলের হতে পারে, ৩২ ডিলের হতে পারে, ৪০, ৪৮, ৬৪ ডিলের ওপর হতে পারে। যেমন চুক্তি করে বসা হবে আর কি! আমি একটা ডিলের কিছু হিসেব দেখালাম। তাস-পিছু ১ টাকা ধরে চলুন। আপনি বাঁচবেন, অন্যথায় খুব বেহিসেবী চললে আপনার অন্ন যাবে। ধর্ম যাবে কিনা বলতে পারবো না, কারণ যুধিষ্ঠির পাশায় বউ, ভাইদের পাষাণে তুলেও স্বর্গারোহণ করেছিলো। কিন্তু অন্ন না জুটলে খুব বেশী দিন যে ধম্মের পথে থাকতে পারবেন না — সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। আমি এটা অনেক দেখেছি। নিকটজনের ক্যানসার হলে এবং সে বাঁচলে তার চিকিৎসা, অথবা বল্গাহীন জুয়া, কিংবা চোখে পট্টি বেঁধে ডেলি কা ডেলি শেয়ার মার্কেটে গিয়ে ঘুরে বেড়ানো — বহু লোককে আমি জানি, যাদের পরনে একটা ছেঁড়া ফাটা জিন্স আছে ঠিকই, কিন্তু আন্ডারজিনসটা... নেই, হারিয়ে গেছে।
এনিওয়ে, বাবার বোঝানো, জয়িতার প্রথমে বুঝতে না চাওয়া, ও পরে, বিশ্বরূপের কিয়দাংশ দেখা বা উপলব্ধি করা — এখানে আমার একটাই মন্তব্য ছিলোঃ ‘তাহলে একটা রঙয়ের কৌটো আনি, নাকি?’ বাবা, কথার মাঝে বাধা পেয়ে আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেঃ ‘বাহঃ, ছুঁড়ে মারতে হবে না! নইলে ও বুঝবে বলে তোমার মনে হয়?’
বাবা, ব্যাপারটা রিকল করতে পেরেঃ ‘চুপ কর, চুপ কর, পচা। থামলি? বই পড়ে তাস খেলতে এলে ওই হয় — টু হার্টস — ডবল — পাশ — টু স্পেডস — থ্রি হার্টস — থ্রি স্পেডস — পাশ — পাশ — পাশ খেলাতে পার্টনারের হাতে হার্টের টেক্কা সাহেব বুঝেও, সেকেন্ড স্যুট ক্লাব বুঝেও, যে প্লেয়ার খেলা পেয়ে ক্লাবের কিং খেলে নেক্সট প্লে ডায়মন্ড করতে পারে না, পার্টনারকে রাফ দিতে পারে না, তার টেবিলে বসে কালভারসন পড়াই ভালো, তাস হাতে চটে বসা উচিত নয়। সিপিআই(এম)-এর তাত্ত্বিক নেতা আমার। আলিমুদ্দীন আলো করে বসে আছেন।’
এ ডিসট্রিবিউশন আমারও মুখস্থ। অতি লোভ করতে গিয়ে সোনার ডিম পাড়া হাঁসটাকে কুপিয়ে দিলে কী হয়, সেই দিন চটে বসে আমি শিখেছিলাম। এদিকে জয়িতাঃ ‘পাপা, তুমি সিপিআই(এম)-কে গাল দিচ্ছো! মার্ক্স পাপ দেবে, পাপা। ছিঃ ছিঃ পাপা, নরকেও তোমার ঠাঁই হবে না।’ বাবা অত্যন্ত সিরিয়াস মুখেঃ ‘তুমি বুঝবে না মা, ওইজন্যই বাবিটা গাড়ল থেকে গেলো। জুয়া না খেললে অকশন ব্রীজ বা ব্রে খেলা শেখা যায় না। আমি পেঁচো জুয়াড়ীদের কথা বলছি না, যারা ফিশ, র্যামী, ফ্লাশ, পোকার, ব্লাফ — এগুলো জুয়াতে খেলে, তারা ওই টাকা-পয়াসার চক্করে পড়ে ফৌত হয়ে যাবে। ওখানে স্কিল তো কিছু নেই, কার্ড-লাক আর চোরামো। যে খেলায় স্কিল লাগে, এই ব্রীজ, ব্রে, কল ব্রে এগুলো খেলা শিখে আগে তুমি হারবে, তারপর তুমি বই পড়, বা কেন হারলে সেটা নিয়ে ভাবো, ডীপলি ভাবো, তবে তুমি খেলতে পারবে। আর বাবি তো আমাদের সঙ্গে খেলতে বসার আগেই কালভারসন নিয়ে পড়ে গেলো। (আমার দিকে ফিরে) উল্লুক, ওটা কন্ট্র্যাক্ট বা ডুপ্লিকেট ব্রীজ, অনেক দূরের জিনিস, আগে তো অকশন ব্রীজ শেখ।'
৭গ।।
***-এর সঙ্গে কথা বলতে বলতে যে যে ছবিগুলো খুব মনে পড়ছিলো, তার কয়েকটা হলো — জয়িতার ভাইয়ের জন্য একটি মেয়েকে, সে আবার আমার সহকর্মী ছিলো কোনও একটা সময়, ভারী পছন্দ হয়েছিলো, জয়িতার। তো, কাকু-কাকীমার সঙ্গে সম্ভাব্য পুত্রবধূকে আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা ভেন্যু হিসেবে ভেবেছিলাম দুটো জায়গাকে, নন্দনে বসে চাঁদের পাহাড় দেখে, কোনও একটা রেস্তোরাঁয় যাওয়ার। চাঁদের পাহাড় হয়েছিলো, কিন্তু রেঁস্তোরা হয় নি, কারণ সে কন্যের তাড়া ছিলো। সিনেমা দেখার পর রবীন্দ্র সদন চত্বরে একটা জায়গায় কফি - চিকেন ইন্টারনেট এবং আরও কিছু নিয়ে যখন খোশগল্প জমে উঠেছে, তখন আমার খুব একটা অদ্ভূত অনুভূতি হচ্ছিলো। আমি ভেবে যাচ্ছিলাম — কতো বড়ো হয়ে গেলাম, অ্যাঁ! বিয়েশাদি তো করলামই, এখন আবার অন্যের বিয়ের তদ্বির করছি। অথচ এই তো সেদিন আমাদের ইলেভেনের কেমিস্ট্রির মাস্টারমশাই গ্যালারি ক্লাসে উঠে এসেঃ ‘কি রে ঘেড়ো (ঘাড় অবধি চুল ছিলো বলে), পড়াশোনা করছিস। কিছু ক্লাস রোজ করিস, কিন্তু শুনলাম আদ্ধেক ক্লাসে থাকিস না। সত্যি কথা?’ উত্তর দেবো কী, কম-সে-কম ঘাড় নেড়ে যে হ্যাঁ বলবো, সারা শরীর আমার তখন আনন্দে-ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে, @@ বাবু স্যার, আমাকে ছুঁয়ে আছেন! আর পান থেকে চুন খসলে পিটিয়ে পাট পাট করে দিতে যিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না। ওই প্যালারাম যেমন বলছিলো কীলোৎপাটিত বানরঃ, তা বাঁদরামি ছাড়া আর কী-ই বা করেছি একটা গোটা জীবনে। আর হ্যাঁ, সেসবের জন্য আমি কোথাও কোনও খেদ তো গাই-ই না, বরং আমি আমার ওই দিনগুলোর জন্য গর্বিত। আজকের আমি-তে তারা পাথরকুচির কাজ করেছে বটে।
কিংবা, রোনাল্ড রেবের-কে হোমেজ দেওয়া হচ্ছে। ২০০৫-এর ফিল্ম-ফেস্টিভ্যাল। নাইট শোতে তাঁর দ্য ডার্ক সাইড ইন আওয়ার ইনার স্পেস দেখে এবং বিন্দুমাত্র না বুঝে, কেননা, রেবের সম্পর্কে কোনও হোম-ওয়র্ক করা ছিলো না; জয়িতা বেরিয়ে বললোঃ ‘বাবা রে, এ সিনেমা তো জল দিয়ে দেখতে হবে, রে! কী ইন্ডিভিজুয়াল মুভি মাইরি! চল, চল ট্যাক্সি ডাক। অ্যালেনের রান্নাঘরে যাবো।’
‘এই চৌপর রাতে? তাছাড়া অ্যালেন’স কিচেন বেশ বেপট জায়গায়। সোনারপুরে ফিরতেও তো হবে আমায়!’ বিপন্ন বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করি আমি।
‘নিকুচি করেছে সোনারপুরের। সের’ম হলে আমাদের বাড়ীতেই থেকে যাবি। দু দিনের ই এল নিলাম সিনেমা দেখার জন্য। আর প্রথমেই কিনা এর’ম ছবি! এত দুর্বোধ্য ছবি দেখলে আমার খুব খিদে পেয়ে যায়, তুই জানিস না? ভাই যমুনা সিনেমার পাশ দিয়ে নিয়ে নেবেন।'
আমি মহা বিস্ময়ে শুধিয়েছিলামঃ ‘যাবি তো শোভাবাজার। মেট্রো নিলে বেস্ট হতো। তাড়াতাড়ি হতো। ট্যাক্সি যে কেন নিলি!’
আমার দয়িতা মিষ্টি হাসলোঃ ‘দ্য ডার্ক সাইড অফ মাই ইনার স্পেস।’
ট্যাক্সি গ্লোবের পাশে উঠতেই জয়িতাঃ ‘ভাই, লেফট নিয়ে গাড়ীটা একটু থামাবেন, প্লীজ?’
গাড়ী থামলো। জয়িতা একটা দোকানে গেলো। ফেরবার সময় আমি এক অনির্বচনীয় দৃশ্য দেখতে পেলাম — একটি মেয়ে। ২৮ এর শেষের মুখে। পরনে তার লাল পাড় আর অফ হোয়াইটের ওপর ঢাকাই বুটি তাঁত। নিষ্কলঙ্ক লাল ব্লাউজ। আর হাতে একটা ব্লেন্ডারস’ প্রাইডের কোয়ার্ট কাগজে জড়ানো। তার কেনা-কাটা শেষ হয় নি তখনও। টকাস টকাস করে হেঁটে সে গেলো দুটো দোকান ফেলে, মুদীর দোকানে — সোডা নিলো, চীপস নিলো, আরও দু একটা কিছু নিয়ে, আর তারপর দু লিটারের জলের বোতলটা নিয়ে সে যখন কার্যতঃ টালমাটাল, ড্রাইভার দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়ে তার পাষাণভার লাঘব করলে। কিন্তু প্রেয়সী আমার মালের বোতল নড়ায় নি বাহুডোর থেকে। ট্যাক্সিতে ঢুকেঃ ‘তুই কি অ্যালেন'স কিচেনে পৌঁছেও ডেলিগেট কার্ডটা গলায় ঝুলিয়ে ঢুকবি, নাকি? বিশ্বাস কর, ওই নীল রিবনটা দেখে তোকে হুবহু বক্সির মতো লাগছে।’
বক্সি জয়িতার ছোটমাসীর আদরের বক্সার কুকুর। অদ্ভূত কুকুর। তার কথা থাক, অন্যত্র হবে ‘খন। তা আমি নীল রিবন সমেত ডেলিগেট কার্ড খুলে ব্যাকপ্যাকে ঢোকাতে ঢোকাতে কুলকুল করে হাসছিলাম। আমার এয়ারোস্মিথের ফলিং ইন লাভ গানটার লিরিক এবং ভিডিও অ্যালবামটা মনে পড়ছিলো। জয়িতার দিকে ফিরে বললামঃ ‘পেঁচো মাতাল গার্লফ্রেন্ড আমার। আজ তোর শিঙে ফুঁকে দেবে অ্যালেনের ব্যাটা। ওর ওই দশ বাই দশ খাওয়ার জায়গায় বসে তুমি মালের বোতল খুলবে আর ও তোমার গাঁ—
জয়িতা আমায় বরাভয় দিলোঃ ‘তোকে কে বললো আমি অ্যালেনের রেঁস্তোরায় বসে হুইস্কি খাবো! এতটা পথ যেতে হবে। এইরকম একটা কড়া সিনেমা দেখার পর! ওইরকম করলে তো কবিরাজি-কাটলেট সব টক্সিক হয়ে যাবে। আর সেটা যাতে না হয়, সেই জন্য — ভাই, খাই একটু? আপনার গাড়ী, আপনি অনুমতি না নিলে হয় বলুন।
ড্রাইভার মোলায়েম হ্যাঁ করে দিতে দু সেকেন্ড সময় নেয় নি। জয়িতা আমার দিকে ফিরেঃ ‘মদটা কাটার কী একটা চেষ্টা করবি তুই? প্লাস্টিকের গ্লাস কিনেছি।’
সব কিছু আমার কোর্টে এলে, আমি মাল কাটতে কাটতে বলিঃ ‘সিনেমাটা কিন্তু ফেলনা নয়। আরও কয়েকবার দেখতে পেলে —
জয়িতা একটু অসতর্ক ঘাড় নাড়েঃ ‘শিওর। আমি ম্যাক্সমুলার ভবনে দেখছি। আর রোনাল্ড রেবের তো কলকাতায়। মালটাকে জপালে হয় না?’
মদে প্রথম চুমুক মেরে আমি বলিঃ ‘হ্যাঃ সবাই-ই সুবিয়েলা, আর রেবের তোর জন্য ডিভিডি বগলে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কি না।’
নিজের প্রথম চুমুকটা লম্বা মেরে জয়িতা চিন্তাগ্রস্তঃ ‘তা যা বলেছিস বটে। জার্মানি থেকে ডিভিডি পাঠালে ক্যুরিয়ার চার্জ দিতে দিতেই আমাদের প্যান্ট হলদে হয়ে যাবে। তাছাড়া অফিশিয়াল, মানে ইন্টারন্যাশনাল রিলিজ না হলে ডিভিডিতে ইংরেজী সাবটাইটেলও থাকবে না। এহ্, মুজতবা আলীর ওপর খুব হিংসে হচ্ছে রে! ওই অগাধ জ্ঞানের ছিটে ফোঁটাও যদি আমাদের থাকতো!’
এরপর অনেকক্ষণ কোনও শব্দ নেই। শব্দ নেই বলতে, তোমার আমার — কারোর মুখে কথা নেই। সে নীরবতা ভাঙলো জয়িতাই। তখন আমরা শোভাবাজার অ্যাপ্রোচ করছি। জয়িতা ট্যাক্সির ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলোঃ ‘ভাই, আপনি মদ খান?’
আমি বললামঃ ‘ও কি রে? একটা বাচ্চা ছেলেকে তুই মদ অফার করছিস! তাও সে স্টিয়ারিংয়ে বসে আছে।’
জয়িতা আমাকেই ধমকে দিলোঃ ‘সো ফাকিং হোয়াট? আমার ভাই অ্যাডাল্ট, আর আমি তাকে দিদি হিসেবে একটা ড্রিংক অফার করতেই পারি।’
আমি বিরক্ত হইঃ ‘আরে চিল। ট্র্যাফিক পুলিশ জানতে পারলে দ্যে উড বাস্ট হিজ অ্যাস।’
জয়িতা আমাকে মুখ ঝামটা দিলোঃ ‘পুলিশ বাল করবে। চুক্কর তো, বিষের সঙ্গে খোঁজ নেই, কুলোপানা চক্কর। আচ্ছা ভাই, আপনার নাম কী?’
খুব সংকুচিত স্বরে ড্রাইভার বলেছিলোঃ ‘সুদীপ দত্ত।’
নির্ভেজাল বাঙালী নাম, ওই চৌপর রাতে, হলদে-কালো ট্যাক্সিতে শুনতে পাবে, এটা সম্ভবতঃ জয়িতা ভাবতেই পারে নি, তার ওপর খালি পেটে দু পাত্তর পড়ে গেছেঃ ‘দত্ত, সুদীপ? আর্রে, তুই তো আমার ভাই রে। আমার মাস, উম, না, না, পিসতুতো ভাই। আমার ছোট পিসি কুলীন ব্রাহ্মণের মেয়ে হয়ে বেণে ঘরে বিয়ে করেছে। হুঁ হুঁ বাওয়া, প্রেমে কী আর কুলীনত্ব চলে? প্রেম বায় ইটসেলফ কুলীন হলেই হলো।’
আমি বলেই ফেললাম ‘শালা দু পাত্তর মাল পেয়ে গেছে কি যাই নি, ন্যাকড়াবাজি শুরু। দত্ত মানেই বেণে? দত্ত কুলীন কায়েতও হয়। ফাকিং ইডিয়ট।’
জয়িতা অবাক হয়ে গেলোঃ ‘যা শালা, তবে তো মিটেই গেলো। কুলীন বামুন থেকে কুলীন কায়েত। একটা ষ্টেশন গ্যালপ। কোনও চাপই নেই তাহলে। ভাই, এই নে।’
ড্রাইভার সজোরে মাথা নাড়েঃ ‘না, না দিদি। ঠিক আছে। আপনারা খান না।’
এই না না - তে আমি পুরোপুরি হ্যাঁ হ্যাঁ সেন্স করেছিলাম। জয়িতাও বোধহয় পেরেছিলো। সটান জানতে চেয়েছিলোঃ ‘তুই ভাই গুটখা খাস না?’
ড্রাইভার লাজুক স্বরে বলেছিলো সে খায়। জয়িতা উদাস হয়েঃ ‘তবে আর কী — প্রবলেম সলভড। জর্দার গন্ধ মালের গন্ধকে চেপে দেবে।’
আমি বললামঃ ‘ছোটভাই, ছোট করে একটা মেরেই দাও।’ ওমা, আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখি ট্যাক্সি সাইড হয়ে গেছে। আর কি — গল্প দাদুর আসর শুরু হয়ে গেলো। সুদীপ দত্ত সম্পর্কে বেশ কিছু জানা গিয়েছিলো, যা আমি পরের দিনই ভুলে যেতে পেরেছিলাম। জয়িতা বরাভয় দিলোঃ ‘বুঝলি সুদীপ, তোর কোনও ভয় নেই। আমি ডিসি ট্র্যাফিককে ফোন করে দিচ্ছি। তোর গাড়ীর নম্বরটা বল আমায়।’
মোবাইল বেরিয়ে এলে আমি জয়িতাকে থামাইঃ ‘ডিসি ট্র্যাফিক বহোত ঘোড়েল আছে। তোর টোন শুনলেই বুঝে যাবে তুই শ্লসট হয়ে আছিস। আর তাছাড়া, পৃথিবীর সবকিছু টপ-ডাউন লেনে চলে না। কিছু কিছুতে বটম-আপ ভালো মাইলেজ দেয়। তুই ডিসেন্ট্রিলাইজেশনকে উড়িয়ে দিয়ে ট্রিকল ডাউন করাতে চাইছিস। আই থিংক, গিভেন দ্য সিচুয়েশন, দ্যাট ওভারকীলিং মাইট টার্ন ডাউন দ্য থিং। ওকে ওর লেভেলে সাল্টে নিতে দে। যাহ, ফেললি তো শাড়ীতে...’
জয়িতা মাছি ওড়ালোঃ ‘আহ্ অ্যালকোহল স্পিরিট না?’
আমি বলিঃ ‘আলবত।’
জয়িতা সিদ্ধান্ত দেয়ঃ ‘তবে? উবে যাবে। না জ্বলবে রঙ, না ধরবে দাগ; বাস, এক ছোটি সি মেহেক —
আমি বলে উঠিঃ ‘এটা কাকীমার শাড়ী না? গেঁড়িয়ে পরেছিস তো?’
কাব্যি-স্রোতের তোড়ের মুখে বাধা পেলে জাত কবিরা যেমন বিরক্ত হন, অবিকল সেইরকম বিরস গলায় জয়িতা বললোঃ ‘হ্যাঁ। তো?’
আমি শাসানোর চেষ্টা করলামঃ ‘ওই মেহেক তোমার সাড়ে আড়াইটে বাজিয়ে দেবে। বাড়ী চলো না একবার — মেহেক সেঁকে রেখে দেবে।’
জয়িতা স্টেপ আউট করে আমাকে স্টেডিয়ামের বাইরে ফেলে দিলোঃ ‘মা জানে না, ফিলিম ফেস্টিভ্যাল দেকতে এয়েচি? আঁতলামো করবো, আবার মালও খাবো না — কি যে বলিস না মাইরি ভাই তুই, বিশ্বাস কর, কোনও ধড়-মুন্ডুই খুঁজে পাই না মাঝেসাঝে।’
অ্যালেনের রেঁস্তোরার সামনে গাড়ী দাঁড়ালো। জয়িতা সবই দিয়ে দিলো সুদীপ দত্তকে, কিন্তু আমারই তো বউ, মানে, প্রেমিকা — সিকিভাগের কিছু বেশি রয়ে যাওয়া হুইস্কির বোতলটাকে কাঁখে করে নিয়ে ট্যাক্সি থেকে নামতে সে ভোলেনি। বগলে কাগজে মোড়া ব্লেন্ডারস’ প্রাইড, কে জানে প্যাঁচ লুজ হয়ে অমৃত চুঁইয়ে চুঁইয়ে টপাচ্ছিলো কিনা, হাতে চিকেন, পাতে চিংড়ি... সেসব যা তা দিন, যা তা রাত, যা তা সূর্য, যা তা পৃথিবী।
নোটঃ বিয়ের আগে পর্যন্ত বাপ আমার, মানে মম পিতাশ্রী আর কি, বাইরে থেকে মাল খেয়ে এলেই ধমক লাগাতো। কিন্তু বিয়ের পর এর’মও হয়েছে, বাড়ী ঢুকতে গিয়ে টলে পড়ে গিয়েছি, আর বাবা খ্যাকখ্যাক করে হেসে নিয়েইঃ জয়ী, তুমি মা ঠিক আছো তো? — এই ব্যাপারটার মানে আমি আজও বুঝিনি।
আর একটু পিছিয়ে গেলে গোলপার্ক মিশন থেকে আমাদের যৌথ হেঁটে ফেরা। শিয়ালদহে। এটা আমি আগে লিখেছি। সরি, ভুল লিখলাম, লেখার চেষ্টা করেছি। সেখানে একটা কথাই বলা হয় নি। চা চান তেংয়ে বা দাই পাই দংয়ে (ঈশ্বরকে আপনি হাজার একটা নামে ডাকতেই পারেন — আপনার অভিরুচি, আর, ঈশ্বর তিনি, তিনি সহস্রোত্তর শতনামের পরও আগের ঈশ্বরই বোধহয় থেকে যাবেন — সেটা আবার তাঁর অভিরুচি) খাওয়ার দামটা আমিই বোধহয় চুকিয়েছিলাম। সেটাও না করে থাকলে, মাঝেমধ্যে আমার যেমন হয়, পুরো ট্যাঁকখালির জমিদার ছিলাম। মোটের ওপর জয়িতা বাড়ীর মুখে এসে আমায় দশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দেয়। কারোর কাছে কিছু চাইতে নেই, এবং কেউ অনৈতিক কিছু দিলে, না বলতে নেই — এমনটাই আমাকে শেখানো হয়েছে। টাকাটা পকেটে চালান করে দিয়ে আমি জয়িতাকে শুধিয়েছিলামঃ থ্যাঙ্কস ফর দ্য বাকস, কিন্তু এই দানের কারণটা জানতে পারলে...
জয়িতা মুখে কোনও ভাবান্তর না এনেঃ 'তোর সিগারেট —
আমি আহত বিস্ময়ে বলে উঠলামঃ ‘ও কী রে! জানিস না, হাফ হার্টেড শট খেলতে মানা! হয় ডিফেন্স করবি, নয় অল আউট অ্যাটাকে যাবি। দে, আরও সাড়ে সাতটা টাকা দে।’
নোটঃ তখন ফিল্টার উইলসের প্যাকেটের গড়ন পাল্টাচ্ছে। সাবেক আঙুল ঠেলা প্যাকেট হয়ে যাচ্ছে বক্সড প্যাক।
এইসবই আর কি... বেঁচে আছি, থাকি। আমি, জয়িতা অর্থাৎ আমরা, আমার বন্ধুবান্ধব, জয়িতার গার্লস স্কুলের বন্ধুরা। খুব বেশী আর বাকী নেই আমাদের, তবুও ***-এর সৌজন্যে একবার জাবর তো কাটা গেলো। আর এই জাবর কাটতে গিয়েই দেখলাম, এতদিন চোখ বুজলে যা যা আমি গতকালের মতো স্পষ্ট দেখেছি, হঠাৎ করে কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেলো, এবং এতটাই ঝাপসা, যে, আমি বলে দিতে পারি আমার কোনও স্মৃতি নেই আর। আমি জানি, এমনটা হয় না। কাল তাহলে আমার বাঁচা ভারী হয়ে উঠবে। তবে এই মূহুর্তে নানান খোপে যে নানান ছবিগুলো চলছিলো-ফিরছিলো, তাদের জায়গাটা বেবাক ফাঁকা, খোপগুলো শূন্য — যেন এক লহমায় কেউ সবটা শুষে নিয়েছে নিঃশব্দে। কিংবা ব্যাপারটা এরকমভাবেও বলা যায়, আমি, এই এখনকার আমি ঢুকে পড়েছি আমাদের ছোটবেলাকার হোস্টেলে, কিন্তু সেটা ছুটির মরশুম। মরশুমি ছুটিতে ওই অতো বড়ো হোস্টেলটা বেধড়ক ফাঁকা, প্রত্যেক ঘরেই ফাঁকা, ছাত্ররা লম্বা দিনের জন্য বাড়ী যাওয়ার কারণে তোষক পর্যন্ত নিয়ে চলে যাওয়ায় কাঠের স্ল্যাব বের করে ঠা ঠা হাসছে চারটে করে তক্তোপোশ। শূন্যতার এমন চাপ জেনেও আমি প্রত্যেক তলায় প্রত্যেক ঘরে উঁকি দিতে থাকি — প্রত্যেক ঘরেই অন্ততঃ দুজন করে আমার পরিচিত মানুষ, আমি তাদের প্রত্যেককে এতটা পথ ফেলে আসার কোনও না কোনও বাঁকে রেখে এসেছি, তারা তাদের গল্প থামিয়ে আমায় সাদরে ডাকে। আমি তাদের কাছে যাই, বেশ কাছে, এবং বুঝি, হাজার কাছে গেলেও আমি তাদের কোনও দিন ছুঁতে পারবো না। তাদের সঙ্গে হেসে মামুলি কথা বলি কিছু, তারপর ‘আচ্ছা, এলাম তবে।’ বলে পাশের ঘরে যাই। তারা আমায় ভুলে যায়, কিংবা যায় না, কিন্তু নিজেদের অসম্পূর্ণ গল্পে ডুবে যেতে থাকে। হোস্টেলের যে ঘরে আমি থাকতাম, সেই ঘরের পাশের ঘরে আমি একটি অপরিচিত মেয়েকে দেখি, আমার চেয়ে ছোটই, তবে খুব ছোট নয়। তার দিকে তাকিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করিঃ ‘তুমি সম্পূর্ণা না?’
মেয়েটি মাথা নেড়ে জিজ্ঞাসা করেঃ ‘কেমন আছো, অনিন্দ্যদা?’
আমি অনিশ্চিত গলায় বলিঃ ‘ভালো। কিন্তু কথা বলছো কার সঙ্গে?
সে হাত বাড়িয়ে জানলা দেখায়। আমি জানলা দেখি। কী আশ্চর্য, বাইরে রোদ ঝলমলে আকাশ দেখে এই হোস্টেলে ঢুকলাম, সিঁড়ি ভেঙে দোতলা, মানে, সেকেন্ড ফ্লোরের বাঁদিকের প্রথম ঘর থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘর দেখে, একত্রিশটা ঘর টপকে বত্রিশ নম্বর ঘরে, অর্থাৎ গ্রাউন্ড ফ্লোরের ডানদিকে নেমে এসে দেখি, বাইরে তুমুল বৃষ্টি! এরপর আর একটাই ঘর আছে। তেত্রিশ নম্বর ঘরে আমিই ছিলাম এই হোস্টেল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার হাফে। প্রতি ছ’ মাসে আমাদের ঘর পাল্টে যেত। সে না হয় হলো, কিন্তু এখন দেখলাম, জানলার ওপারে ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। তিনিও আমার চেয়ে বয়সে কমই হবেন, আর তাঁকেও আমার চেনা লাগে। আমি এক ঝটকায় চিনতে পারি তাঁকেও, এই সম্পূর্ণারই বাবা। কিন্তু তাঁর বয়স সম্পূর্ণার সমানই হবে! এত দূর এসে, এত ঘর টপকে এসে, এতটা অতীত ঘুরে এসে আমি দেখছি — আমি তীক্ষ্ণ মেধাবী একটা লোক হয়ে গিয়েছি, নইলে কী করে বুঝতে পারি, জানলার এ পারে, যে পারে সম্পূর্ণা, সে দিকে আমার বর্তমান, সম্পূর্ণাকে যদিও দেখি নি অনেক দিন, তবুও তাকে চিনেছি তার অতীতের আদল দিয়েই, আর জানলার ওপারে, সম্পূর্ণার বাবা একদম সেইরকম, যেমন আমি তাঁকে শেষ দেখেছিলাম। তার পরেও তিনি অনেক দিন বেঁচেছিলেন। অ্যাকিউট মাইলয়েড লিম্ফোমা ধরা পড়ার তিনমাসের মধ্যে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবেই বেঁচেছিলেন। মনে পড়ে, যে সময় তাঁকে শেষ দেখেছিলাম, সে সময় আমার সঙ্গে তাঁর, এক সন্ধ্যায় কিছু তর্ক, কিছু কথা কাটাকাটি হয়। সেই কারণেই তাঁকে আর না দেখা। আমার। আমি জানিও না, রক্তের মারণ রোগ শেষ শয্যায় তাঁকে কেমন গড়ন দিয়েছিলো — জানলার ওপারে তিনি তুমুল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা একজন সুস্থ মানুষ। আমার মনে হয়, আমার সেই সন্ধ্যায় নিশ্চয়ই কিছু ভুল হয়ে থাকবে — যে কোনও মতান্তরেই একজন কখনও কাঁটামাপা সঠিক থাকতে পারে না, তার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে তার স্বার্থও ঘাপটি মেরে থাকে, আর সুযোগ পেলেই থাবা মারে, এই আমার বতর্মানের মধ্যে যেমন আমার অতীত। আমি জানলার কাছে আসি। সোজা দৃষ্টিতে তাকাই ভিজতে থাকা ভদ্রলোকের দিকে। তিনি স্মিত হাসছেন। বৃষ্টি তাঁর মাথা ভেজাতে পারে নি ঠিকই, কিন্তু তাঁর ধড় ভিজিয়ে একশা করে দিয়েছে। আমি তাঁকে বলিঃ ‘আপনাকে ভিতরে পেতে ইচ্ছে করছে। আপনি কী ভিতরে আসতে পারবেন?’
ভদ্রলোক মাথা নাড়েন, বলেন, যা আমি বৃষ্টির আওয়াজের মধ্যেও শুনতে পাইঃ ‘আসছি আমি, অনিন্দ্য। তুমি একটু দাঁড়াও।’
আমি মাথা নেড়ে ঘরের বাইরে যাওয়ার উদ্যোগ নিই। তিনি জানলার ওধারে নেই এখন আর, এন্ট্রান্স দিয়ে ঘুরে আসতে সময় লাগবে। আর ততক্ষণ... কী দরকার একটি মেয়ে একা একটি ঘরে... সেখানে থাকার। কোনও বাওয়ালে ফেঁসে গেলে আবার সময়, রেপুটেশন — সবকিছুরই তেইশ মারা যাবে। বেরিয়ে যেতে যাই, মেয়েটি উঠে আসেঃ ‘শোনো অনিন্দ্যদা, তুমি কিন্তু বাবাকে নিয়ে বাঁদিকের ঘরে যাবে। আমার ঘরের বারান্দার সামনেও দাঁড়াবে না।’
আমি আটকে যাইঃ ‘কেন বলো তো?’
উত্তর করার আগে মেয়েটা চোখ বন্ধ করে, ঠোঁট টিপে না-বাচক মাথা নাড়ে দেখতে পেলামঃ ‘এতগুলো ঘর টপকে এলে তুমি, তাও বুঝলে না?’
বিহ্বল মাথা নাড়ি আমিঃ ‘নাহ, কী বুঝবো বলো তো?’
মেয়েটি পড়া বোঝানোর সুরে বলেঃ ‘শোনো অনিন্দ্যদা, এই ঘর থেকে তোমার বর্তমান শুরু। ডানদিকের পাশের ঘরে তুমি তোমার সাম্প্রতিককে পাবে। ওখানের ডানদিকের যে তক্তোপোশ, সেখানে বসলেই তুমি তোমার নিজের ঘরে ফিরে যেতে পারবে।’
আমি চমকে উঠিঃ ‘কী বলছ? এমনও হয় নাকি!’
মেয়েটি খুব দৃঢ়ভাবে বলেঃ ‘হয় নয়, এটাই ঘটছে এখন। তুমি অনেকক্ষণ আয়না দেখো নি, না?’
আমি বলতে যাই, কিন্তু সুযোগ পাই নাঃ ‘সেটাই স্বাভাবিক। শোনো, তোমার সঙ্গে যে দেখা করতে আসছে, সে কিন্তু আমার বাবার অনেক পুরানো একটা সময়। তখন আমি... আমার মনে আছে — আমার পি এইচ ডি কম্পলীট হয় নি তখনও। তারপর আমার বিয়ে। তারপর সেপারেশন। বাবা এখন সব জানে যদিও, কিন্তু দেখে যেতে পারে নি। তুমি প্লীজ, বাঁদিকের ওয়াশরুমে একবার যাও। এখনই। ওখানে আয়না আছে। দেখো নিজেকে একবার। তারপর চোখে-মুখে খুব করে জলের ঝাপটা দিও।’
আমি ‘আচ্ছা’ বলে বেরিয়ে যেতে চাই। মেয়েটি আবার আমাকে আটকায়, তবে এবার শারীরিকভাবে, মানে, দরজায়, যাওয়ার পরিসরে হাত রাখে। বলেঃ ‘কিন্তু প্লীজ অনিন্দ্যদা, তুমি যেন ডানদিকের ওয়াশরুমে ভুলেও যেতে চেও না এখন। গেলে তুমি —
আমি এবার বুঝে যাই এবং হাসিঃ ‘ফ্রী জ্যাক হয়ে যাবো, তাই তো? আমি বুঝে গিয়েছি, সম্পূর্ণা। আর আমি এটাও বুঝে গেলাম তোমার বাবার সঙ্গে দেখা, কথা — এসব শেষ হলে আমায় আগে ডানদিকের ওয়াশরুমে যেতে হবে, তারপর আমি ডানদিকের ঘরে ঢুকতে পারবো। আমার এই রকম অভিজ্ঞতা আগে একবার হয়েছে।’
সম্পূর্ণা স্বস্তির শ্বাস ছাড়েঃ ‘উফ, বাঁচা গেলো। আমি ভেবেছিলাম —
আমি হেসে ফেলে বলিঃ ‘তুমি ভেবেছিলে তুমি আমাকে বোঝাতে পারবে না, তাই তো? কিন্তু ওই যে বললাম, আমার এই অভিজ্ঞতা আগে একবার হয়েছে।’
ম্লান হাসে সম্পূর্ণাঃ ‘বুঝলাম। এসো তবে।’
ঘর থেকে বেরিয়ে আমি সম্পূর্ণার ঘরের সামনের অংশের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাই। এখান থেকে এন্ট্রান্সটা ভালো দেখা যায়। ফাঁকা প্রাইভেট রোড। আমাদেরই বোর্ডিং স্কুলেরই রাস্তা। দুদিকে সুপুরি আর ঝাউগাছ। কয়েকটা ইউক্যালিপটাস গাছও আছে। তারপর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিস। উল্টো দিকে, অডিটোরিয়াম। তার আগে খোলা মাঠ। এই মাঠটায় ভলিবল খেলতো স্কুলের বন্ধুরা। আমরা শর্ট হ্যান্ড ক্রিকেট খেলতাম শনিবারের দুপুরগুলোতে। ভদ্রলোককে দেখা গেলো অনেক দূরে, এন্ট্রাসের মুখে। আমি বাঁদিকে তাকালাম একবারঃ আর্রে, বাঁদিকে যেখানে বারান্দাটা বেঁকে বাঁদিকের ব্লকে চলে গেছে, সেখানে একটা সোফাসেট! কিন্তু ওইদিক দিয়েই তো এসেছি, তখন তো ওটা চোখে পড়ে নি! চোখ বুজে ভালো করে মনে করার চেষ্টা করি আর একবার — না, ছিলো না! হেসে ফেলি আমি। আর বুঝি, মোশন ফীল করছি না যখন, আমার কোনও প্রয়োজন নেই ওয়াশরুমে যাওয়ার। কোনও প্রয়োজন নেই মুখ দেখার। কী-ই বা দেখবো, কমবার দেখলাম নাকি, নিজের মুখ! হতে পারে, এতগুলো ঘর টপকে আসতে গিয়ে তেলতেলে হয়ে গেছে; হতে পারে, অনেককটা অতীত ডিঙিয়ে আসতে গিয়ে একটু তেবড়ে-তুবড়ে গেছে। এর বেশী আর কী-ই বা আর হতে পারে! বরং আমি সিগারেটটা টানি মৌজ করে। অনেকক্ষণ সিগারেট খাই নি। বেশ ভালো লাগছে পাফগুলো। আহ্, যদি এক পেয়ালা গরমাগরম চা পাওয়া যেত এখন, তামাটে সাদা দুধ চা...
যাক গে, যে কথা হচ্ছিলো, প্রায় সবাই-ই পিঙ্ক ফ্লয়েডের অ্যানাদার ব্রিক ইন দ্য ওয়াল শুনে তাদের ফ্যান হয়েছেন, আমি গড়পড়তা ভারতীয়দের কথা বলছি। আমি কিন্তু রিটার্ন গিফট হিসেবে পিঙ্ক ফ্লয়েডের মাদার গানটা ক্রাশকে—
এহ্, লেখাটা বেঢপ বড়ো হয়ে তো গিয়েছিলোই, এবার বেধড়ক বড়ো হচ্ছে। এখানে থামা দরকার। থামি।
অনিন্দ্য ঘোষ ©
উল্লেখ্যঃ লেখাটা আরও পাতা বারো মতো বেশী। আসলে একটা চরিত্র আছে। তার অ্যাপ্রুভালের জন্য সেই অংশ মুলতুবী আছে।
রবীন্দ্রনাথের গোরা একটা কাগজ পাকিয়ে চোঙা তৈরী করে, তার স্রষ্টার জ্ঞান-গর্ভ কথা বলতে বেরিয়েছিলো দেশ জুড়ে। জীবন নিয়ে শেষের কবিতার অমিতো আর দিবারাত্রির কাব্যের হেরম্ব কম বাণী দেয় নি। হাল্কা বা গভীর — ছড়িয়েছে তারা প্রচুর। সেজন্য তাদের এই আমি, অজ্ঞাতকুলশীল, কম্মের দুখিরাম, ফাকিং স্টুপিড অনিন্দ্য ঘোষ ট্রোল, মিম... সোজা কথায় প্যাঁক মেরে এসেছি প্রচুর। আসলে কখনও তো জীবনকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবি নি। যখন যে টুকরো এসেছে, কুত্তার হাড় চেবানো মাফিক চিবিয়ে গিয়েছি। এক জীবনের এক লাগোয়া অনেকটা কথা বলতে গিয়ে দেখলাম, আমি তাদের থেকেও বেশী জ্ঞান মারিয়ে ফেললাম। এটা লজ্জার যে ২০২৬-শে বসে এইভাবে লেখাটা লিখতে হলো। অন্যভাবেটা কী কী হতে পারে, সেসব ভাবার চেষ্টা করেছিলাম লেখাটা শুরুর আগে। দেখলাম, আর যেভাবেই লিখি না কেন, আরও আর্টিফিসিয়াল হয়ে যাচ্ছে সেটা। অযথা স্ট্রীটস্মার্ট হওয়া আমার না-পসন্দ, ওতে পাছার কাপড় আরও সরে যায়।
তাই এটা এভাবেই রইলো। আমার সান্ত্বনা একটাইঃ আমি তো আর এটাকে আখ্যান বা গল্প বা উপন্যাস বা উপন্যাসিকা হিসেবে দেখছি না। এটা খুব বেশী হলে এটা একটা ফীচার ব্লগ হতে পারে। কিংবা হয়তো তাও নয়।
অনিন্দ্য ঘোষ ©
ছবিঃ থাক না। এখানে আর ছবি কী হতে পারে!
ঋণ/রেফারেন্সঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলি। এখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে।
No comments:
Post a Comment