Friday, May 1, 2026

মা’র কথা, মা’র জীবিতকালে আরও একবার এবং নির্বাচনকালে এই প্রথম

 

 

সকালের গল্পে বাসী ঘটনার গন্ধ বেশি। ও আমার পছন্দ নয়। আমার সকাল খোঁয়াড়িতে কাটে, কখনো স্বস্তা হুইস্কির, অন্যথায় দমদার ঘুমের ওষুধ তখনো আমার জাগরণে স্ট্রেচ করে আছে। সকালে আমি গল্প ব্যাপারটাকেই ভাবি না — মিথ্যা কথা না লিখতে চাইলে, কোনো শিল্প মাধ্যম নিয়েই ভাবি না। সকালে আমার জড়তা দেখলে অপরিচিত দ্বিতীয়ের যে খটকাটা লাগবে, সেটা যে বিস্ময়ের, তা আদৌ নয়।

 

ইদানীং অবশ্য একটু অন্যরকম যাচ্ছে, খুব ঝটপট করে আলিস্যি ভাঙছি আমি। আর তারপরই চলে যাচ্ছি মা'র ঘরে। দিন দশেকের কিছু বেশি হল। জানি না, ঘুম থেকে উঠেই শুধু উচ্ছ্বসিত আমি-অঙ্গকে হাল্কা করে, মানে, পেচ্ছাপটুকু সেরে আর ঘাড়ে-মুখে জল দিয়ে মা'র ঘরে হুড়মুড়িয়ে যাওয়াটা আর কতদিন চলবে — বস্তুতঃ মাকে এই আয়ুর মতো ছেড়ে দিতে হচ্ছে আমায়। একজন্মের চিরবিদায় তো সহজে হয় না; তার ওপর মা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাকেন্দ্রে নেই, বাড়িতেই আছে, প্রযুক্তি যতটা সম্ভব বাড়িতেই আমদানি করা হয়েছে। তবুও এক একটা দিন এক একটা অসুবিধা নিয়ে আসছে। বর্তমানে এই আমার সকালের গল্প, খবরের কাগজও বলতে পারেন। একটা গোটা রাজ্যভোট চলে গেল, আমি খবরের কাগজ পড়িনি, ভিস্যুয়াল মিডিয়া থেকে তাড়াতাড়িতে যতটা বেশি সম্ভব টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে নট-নটীরা ক্যায়সা গুল খিলাচ্ছেন। যা বুঝেছি, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা ভয়াবহ, এটা ভাল কোনো দিনই ছিল না, কিন্তু এখন এই ভয়াবহতার এক্সটেন্ট অ্যান্ড ম্যাগনিটিউড হদিশ করতে পারলে ঠান্ডা মেরে যেতে পারে প্রায় সবাই-ই। আর আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

 

কিন্তু বেশিক্ষণ ঠান্ডা থাকতে পারছি না। ২৩২ সি আর পি, ৪০০০০ প্লেটলেট, ১৮৫০ মিলি লিটার লিক্যুইড ইনটেকের জন্য ৩৫০ মিলি লিটার ইউরিন আউটপুট, রাইল'স টিউব দিয়ে বেরিয়ে আসা উদ্যত রক্ত, বাইপ্যাপের বরাভয়ের কার্পেট — এসব নিয়ে মা আমায় ঠান্ডা ব্রুমেশনে থাকতে দিচ্ছে না। কেননা, মা নিজেই শাট ডাউন হওয়ার মুখে। যে কোনো সময়ে নেমে আসতে পারে পাওয়ার কাটের ঝাঁকানি। কিন্তু তবু্ও... শ্বাস চলছে মানে আশা থাক, বা না থাক, করার কিছু না কিছু আছে।

কিন্তু এসব, মানে, মা’র এই সংকটক্রান্তি আজকের নয়। ঠিক কবে থেকে সেটাও এক্কেবারে সঠিক করে উল্লেখ করা সম্ভবও নয়, বরং ইভেন্ট-মার্ক দিয়ে ভাবলে এইরকম —

গত বছরের ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি এটা বোঝা গিয়েছিল যে, একার চলাফেরা, এমনকি বেডরুম থেকে বাথরুম পর্যন্ত, মায়ের পক্ষে আর সম্ভব নয়। তাই পনেরো-ই ডিসেম্বর থেকে মায়ের জন্য বারো ঘণ্টার দু খেপে আয়া রাখা হল। 

এ বছরের মার্চ মাসের পাঁচ তারিখ আমার আর জয়িতার বিবাহবার্ষিকী। ওইদিন বা সংলগ্ন কোনো একটা দিনে আগে ডাইন আউট হত, এখন স্যুইগি বা জ্যমাটো করে দিই। তা মা এ বছর খুব থামা থামা গলায় বলেছিল, মাটন খাবে। পাতলা রান্না, যেমন আমি খাই, আর বাড়ির তৈরী। কাছাকাছি একটা শনিবার ছিল, আর তাকে তাক করাও গিয়েছিল। তারপর যেটাকে সোডিয়াম কমে যাওয়া, অর্থাৎ, হাইপো ন্যাট্রেমিয়ার সিম্পটম বলা যায়, সেসবের পর্যাপ্ততা… ন্যাটরাইজ ১৫ শুরু হল, শেষও হল, সোডিয়ামও বাড়ল কিন্তু উপসর্গ গেলো না, আমরা আরও কিছু টেস্ট করলাম, আনাড়িতে মহাগুরুত্বপূর্ণ কিছুর দায় পেলে যা যা করতে পারে, যতরকম ঘেউ ঘেউ, রক্তদান শিবির বেড়ে যাচ্ছে, অথচ সরকারী ব্লাড-ব্যাঙ্কে রক্ত নেই, কারণ দাতারা ৫০০-৬০০ টাকা করে পাচ্ছে এক পাউচ রক্ত দিলে, আর সেটা তুমুল দামে বাজারে বিকোচ্ছে বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের কাউন্টার থেকে। শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য নেই, পরিষেবা নেই — অথচ শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির চরম হল, ৫ জি পরিষেবা যখন জিও কোম্পানী ফ্রীতে দিয়েছিল, তখন ঝরো ঝরো ধারা, ডেটা বরিষা; আর এখন তিন মাসের জন্য ৮৯৯ টাকার প্ল্যান ৯০ দিনের জন্য লাগামহীন টকটাইম আর ১৮০ জিবি (দিনে ২ জিবি করে) + ২০ জিবি বোনাস = ২০০ জিবি ডেটা, কিন্তু ভরা রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়ার বেসামাল হর্নের মাঝেও কোনো প্যেমেন্ট গেটওয়েই কাজ করে না। গোল গোল ঘুরে নিয়ে রিফ্রেশ ইয়োর পেজ। পাগলদের হাতে বাইনোকুলার, কী কী দেখা সম্ভব, দেখলে তবে জানা যায় যে দেখলাম, আগে থেকে আন্দাজ করতে যাওয়া মূর্খামি।

 

এনিওয়ে, মা’র কথা যখন ওয়র্ড স্যালাড থেকেও কমে নীরবতায় এল, যখন দেখলাম, মা শুধু হাসি দিয়ে মেক-আপ করতে চাইছে সবকিছু, তখন মাকে নার্সিং হোমে নিয়ে গেলে, অ্যাকিউট সেপসিস। জানা গেলো, এটা সেপটিসেমিয়ার বড়দা। যেন যুদ্ধ হবে, এইভাবে সার বেঁধে নেমে এল কেন্দ্রীয় বাহিনী, কিংবা অ্যান্টিবায়োটিকের ইঞ্জেকশন, সশস্ত্র সেনা বলের মতো সজাগ হয়ে উঠল স্যালাইন, আয়াদের দেখে আমার মনে হচ্ছিল বিভিন্ন পার্টির ক্যাডার, যারা অনেক কিছু করে এবং বুঝেই করে সেসব, কিন্তু পার্টিটা কেন করে, শুধু সেটাই বোঝে না। তাই প্রাণপণ, মনপ্রাণ ঢেলে সবকিছু করেও বেধড়ক ঝাড় খেয়ে যায় নার্স বা নেতা-উপনেতাদের কাছে। অক্সিজেন মাস্ক — এ তো জীবনে টিঁকে থাকার একমাত্র অবলম্বন, পার্টির ম্যানিফেস্টো বা ভোটে জিতলে রাজ্যের জন্য করণীয় সব কিছুর সনদ, নিদেনপক্ষে হোয়াইট পেপার বা ম্যানিফেস্টো। ডাক্তারদের ভেবে-চিন্তে নেওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং নার্সদের ফলো করে যাওয়া… মা’র সি আর পি কমছে — বিধানসভায়, কিংবা পার্টি কংগ্রেসে ওপরতলার মেধার লক্ষ্য স্থির করার মতো যে, যতই যা হোক, রাজ্যটাকে ভোট গ্রহণের বিষ থেকে মুক্ত করে দিতে হবে, তারপর উন্নয়ন কিংবা অন্য আর যে কোনো কিছু, যা এই সূর্যের নীচে হতে পারে।

 

হাসপাতালে আসি, রক্তের বন্দোবস্ত করি, মা’র বিরল রক্তের জন্য এর-ওর, যে কোনো নশ্বরের পায়ে পড়তে বাকি রাখি না। সমন্বয় জিনিসটা ঠিক কী, সেটা ব্লাডান্বেষণে নামলে ভাল বোঝা যায়। যা বেরোচ্ছে, সব পিছ দুয়ার দিয়ে, অন্যদেরকে টপকিয়ে, সেই অন্যরাও কিন্তু কারোর মা বা মেয়ে বা অন্য কোনো স্বজন। দামী অ্যান্টিবায়োটিক কম দামে পাওয়া সরবরাহ করেন এমন লোকের সঙ্গে কথা বলি, ওষুধ আনতে অন্যত্র যাই। একটা দামী ওষুধ যে অসম্ভব স্বস্তা হতে পারে, সেসব পয়জার যদি কেউ বুঝতে চায়, তাকে হেসে বলারঃ আগে কারোর জন্য মাঠে নামো। মাঠ বুঝিয়ে দেবে খেলার নিয়ম।

এসবের ফাঁকে ফাঁকে যখনই জিও কোম্পানী অন্যমনস্ক কিংবা সাময়িক দয়ালু, দেখে নিয়েছি বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল, শ্যামবাজারের শতেক পুরানো চা-টোস্ট-পোচ-ওমলেটের দোকানে বসে, কিংবা মেট্রোতে স্ট্রিমিং ঠিকঠাক থাকলে, মেট্রো থেকে নেমে অটোতে, তারপর বাড়ি ফিরলে দৈত্যাকার ব্রডব্যান্ডে। বীণাপাণি, পিনাকপাণি -এর পর, নশ্বর পানি হয়ে পানিহাটি এত গুরুত্ব পেল, কারণ সে চত্বরে আসন্ন ভোট নিয়ে তখন আগুন অগাধ। আমার পার্সোনাল ডায়েরিটা বেশ কিছু দিন পর আবার নড়ে উঠল। এবার সেখান থেকে, আনকাট, নীচে রইল

 

একটা দেশ ছিল। যাহ্‌, পাস্ট টেন্স ইউজ করে ফেললাম যে! দেশটা তো আছেও। মানচিত্রে আছে, রণক্ষেত্রে সাইড কেটে আছে, ভোটে আছে, নোটে আছে — আছে বলাই যায়।

সেই দেশের একটা পেল্লাই শহর ছিল। দেশের সাংস্কৃতিক, না কীসের যেন একটা রাজধানী বলা হত তাকে।

সে শহরে একটা হাসপাতাল ছিল। সরকারি হাসপাতাল। সঙ্গে কলেজও। সেখানে ডাক্তারী পড়তে থাকা একটি মেয়ে কোনও গূঢ়-গভীর কারণে, কিংবা কারণ ছাড়াই রেপড অ্যান্ড মার্ডারড হল। এটা বছর খানেক আগের কথা।

চেনা চেনা লাগছে? কী — ভারত, কলকাতা, আর জি কর? তাহলে তাই, আমি তো গল্প বানাচ্ছি না আর;- তাহলে ওই, আর জি কর।

ঘটনা সবারই জানা, ভাল মতো জানা, কেননা, রাত-ফাত দখল হয়ে গেছে, অনেক বাত-সাথ খরচা করাও হয়ে গেছে।

প্রশ্নটা অন্য — আর জি কর ভিক্টিমের নাম-সাকিন বলা যায় না, বললে কানুন-গড পাপ দেবে। তামান্নার ক্ষেত্রে অবশ্য সেসবের বালাই নেই। চিল্ড্রেন'স অ্যাক্ট, ১৯৬০, কোয়া জুভেনাইল জাষ্টিস অ্যাক্ট, ১৯৮৬, কোয়া জুভেনাইল জাষ্টিস কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অফ চিল্ড্রেন অ্যাক্ট, ২০০০, কোয়া দ্য সেম, ২০০৬, কোয়া দ্য সেম, ২০১৫ — এসব বালছালের ব্যাপার। শ্রেণী-পরিচয় বা ক্লাস-আইডেন্টিটি বড়ো ফ্যাক্টর।

কিন্তু আর জি কর ভিক্টিমের মা-বাবা একটা ন্যায়বিচার, যেমনটা মিললে ন্যায়বিচার মিলল বলে তাঁরা মনে করতেন, সেটা তাঁদের মেলেনি বলেই তাঁরা ধারণা করেছেন। তার সঙ্গে এটাও মনে করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসকদল থাকতে তাঁরা সেই ন্যায়বিচার, যার আদল তাঁদের চেতনায়, সেটা তাঁরা পাবেন না। ইন্টার অ্যালিয়া, তাঁরা এটাও মনে করেছেন যে, বিপ্লবী চেতনায় গা-হাত-পা-মগজ সেঁকে নেওয়া আগমার্কা বামপন্থীরাও তাঁদের সেই ন্যায়বিচার এনে দিতে পারবে না। যদি কেউ পারতে পারে বলে তাঁদের মনে হয়েছে, সেটা ধর্ম নিয়ে ন্যাকড়াবাজী করা বিজেপি। এবং তাঁরা সেইরকম মনে করেন, এবং রাজনৈতিক না হলে ন্যায়বিচারের নামে বড়োজোর তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম মিলতে পারে — মনে করে বিজেপি দলের হয়ে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।

এতে কার কার ফাটছে?!

আমার পরিচিত বাম-বন্ধুরা খেপে উঠে অন্ডকোষ চুলকোতে শুরু করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদেরও ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না।

আচ্ছা, আমাদের খুজলি হলেই যে রসুনের দিকে আমরা একজিমার রসে চটচট করা হাতখানি বাড়াই, সেটা তো হল গিয়ে, আমার-আপনার, ভারতের সংবিধান।

১৯৫০ সালে সংবিধানের প্রথম সংস্করণে ভারতের জন্য কী কী বিশেষণ ছিল?

সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, প্রজাতন্ত্রী

১৯৭৬ সালে, বইয়ের যখন হেব্বি কাটতি, সেই তখন ৪২ তম সংস্করণে কী কী বিশেষণ লাগানো হল?

সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, প্রজাতন্ত্রী

সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র

 

সোশ্যালিজম নিয়ে আমি বিস্তর লিখেছি আগে। মাদারচোদ, বেটিচোদ জাতীয় খিস্তির চাইতেও এটার ভূমা বেশি, কেনকি, আপনার হয়ে কিছু অন্যে ভেবে দেবে। আজ যদি আমার মা যদি কোনো ভোজের বাজিতে সুস্থও হয়ে উঠত, তাহলেও অক্সিজেন স্যাচুরেশন ধারাবাহিকভাবে কম থাকার জন্য তার মগজ ও মনন নিয়ে একটা ধোঁয়াশা থাকত। কিন্তু তাই বলে দেশের সব মানুষ অক্সিজেনের ইনসাফিসিয়েন্সিতে ভুগছে, আর সেজন্য তারা আর ভাবনা-চিন্তা করতে পারবে না, সব তাদের হয়ে ভেবে দেবে কিছু মানুষের অ্যাগ্লোমারেশন যাদের প্রায় প্রত্যেককে সেই তারাই কোডেড সিদ্ধান্ত দিয়ে মনোনীত করেছে, এটা ভাবা আর যাই না হোক, পাপ তো বটেই।

 

সেক্যুরালিজম নিয়ে ঠারেঠোরে হয়তো আগে কিছু লিখে থাকলেও লিখে থাকতে পারি, যেমন কিনা আমার ভাবনা। যদি করেই থাকি, তাহলে আজ আবছা জিনিসটাকে একটু ফুটিয়ে লিখি। দেখুন, সেই মহম্মদ ঘুরীর আমল থেকে বোধহয় (আসলে আমি মুসলিম ইনভেডারদের ক্রোনোলজি ভুলে গিয়েছি) হিন্দু আর বৌদ্ধ (পরে শিখ) ধর্মের দেশটা মুসলমান বলে এক অন্য ধর্মের মানুষদের মুঠোর মধ্যে থাকা আমলকী হয়ে গিয়েছিল। এবং সেটা কিন্তু কম সময়ের জন্য নয়। হয়তো ভারতের পূর্বদিক তেমন করে তাঁরা বশ করে উঠতে পারেননি, কিন্তু পরাধীনতার একটা ভাইব ছিল সেই সময় থেকেই। এবং দেশের মধ্যে, সর্বত্র।

পরবর্তী সময়ে ইংরেজরা এল। আমরা আলেকজান্ডার-এর পর আবারও একবার আর্যরক্ত দেখলাম। আর্যরক্ত কথাটা বিতর্কিত লাগলে, রাজরক্ত বা নীলরক্ত ভেবে নিন। তারপর তো বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী আর অবিভক্ত পাঞ্জাব মিলে দেশটাকে সেই রাহুর কবল থেকে মুক্ত করল। একটা পার্সেন্টেজ এফোর্টও যে স্পোরাডিক্যালি অন্যত্র থেকে আসে নি, তা নয়। আর সেটা প্রসঙ্গও নয়।

বলবার কথা যা, এই এতগুলো শতাব্দী তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমাদের মধ্যেও কিন্তু ধর্মীয় অভিযোজন ঘটেছিল, সিঙ্ক করে নেওয়ার এই অভ্যেস পরিবেশের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েই তৈরি হয়, নইলে মানুষ কবে হারিয়ে যেত। আপনারা পৃথিবীর একমাত্র এথনিক ওয়ার-এর কথা ভাবুন সেটা ছড়িয়ে পড়েনি এই মুহুর্মুহু সিঙ্ক করে যাওয়ার কারণেই। আমি এটা থেকে এই মনে করি যে, প্রয়োজনানুযায়ী সেক্যুলারিজম আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে সহজাত। আলাদা করে সেক্যুলার তকমা দিয়ে কী লাভ? ধর্ম বলতে যে জিনিসটাকে নিয়ে ধার্মিকরা চর্চা করেন, তাঁদের বাস অন্যত্র, ধরা যাক, সেই ডোমেইনের নামই হল ধর্ম। আর রাজনীতিবিদরা ধর্ম বলতে যে জিনিসটাকে নিয়ে চর্চা করেন, সেই ধর্ম তাহলে থাকে ধর্মতলায়।

বলবার কথা অতি সামান্য এক. ধর্ম নিয়ে আমরা বেশি কিছু জানি না। দুই. মানুষ ধর্ম বলতে যে সামান্য কিছু বোঝে বা যে যে সামান্য কিছুটা বোঝা তার উচিত, আর রাজনীতি ধর্ম বলতে যা বোঝাতে চায়, সে দুটোকে সম্পূর্ণ এক করে দেওয়া মানে ধর্ম থেকে আরও সরে যাওয়া।

পরম্পরা থেকে পাওয়া, সহনশীল এক সেক্যুলারিজম আমাদের ছিল, অযথা কোডেড করে সেটা স্পষ্ট করে তোলার মধ্যে দিয়ে সেটাকে আরও ক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হল মাত্র। প্রসঙ্গত, আমাদের কনজেনিটাল সেক্যুলারিজম এবং আমাদের সোশ্যাল কন্ডিশনিং এই দুই-ই কিন্তু ধর্মে-ধর্মে আমে-দুধে মিশে যাওয়ার কথা মোটেও বলে না। আমাদের জন্ম দেন এক পুরুষে এবং এক মহিলায়, অর্থাৎ ইন্ডিভিজুয়ালে, আর আমাদের সোশ্যাল কন্ডিশনিং যদিও কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে হয়, কিন্তু সেখানেও একটা লিনিয়ারলি লিনিয়াল আবহাওয়া থাকে, যেটা আমাদের পরমত সহিষ্ণুতা শেখায়, অর্থাৎ সেটাও অংশত টিপিক্যাল দেখালেও আদতে ইন্ডিভিজুয়াল। এর বাইরে আর কিছু বলতে চাওয়া মানেই সেটা ইন্টারপোলেটেড, ও ফলত, সেটা কসমেটিক। অতএব ১৯৭৬ সালের সংশোধন, আমার কাছে, একদিক থেকে অবমাননাকর (সমাজবাদ), এবং অন্য দিক থেকে অর্থহীন (প্রশাসন ইত্যাদিতে ধর্ম-নিরপেক্ষতা)। মা’র ঘরে একবার করে যাচ্ছি, বাইপ্যাপের নকল আরামে পেইনকীলার ইঞ্জেকশনের কাঁটামাপা ডোজে মা অরবে সেমি কোমা থেকে পুরোপুরি কোমার দিকে যাচ্ছে, আর আমি বিভিন্ন ওষুধ গুগল করছি, আর ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে, অনুমতি নিয়ে চালিয়ে দেখছি, কিন্তু কই, মা’র তো এক মূহুর্তের জন্য সাড় ফিরল না! হয়তো পরম কাছের জনকে বাঁচাতে আমি এবার অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাব, ৪০,০০০ প্লেটলেটকে তোলার জন্য প্লেটলেট চালিয়ে দেব, কিন্তু সন্দেহ আছে, প্লেটলেট চালানোর জন্য নতুন করে চ্যানেল করতে গেলে মা’র ব্লীডিং বন্ধ করা যাবে কিনা। হয়তো আমি তোয়াক্কা করব না, যেহেতু সেকুলার, তাই বানানো বা ধ্বংসের দিক থেকে, মন্দির, মসজিদ, গীর্জার অনুপাত ঠিক রাখার মতোই পাটিগাণিতিক বুলডোজার চালাব একটা মানুষের শরীরের ওপর।

একটা মানুষের শরীর বলতে তো এখানে আমার মা’র অসুস্থতা। তাহলে কালকের ডায়েরির পাতাটা এবার দেখা যাক

অনেক ছোট ছোট কথা, দৈনন্দিনেরই, সাদামাটা, অতি সাধারণ আর বলা হল না, শোনারও ছিল কিছু, হল না তাও, সব কিছুই এক অগাধ ঘুর্ণিতে হারিয়ে যাওয়ার মুখে।

এখনো তুমি আছ। সাড়ে এগারো ঘন্টা ধরে নন-রিব্রিদার মাস্কের নীচে, দশে চলা অক্সিজেন খুঁজে খুঁজে নিশ্বাস টেনেছ, তুমি। অনেক গেঁয়ো কথা হাতে কলমে শিখিয়েছিলে, আজ একটু দূরে থেকে, যেখানে কথোপকথন যায় না, শিখিয়ে দিলে, হাঁপ ওঠা কাকে বলে। তোমার পিঠের বেডসোরগুলো পাঁজরের ওঠানামার ঘষা খেয়ে আরও সূচালো হয়ে গেলো, আরও মাতোয়ারা হয়ে গেলো। সারারাত ১৮০ এর ওপর হার্ট রেট নিয়ে ঘুমোতে পারোনি তুমি। তোমার আধখোলা চোখের মণি ঘুরছিল অ্যাকোরিয়ামের মাছের মতো, আর থেকে থেকে তুমি খুঁজছিলে আমায়।

তুমি আমাকে এটা আগে বলো নার্সিংহোম থেকে সেপসিস কমিয়ে বাড়ি নিয়ে এলাম তোমায়, বাড়ির শুশ্রূষায় আরও সেরে উঠলে তুমি। চেতনা এল, হাসি এল, অল্প অল্প করে আসতে শুরু করেছিল শব্দরাও। কিন্তু তারপর?

আবার কীভাবে বাড়ালে সেপসিসটাকে, বলো তো? আমি তো তোমায় আরামে পেলবে থাকার বন্দোবস্তই করেছিলাম।

যাবে। আগে যাওয়ার কথা তোমারই, কেন যাবে না! কিন্তু তাই বলে এভাবে কেউ যায়, বলো। মাটন স্টিউ খাওয়ানো হল না, গান রেকর্ডিং হল না। তুমি এই যে গমনোদ্যত, তুমি কি জানো, তোমার একটাও ভাল ছবি নেই আমাদের কাছে?

আর এখন তো অক্সিজেনের জাম্বো সিলিন্ডার, তিন চ্যানেলের ড্রিপ, সারি সারি ইঞ্জেকশন, মুখে মাস্ক, তারই মাঝে জায়গা করে বসে যাচ্ছে নিব্যুলাইজার। চোখের পাতায় স্প্রে। পিঠের বেডসোরের জন্য আর একটা। তোমার মাথার পিছনে নির্বিকার নির্বিরাম চলে যাচ্ছে মনিটর।

আজ বাইপ্যাপ দেওয়ার পর তোমার শান্তির ঘুম দেখে বড় শান্তি পাচ্ছিলাম, মা। কাল সারারাত্রি তুমি লড়ে গেছ। কিন্তু সকাল থেকে সেই ক্লান্তির সঙ্গে কষ্ট দূর হলে আরামে ঘুমিয়ে যাচ্ছ, তুমি। একটু আগে এক টেকনিক্যাল মিসম্যাচের জন্য গলগল করে ঢুকতে থাকা অক্সিজেন যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে সেই যে চোখের পাতা খুললে তুমি, দেখতে চাইলে আমাদের, তারপর টেকনিক্যাল হ্যাজার্ড কাটিয়ে দিলেও তো তোমার চোখ বন্ধ হল না!

এ কেমন ঘুমোনোর ভঙ্গি, মা! কেন তুমি বুঝতে পারছ না এই আধা খোলা চোখ আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছে গতকাল রাত, আর সামান্য কিছু অক্সিজেনের জন্য হার্ট-লাঙ সবসময়ের জন্য কনফিডেন্ট তুমি কীভাবে হাঁ করে ঠেলে ঠেলে উঠছিলে...

তোমার এই যন্ত্রণায় ডুবে থাকা মুখ, মাস্কের আড়ালে তোমার এই দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই, আর ওই আধা খোলা চোখে আমায় খুঁজে চলা এসব যে আমার আয়ু তক গাঁথা হয়ে গেলো, মা!

এখন তোমার হাঁটার ভঙ্গি আমার আর মনে পড়ে না, কিন্তু মনে পড়ে, কথা বলতে চেয়ে ও না পেরে তা, আমার ঘাড়ে হাত ফেলে দেওয়া, যাতে স্পর্শ দিয়ে বলে উঠতে পারো। কিন্তু পারলে কি, মা?

এখনো আমরা লড়ে যাচ্ছি তোমার ইউরিন আউটপুটটাকে বাড়ানোর জন্য। ওটা হতে থাকলে কে বলতে পারে, খাদের ধারের অতলে এক পা বাড়িয়ে আবারও একবার পিছিয়ে আসতে পারো।

মা, লড়ো। জীবনীশক্তির শেষ বিন্দু দিয়ে লড়ো।

 

এটা গতকালে লেখা ছিল, মা। আর আজই তুমি রাইল'স টিউব দিয়ে রক্ত বের করে দিচ্ছ — ৬.৫ হিমোগ্লোবিনে, ৪০,০০০ প্লেটলেট নিয়ে!

 

নোটঃ           ৩০.০৪.২০২৬ সকালে রেক্টাম দিয়েও ব্লীড করেছে।

              ১.০৫.২০২৬ সকালে চুল আঁচড়াতে গিয়ে মা’র একগোছা চুল সমেত চামড়া উঠে এল সিস্টারদের হাতে।

              মজার ব্যাপার হল, মা’র এখন চোখ প্রায় বোজা। চোখের পাতার ওপর জমাট বাঁধা রক্ত বিন্দু। বড় বড় তিলের মতো। তা মাকে যখনই ডাকছি, সেই চোখের পাতার ওপর দিয়ে মা’র চোখের মণিকে নড়তে দেখছি আমি। কিছু জ্ঞান, তার মানে, মা’র এখনো আছে। আর যখন চোখের পাতা ওপর দিয়ে অক্ষি-বলয় স্থির, মনে করে নিচ্ছি মা ঘুমোচ্ছে, বা, আধা-ঘুমে আছে। এখন একবার যাব, ডেকে দেখব, পাশে থাকব, কথা বলব, যেন মা সুস্থ আছে। এই নাটক আর তো কিছুক্ষণের জন্য মাত্র।

              কিন্তু হ্যাঁ, মা এখনো বেঁচে আছে। কিছু প্রারব্ধ ফলের দাম চুকোচ্ছে। চুকোক, পরজন্ম মসৃণ হবে।

      

তাহলে, সোশ্যালিষ্ট যারা, তারা সবকিছু ঠিক করে, এমনকি, অন্যের হয়ে যে ভেবে দেওয়া, সেটাও পারে অব্যর্থ, অমোঘ! ব্যক্তি মানুষ তার নিজের সম্পর্কেও তত সঠিক ভাবতে পারে না। আর এদিকে ডাক্তার একটা ওষুধ সাজেস্ট করছেন তো আমি আঁতকে উঠছি, তার আশ্বাসেও ঘাড় জ্বালা করা, বমি বমি পাওয়া থামছে না আমার, আর কী আশ্চর্য, তিনিও মেনে নিচ্ছেন, প্রত্যেক ওষুধ এক একজন মানুষের শরীরে এক একরকম ক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়া তৈরী করে। অথচ আর জি কর ভিক্টিমের মা, তাঁর পছন্দানুযায়ী দল বেছে নিলে ভুল, নিমকহারাম, কিন্তু তামান্নার মাকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিলে, সেটা ঠিক? সঙ্গে থাকবে ন্যারেটিভ যে, তামান্নার মৃত্যু তো দূর, তামান্নার জন্মের বহু আগে থেকে তামান্নার পরিবার বামপন্থায় সক্রিয় বিশ্বাস করতেন। কই, তামান্নার মৃত্যুর অবধারিত পর তো সিপিআই(এম) পার্টি একথা প্রেসকে জানায়নি।

তাঁদের ন্যারেটিভ সত্যি হতে পারে, মিথ্যে হতে পারে, কিন্তু এটা সত্যি যে, একটা সমাজবাদী দল দিনের শেষে সবসময়ই অঘোষিত কালেক্টিভ ডিক্টেটর। তারা গণতন্ত্রকে ঘৃণা করে, কারণ তাঁরা কমোনার ইন্টেলেক্টকে সম্মান দেয় না। এ কথা সর্ব অংশে সত্যি যে, গণতন্ত্রকে প্রভাবশালী হতে গেলে সার্বিক শিক্ষা দরকার, অপিচ চেতনা থেকে চৈতন্যের দিকে যাওয়া দরকার। আর একটি সৎ রাজনৈতিক দল তো সবসময়ই সেই দীর্ঘ সময়ব্যাপী কর্মকান্ডের দিকেই যাবে, কখনোই শর্টকাট করে অন্যের ভাবনা, অন্যের ভাল-খারাপ নিজে ভেবে দিতে পারে না!

 

এই লেখা ভাবের দিক থেকে ১৫-ই ডিসেম্বর, ২০২৫ থেকে শুরু হলেও আদতে লেখা মার্চ ২৫, ২০২৬ থেকে। গতকাল দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গে শেষ পর্বের ভোট হয়ে গেছে। কিন্তু শেষ নির্বাচনী প্রচারের দিন, আর জি কর ভিক্টিমের মা’র প্যান্ডেলের সামনে সিপিআই(এম) পার্টির দুটো টো-টো’র মধ্যে বাজতে থাকা গান, কাকিমা... আমি শুনেছি। এর আরবান এফেক্ট সরালে এটা গণতন্ত্রের মুখে মুতে দেওয়ার গান।

 

দেশ, সরি, মা এখন আর্ধেক ভেন্টিলেটরে। বাইপ্যাপকে তেমনই ভাবা হয়। এখান থেকে ফেরে না কেউ একটা বিশেষ, এখন দেখার, কোথাও কোনো ভোজের বাজি চলে কি না।

 

বক্তব্যঃ ছবি আমি দিতেই পারতাম। এমনকি, চাইলে ভিডিও-ও। কিন্তু খুব গ্রাফিক হয়ে যাবে, বিশ্বাস করুন। আমি একটা হিন্ট দিচ্ছি, আপনারা একটু কল্পনা করে নিন আমার মা অত্যন্ত সাদামাটা। ঠিক আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাড়িতে মা যেমন দেখেন একদম তাদের মতো। হুবহু। কী উচ্চতায়, কী ওজনে, কী গায়ের রঙে অর্থাৎ বাইরে থেকে আমার মাকে আলাদা করে চেনার কিছু নেই।

আর ইন্টেসিভ কেয়ার ইউনিটে থাকা পেশেন্ট নিশ্চয়ই আপনারা দেখেছেন। সেই একইরকম প্রায়, তবে এটা কিনা নার্সিংহোম নয়, এটা মায়ের শোওয়ার ঘর। কিছু আসবাব, দম দেওয়া একটা দেওয়াল ঘড়ি, সবুজ রঙের দেওয়াল। আর কি... দেওয়ালের যেদিকে এসি আছে, সেটা ফটোয় আসবে না।

 

 

 

 

অনিন্দ্য ঘোষ      ©  

 

 

ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলিএখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে

 

 

Friday, March 27, 2026

এক-একটা দিন

 

 

এক-একটা দিন এমন এসে দাঁড়ায় মা’র ইঞ্জেকশন ডীপ ফ্রীজে রাখা থাকে, হপ্তার সুঁই ফোঁড়ানেওয়ালা এলে ফ্রীজ খুলি; ফ্রীজারে তপ্ত হাওয়া, ডীপ ফ্রীজারে উষ্ণ বরফ; স্নানে যাই, শাওয়ার খুলে ছিটকে উঠি, কেউ কি আমায় শাস্তি দিচ্ছে! স্নিগ্ধ হতে চেয়ে এবং না পেরে হতাশ আমি, বডিস্প্ল্যাশের বোতলের দিকে তাকাই, সেটা থমথম করছে, তার মুখ খুললে গরম তরল, বডি অয়েলে হাত দিয়েই চমকে উঠি, এই অসময়ে তেল এত তেতে উঠেছে কেন! স্নান হলো না যেমনটা কিনা চেয়েছিলাম, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি চানঘরের দরোজা বন্ধ করি; লকের কাছে হাত লেগে যায় আলটপকা; আঙুলের ডগা থেকে খানিক চামড়া উপড়ে গেলে লক, দরোজার গা বেয়ে মেঝে অবধি রক্তকে গড়াতে দেখি তন্নিষ্ঠ, তারপর আঙুলটাকে চেঁছে, অপ্তঃপর একটা টোকা ওই মহাসিন্ধুর ওপারের দিকে, রক্তের শেষ ফোঁটা সমেত দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলে আর একবার সেদিকে তাকালে ‘পর, আমি, ধোঁয়া উড়তে দেখি।

 

যখন তোমার সেই সব কিছু, যাকে তুমি তোমার নিজস্ব হিসেবে ভাবো, তার যে কটাকে তুমি সামনে পেলে, তার সব কটাতেই আঁচ উঠেছে দেখলে, তোমার একটাই কাজ, মগজটাকে ঠান্ডা রাখা। মগজ রাগে, লোভে, হিংসায়, কামে... এসবকিছুতেই গোটা শরীরই কথা বলে থাকে, কিন্তু বলায় মগজ। নচেৎ, মগজে কিছু রাখার জন্য মগজ, মগজে যেটা ছিল, সেটা ভুলে যাওয়ার হাহাকারে মগজ, বিস্মরণের অতল থেকে ঘাই মেরে মগজে এসে চলকে পড়ার আহ্লাদে মগজ। বরের বরাঙ্গ ছোট হওয়ার জন্য বরের হীনমন্যতার জন্য মগজ; কিংবা বরের জেগে ওঠা বরাঙ্গের ফেঁড়ে ঢুকে আসার ভয়ে স্ত্রী-অঙ্গ সিঁটিয়ে যাওয়ার জন্যও মগজ; অথচ পাশের দম্পতি বিছানার তুলো ওড়ালে তুমুল, যৌথ গ্র্যাটিফিকেশনের সবটুকুর হকদার ওই মগজ। তবু মগজের বিশ্রাম মেলে, মানুষ তাকে পরম ধন জ্ঞানে, সম্ভ্রমে বা বিভ্রমে বিশ্রাম দিতে চায়; অথচ জন্মের পরপরই সাফ সুতরো হয়ে এলে পাছায় আলতো চাপড়ে কেঁদে উঠলে যে পাম্প মেশিনের চলা নিয়মিত হলো; তার কী রাগের কোনও অধিকার নেই! তার লহমাকয়েকের জিরেনে মানুষের চোখে তুলসী পাতা পড়ে, কপালে চন্দন চর্চ্চন, ইলেক্ট্রিক চুল্লী আড়মোড়া ভাঙে। সেই পাম্প মেশিন যেন অপ্রেসড ক্লাস, আর মগজ ইজ আ ক্লাস অ্যাক্ট, সেই মতো হয় বিশ্রামের ডিসট্রিবিউশন।

 

নিজেকে আমি হৃৎপিন্ড ভাবি, মাংসপিন্ডেরই মতো, অর্থ-ছাড়া কারণ বলতে কী, আমার একার ঘরে উষ্ণতা আসে, অসময়ের অনাকাঙ্ক্ষিত উষ্ণতা... আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। বেরোতে কে যে বলে দেয়, যেন বেরোলেই শীতলতা পাবো, জানি না। বেরিয়ে দেখি, নীল আকাশ, সাদা মেঘেদের তুলোট ছেয়ে থাকা; মনে পড়ে যায়, রাতে সাইক্লোন হওয়ার কথা বলা আছে, কে মনে করিয়ে দেয় বুঝতে পারি না। শুধু হেঁটে যেতে থাকি। একটা জায়গা এসেই যায়, যেখানে মানুষের অ্যাগ্লোমারেশন বেশি, শহরে এ বিচিত্র কিছু না; আমি মানুষের আঁচ পেতে থাকি। ক্রমে সে আঁচ বাড়ে, বেড়ে সহ্যের সীমা পার হয়ে যায়। থমকে গিয়ে আমি ঠাহর করার চেষ্টা চালাই, কে আমায় বেরোতে বলেছিলো।

 

সভ্যতায় থাকবে তুমি, অথচ সভ্যতার দাহ নেবে না, এহেন অন্যায় আবদার তুমি যদি করে যেতেই থাকো, অবধারিত সেক্লুসন তোমায় অন্যত্র নিয়ে যাবে। সেখানে পরপর বিছানা পাতা, বিছানার পিছনে শিয়রের টেবলে অনেকানেক ওষুধের স্ট্রীপ; আর বাইরে চারিদিকে সবুজ, বিচ্ছিন্নতার সবুজ। এখানে সভ্যতা প্রকট হয়তঃ বা নয়, যতটা কিনা মানুষের অসংলগ্ন শব্দ-স্রোত। সে পুরানো আমলের বাড়ীর পিছ দুয়ার বড়ো, যাতে মাঝারি গতরের গাড়ী ঢুকে আসতে পারে; নিয়ে যেতে পারে, তোমাকে নিথর, সাদা মার্কিনে মুড়ে আর উচ্ছিষ্টের ফুলে সাজিয়ে।

 

অর্থাৎ তুমি এমন এক ফটো ফ্রেমের মধ্যে ঢুকে বসে আছ, যেখানে আমার, হ্যাঁ, আমার, এগোলে জান, পিছোলে গর্দান। তবু তুমি কিংবা আমি, আমি কিংবা তুমি, কি আশ্চর্য রোজ রোজ একই জায়গায় বেঁচে যাই; ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবি কাল কী কী করার আছে; পরের দিন সকালে উঠি, প্রিয়জনের হাত থেকে নিই চায়ের পেয়ালা, ছকে রাখা কাজগুলো ফিকে হতে হতে মরে গেছে; অন্য কাজ করতে গিয়ে টের পাই, আমাকে মাঝে রেখে একটা গোলাকার বৃত্ত, তুমিও তেমন হদিশ পাও নির্ঘাত, আর সে বৃত্তগুলো গরম হতে শুরু করেছে।

 

এমন নয় যে, চড়া নিরক্ষীয় গরমের কথা বলছি, তবুও এই বিপ্রতীপ উষ্ণতা তোমাকে ভাবায়, এবং আমাকেও। আমরা কেউই আজ বাইরে যাবো না, আমাদের অভিজ্ঞতা বারণ করে, গলে গলে পড়া মোমের মতো এক নরম কিন্তু গরম, আঁশটে পাঁকের মধ্যে নিজেদেরকে গলা অবধি চুবিয়ে রেখে আমরা প্রতিকূলের তাপ সহ্য করে যেতে থাকি।

 

আমরা থমকে গেলে হয় না? সেইরকম থমকে যাওয়া, যার পরে আবার চলতে শুরু করা যায় না। দেখিই না, যে আমাদের ভাবায়, যে কাঁদায়, আর যে হাসায়, অথবা ভয় দেখিয়ে চকমিলানে থাকে, আমরা থমকে থেমে গেলে সে কেমন থাকে?

উত্তর খুঁজতে গেলে ওই যে শ্মশানঘাট, কিংবা, কবরডাঙা। 

কিন্তু ভেবো একবার, কেমন?

 

 

 

অনিন্দ্য ঘোষ      © 

 

 

  

 

 

 

 

 

 

ফটো কার্টসিঃ  গুগল ইমেজেস 

 

ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলিএখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে