Friday, March 27, 2026

এক-একটা দিন

 

 

এক-একটা দিন এমন এসে দাঁড়ায় মা’র ইঞ্জেকশন ডীপ ফ্রীজে রাখা থাকে, হপ্তার সুঁই ফোঁড়ানেওয়ালা এলে ফ্রীজ খুলি; ফ্রীজারে তপ্ত হাওয়া, ডীপ ফ্রীজারে উষ্ণ বরফ; স্নানে যাই, শাওয়ার খুলে ছিটকে উঠি, কেউ কি আমায় শাস্তি দিচ্ছে! স্নিগ্ধ হতে চেয়ে এবং না পেরে হতাশ আমি, বডিস্প্ল্যাশের বোতলের দিকে তাকাই, সেটা থমথম করছে, তার মুখ খুললে গরম তরল, বডি অয়েলে হাত দিয়েই চমকে উঠি, এই অসময়ে তেল এত তেতে উঠেছে কেন! স্নান হলো না যেমনটা কিনা চেয়েছিলাম, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি চানঘরের দরোজা বন্ধ করি; লকের কাছে হাত লেগে যায় আলটপকা; আঙুলের ডগা থেকে খানিক চামড়া উপড়ে গেলে লক, দরোজার গা বেয়ে মেঝে অবধি রক্তকে গড়াতে দেখি তন্নিষ্ঠ, তারপর আঙুলটাকে চেঁছে, অপ্তঃপর একটা টোকা ওই মহাসিন্ধুর ওপারের দিকে, রক্তের শেষ ফোঁটা সমেত দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলে আর একবার সেদিকে তাকালে ‘পর, আমি, ধোঁয়া উড়তে দেখি।

 

যখন তোমার সেই সব কিছু, যাকে তুমি তোমার নিজস্ব হিসেবে ভাবো, তার যে কটাকে তুমি সামনে পেলে, তার সব কটাতেই আঁচ উঠেছে দেখলে, তোমার একটাই কাজ, মগজটাকে ঠান্ডা রাখা। মগজ রাগে, লোভে, হিংসায়, কামে... এসবকিছুতেই গোটা শরীরই কথা বলে থাকে, কিন্তু বলায় মগজ। নচেৎ, মগজে কিছু রাখার জন্য মগজ, মগজে যেটা ছিল, সেটা ভুলে যাওয়ার হাহাকারে মগজ, বিস্মরণের অতল থেকে ঘাই মেরে মগজে এসে চলকে পড়ার আহ্লাদে মগজ। বরের বরাঙ্গ ছোট হওয়ার জন্য বরের হীনমন্যতার জন্য মগজ; কিংবা বরের জেগে ওঠা বরাঙ্গের ফেঁড়ে ঢুকে আসার ভয়ে স্ত্রী-অঙ্গ সিঁটিয়ে যাওয়ার জন্যও মগজ; অথচ পাশের দম্পতি বিছানার তুলো ওড়ালে তুমুল, যৌথ গ্র্যাটিফিকেশনের সবটুকুর হকদার ওই মগজ। তবু মগজের বিশ্রাম মেলে, মানুষ তাকে পরম ধন জ্ঞানে, সম্ভ্রমে বা বিভ্রমে বিশ্রাম দিতে চায়; অথচ জন্মের পরপরই সাফ সুতরো হয়ে এলে পাছায় আলতো চাপড়ে কেঁদে উঠলে যে পাম্প মেশিনের চলা নিয়মিত হলো; তার কী রাগের কোনও অধিকার নেই! তার লহমাকয়েকের জিরেনে মানুষের চোখে তুলসী পাতা পড়ে, কপালে চন্দন চর্চ্চন, ইলেক্ট্রিক চুল্লী আড়মোড়া ভাঙে। সেই পাম্প মেশিন যেন অপ্রেসড ক্লাস, আর মগজ ইজ আ ক্লাস অ্যাক্ট, সেই মতো হয় বিশ্রামের ডিসট্রিবিউশন।

 

নিজেকে আমি হৃৎপিন্ড ভাবি, মাংসপিন্ডেরই মতো, অর্থ-ছাড়া কারণ বলতে কী, আমার একার ঘরে উষ্ণতা আসে, অসময়ের অনাকাঙ্ক্ষিত উষ্ণতা... আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। বেরোতে কে যে বলে দেয়, যেন বেরোলেই শীতলতা পাবো, জানি না। বেরিয়ে দেখি, নীল আকাশ, সাদা মেঘেদের তুলোট ছেয়ে থাকা; মনে পড়ে যায়, রাতে সাইক্লোন হওয়ার কথা বলা আছে, কে মনে করিয়ে দেয় বুঝতে পারি না। শুধু হেঁটে যেতে থাকি। একটা জায়গা এসেই যায়, যেখানে মানুষের অ্যাগ্লোমারেশন বেশি, শহরে এ বিচিত্র কিছু না; আমি মানুষের আঁচ পেতে থাকি। ক্রমে সে আঁচ বাড়ে, বেড়ে সহ্যের সীমা পার হয়ে যায়। থমকে গিয়ে আমি ঠাহর করার চেষ্টা চালাই, কে আমায় বেরোতে বলেছিলো।

 

সভ্যতায় থাকবে তুমি, অথচ সভ্যতার দাহ নেবে না, এহেন অন্যায় আবদার তুমি যদি করে যেতেই থাকো, অবধারিত সেক্লুসন তোমায় অন্যত্র নিয়ে যাবে। সেখানে পরপর বিছানা পাতা, বিছানার পিছনে শিয়রের টেবলে অনেকানেক ওষুধের স্ট্রীপ; আর বাইরে চারিদিকে সবুজ, বিচ্ছিন্নতার সবুজ। এখানে সভ্যতা প্রকট হয়তঃ বা নয়, যতটা কিনা মানুষের অসংলগ্ন শব্দ-স্রোত। সে পুরানো আমলের বাড়ীর পিছ দুয়ার বড়ো, যাতে মাঝারি গতরের গাড়ী ঢুকে আসতে পারে; নিয়ে যেতে পারে, তোমাকে নিথর, সাদা মার্কিনে মুড়ে আর উচ্ছিষ্টের ফুলে সাজিয়ে।

 

অর্থাৎ তুমি এমন এক ফটো ফ্রেমের মধ্যে ঢুকে বসে আছ, যেখানে আমার, হ্যাঁ, আমার, এগোলে জান, পিছোলে গর্দান। তবু তুমি কিংবা আমি, আমি কিংবা তুমি, কি আশ্চর্য রোজ রোজ একই জায়গায় বেঁচে যাই; ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবি কাল কী কী করার আছে; পরের দিন সকালে উঠি, প্রিয়জনের হাত থেকে নিই চায়ের পেয়ালা, ছকে রাখা কাজগুলো ফিকে হতে হতে মরে গেছে; অন্য কাজ করতে গিয়ে টের পাই, আমাকে মাঝে রেখে একটা গোলাকার বৃত্ত, তুমিও তেমন হদিশ পাও নির্ঘাত, আর সে বৃত্তগুলো গরম হতে শুরু করেছে।

 

এমন নয় যে, চড়া নিরক্ষীয় গরমের কথা বলছি, তবুও এই বিপ্রতীপ উষ্ণতা তোমাকে ভাবায়, এবং আমাকেও। আমরা কেউই আজ বাইরে যাবো না, আমাদের অভিজ্ঞতা বারণ করে, গলে গলে পড়া মোমের মতো এক নরম কিন্তু গরম, আঁশটে পাঁকের মধ্যে নিজেদেরকে গলা অবধি চুবিয়ে রেখে আমরা প্রতিকূলের তাপ সহ্য করে যেতে থাকি।

 

আমরা থমকে গেলে হয় না? সেইরকম থমকে যাওয়া, যার পরে আবার চলতে শুরু করা যায় না। দেখিই না, যে আমাদের ভাবায়, যে কাঁদায়, আর যে হাসায়, অথবা ভয় দেখিয়ে চকমিলানে থাকে, আমরা থমকে থেমে গেলে সে কেমন থাকে?

উত্তর খুঁজতে গেলে ওই যে শ্মশানঘাট, কিংবা, কবরডাঙা। 

কিন্তু ভেবো একবার, কেমন?

 

 

 

অনিন্দ্য ঘোষ      © 

 

 

  

 

 

 

 

 

 

ফটো কার্টসিঃ  গুগল ইমেজেস 

 

ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলিএখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে