আর খানিকক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে আর একটা ব্রহ্মমূহুর্ত। রাতে যাঁরা জাগেন, বা, খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন যাঁরা, অন্ততঃ তাঁদের কাছে এটা অবশ্য খুবই কিঞ্চিৎকর কথা। আর কিঞ্চিৎকর যদিও বা একান্ত না হয়, নতুন কথা মোটেও নয় নিশ্চিত, কেননা, এমন ব্রহ্মমূহুর্ত, তাঁরা রোজই একটা করে দেখেন। অবশ্য, একটা প্রদত্ত দিনে একটার বেশী দেখার সুযোগও মেলে না।
সত্যিই কথা বলতে কী — তাঁদের কাছে এই আনেওয়ালা ব্রহ্মমূহুর্ত তেমন ঘোরতর দাগা দেওয়ার মতো কিছু না হলেও, আমার কাছে এটা চিরটাকাল দূরের নক্ষত্রের মতো মিটমিটে আলো নিয়ে রয়ে যাবে। এবং যাবে আমার আয়ু পর্যন্ত। কেন — সেকথা তোমার মনে পড়ে?
এই তো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হবে। প্রখর কোমার মধ্যে থেকেও কেঁপে উঠবে তুমি। ঘুম চোখের নার্স-অ্যাটেডেন্টরা তোমায় নিয়ে যাবে ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে। সোনারপুরের নার্সিংহোমে কেয়ার কতটা ইন্টেন্সিভ হতে পারে, সে কথা তুমি বুঝে যাবে, যেটা আমিও আন্দাজ করতে পারি মাত্র। তবুও সব কিছু নেই-নেই-এর মধ্যেও তুমুল লড়াই দেবে তুমি — স্বাভাবিক। নিজের আয়ুর একা প্রহরী আজ তুমি নিজেই।
...আর তারপর তুমি, একটা সময়, হেরে যাবে। বেলা সাড়ে নটাতে খবর পেয়েও এগারোটা কুড়ির মধ্যে আমি পৌঁছে উঠতে পারবো না — যেখানে বাড়ী থেকে ওই নার্সিংহোমে হেঁটে যেতে মিনিট সাতেক-আটেক লাগে। আসলে হবে কী — তুমি ভালো নেই, শেষ লড়াইটা লড়ছো, তোমার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৬০, সেখান থেকে কমে ৪৫ শোনার বহু আগেই তোমার ভাই, ভাইপো-ভাইঝিরা, বোনের ছেলেরা, মেয়েরা। আমাদের বাড়ীতে। দীপাদি সোনারপুরে আসে না বিশেষ, সেদিন তুমি ইন্সটিটিউশনাল কেয়ারে আছ শুনে দেখতে আসছিলো, জানতো অবশ্য তোমার মাথার ভিতরে ম্যাসিভ ব্লিডিংয়ের কথা। তবুও নিছক দেখতে এসে যা শুনলো, সেখান থেকে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে জলের গভীরতা বুঝতে অসুবিধা হয় নি তার। আমি আর জয়িতা তোমার উদ্দেশ্যে অটো ধরার পর দীপাদিই মাকে বলেছিলো, মন শক্ত করতে।
তারপর যেমন তোমার গোটা জীবনের অদ্ভূততম স্ক্রিপ্ট — শেষবেলাতেও কিছু ফারাক হলো না — এক্সপায়ার্ড শব্দটা যখন আমি জয়িতার মোবাইল থেকে ওভার হিয়ার করছি, ঠিক সেই সময় বাইরে তাকালে — তোমাদের সাবেক বাড়ী। অতঃপর অটো চললো রাস্তার সেই অংশ দিয়ে, যেখান দিয়ে তুমি হেঁটে গেছো অগণন। তোমার সেসবের বেশ কিছু অভিজ্ঞতা, যা কিনা জুত করে বলা যায় — আমি শুনেছি তার সব। আর মনেও রেখেছি।
গিয়ে দেখলাম — হার্ট-লাঙ মেশিন বোবা, বাকী যন্ত্র সব গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিটের তীব্র এসির মধ্যেও মামুলি একটা কটনের পেশেন্ট ইউনিফর্মে তুমি শুয়ে আছো নির্বিকার। অথচ এই ঠান্ডার কণাটুকুর জন্য প্রখর গরমে তুমি আমাদের ঘরে ঢুকতে না!
অশ্রু যে আমার ছিলো না — তাতে তুমি না যত আনন্দ পেয়েছো, তার থেকে বেশী অবাক হয়েছিলাম আমি। অন দ্য আদার হ্যান্ড, জয়িতার চোখের জল ভিজিয়ে দিচ্ছিলো তোমার বাকী পথের জার্নিকে। জয়িতা ওইদিন বোধহয় জলসত্র খুলেছিলো এক।
তারপর তো তোমায় নিয়ে আসা। একটু আগে জল তুলতে গিয়ে, বাড়ীর ভিতরের বারান্দায়, যেখানে তোমাকে... ভুল লিখলাম, তোমার শরীরটাকে রাখা হয়েছিলো, সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়েছিলাম অনেকক্ষণ। ভাবছিলাম — নিজের বাড়ীতে শেষ শয়ানে তোমার কি কিছু মনে হচ্ছিলো, হওয়া কি সম্ভব আদৌ, যেখানে, অনেক আগেই, কারণকি, তখন বিকেল ভেঙে যাচ্ছে, শীতের সন্ধ্যা ঝেঁপে আসছে; আর তার অনেক আগেই তোমার খাঁচার ভিতর থাকা সে অচিন পাখি তার নিজের মতো করে খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসে গা ঝাড়া দিতে দিতে ভেবে নিয়েছে, যা কিছু হারায়ে গেল যাক না...
তুমি নীল আকাশে পাখা মেলে দিলে। সেই নীল আকাশ যার নীচে ঘুমায় ছোট ছোট আশা নিয়ে ঘর করা, ছোট ছোট আশা নিয়ে পকেট ভরানো মানুষ, আর তাতে করেই তার চেনা আধুলি হারিয়ে যায়, জেগে থাকে কত ব্যথা, হাহাকার। ছোট ছোট মানুষের, কিংবা রাত্রির কান্নাকে পিছু ফেলে তুমি পাখা মেলে দিলে, এবং সেটাই স্বাভাবিক, কারণ, তখন দিন, রাত মুছে গেছে, আর ওপরের নীল আকাশ অজানা — তবু খাঁচা ভেঙে উড়ে যায় পাখি।
কিন্তু পুরোপুরি কি যেতে পারলে, বাবা? যদি গিয়ে থাকো, তাহলে, আজও — ৫ বছর পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও, প্রায় প্রতিদিন, আমার স্বপ্নে, কে আসে ধীরে?
অনিন্দ্য ঘোষ ©
লেখা — ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬, আমার প্রাইভেট পেজে ছিল। সেখান থেকে কপি-পেস্ট করলাম, পাবলিক পেজে গেলো। ব্লগটাও আজ আপডেট করে দিলাম।
ফটো কার্টসিঃ গুগল ইমেজেস ।
ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলি। এখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে।