Monday, March 23, 2026

গত পরশু — গতকাল — আজ

 

 

কাটঃ ১ মাথার ওপর প্রখর রুদ্র

 

- ও আচ্ছা। রিক্যুইজিশনটা দিন তাহলে।

- এই যে।

- হুম। ঠিক আছে, সাড়ে ছটা নাগাদ আসুন।

- অ্যাঁ?

- সাড়ে ছটা। তার আগে হবে না।

- কিন্তু ততক্ষণে তো পেশেন্ট কোলাপ্স করে যাবে!

- কিছু করার নেই। খারাপ কিছু হয়ে গেলে তো তখন আপনারা আবার

- কিন্তু রুটিন অ্যাসার্টেন করতে আর কয়েকটা টেস্ট করতে এতক্ষণ লাগবে! এখন তো সবে একটা বাজে। তাও বাজে নি। এই দেখুন।

- দেখার কিছু নেই। নেগেটিভ গ্রুপের ব্লাড... সময় লাগবে।

- বাট মাই পেশেন্ট ইজ সিংকিং দেয়ার অন আ সার্টেন বেড অন আ নার্সিংহোম। প্লীজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড...

- দুশো আট। নার্সিংহোমের নামটাও জানি। রিক্যুইজিশনের ডগাতেই আছে, বুঝলেন। আচ্ছা, আপনি একটা কাজ করুন রিক্যুইজিশনের উল্টো দিকে ফোন নম্বরটা রেখে যান। হয়ে গেলে জানাবো।

- ইয়ে... আপনার কন্ট্যাক্ট নম্বরটা পেতে পারি?

- লাগবে না।

- আপনার নামটা

- লাগবে না। হয়ে গেলে ডেকে নেবো।

 

কাটঃ ২ সাড়ে পাঁচটা

 

- আরে, এসে গেছেন। আপনাদের ফোন করতাম। এই কেসটা ছেড়ে দিয়েই ফোন করতাম। এখনই।

- সান অফ আ বিচ (স্বগোতক্তি)। থ্যাংকস, ইউ ডান?

- দাঁড়ান। নিয়ে আসছি।

- আপনার পেশেন্টের বয়স কত?

- আমার বউ। সারা কলকাতা চষে ফেলেছি গতকাল থেকে। ডাক্তার বলেছে, অন্ততঃ দু বোতল রক্ত না পেলে বাচ্চা, মা — সব একসঙ্গে মরবে।

- সে কি! কী বলছেন, কী!

- হ্যাঁ, এই এখন এক বোতল মিললো।

- প্রিমিগ্রাভিদা?

- অ্যাঁ?

- না, মানে, আগে থেকে কিছু বোঝেন নি, কোনও দিন?

- নাহ, কী করে বুঝবো, বলুন। এই তো প্রথম বাচ্চা এলো বউয়ের পেটে।

- ওহ, তা রক্ত পেলে মা আর বাচ্চা দুজনেই বাঁচবে তো?

- না, না, তা কী করে হবে। বাচ্চা তো মরেই গেছে।

- মানে?!

- মায়ের পেটে মরে আছে। এখন অপারেশনও করা যাচ্ছে না এই রক্তের জন্য।

- কতদিনের প্রেগন্যান্সি? (আমার ছায়া)

- সাত মাস। উঃ এই এক বোতল রক্তের জন্য কতদূর থেকে আসছি!

- কোথায় অ্যাডমিট আছেন আপনার স্ত্রী? (আমার ছায়া)

- সাগর দত্ততে।

- যান, নিয়ে যান ভাই। আপনি শিগগির যান। আর হেলো, আপনার হয়েছে?

- হ্যাঁ।

- ইজ দেয়ার এনি ফর্ম্যালিটি লেফট?

- না, না। এখানে জাষ্ট একটা সই। এই যে পেন।

- লাগবে না। আই হ্যাভ ওয়ান।

- একশো ন’খানা বুঝলেন...

- একশো ন’খানা কী? (আমার ছায়া)

- একশো ন’খানা সরকারী ব্লাডব্যাঙ্ক আছে ওয়েস্ট বেঙ্গলে, বুঝলেন।

- বুঝলাম। (আমার ছায়া)

- একশো ন’খানার মধ্যে প্রত্যেকটায়... এই তো আজ এখন পর্যন্ত এই নিয়ে পাঁচটা রিক্যুইজিশন করলাম।

- আপনি রিক্যুইজিশন করলেন?

- না, মানে রিক্যুইজিশনের ব্লাড ছাড়লাম।

- তো?

- এই আপনাদের নিয়ে পাঁচখানা। সবকটা নেগেটিভ ছাড়লাম। এই তো আপনারা দেখলেন, আগেরটাই বি নেগেটিভ ছিল

- এ নেগেটিভ ছিল আগেরটা। বি নয়।

- ওই হলো। অন্য যে কোনও ব্লাডব্যাঙ্কে যান

- আপনি আমাদেরটা সব মিলিয়ে দেখে দিয়েছেন তো?

- বিলকুল। যেটা বলছিলাম যে কোনও ব্লাডব্যাঙ্কে যান মিনিমাম পাঁচ হাজার টাকা।

- পার পাউচ?

- পার পাউচ।

- বাহ্‌, আপনাদের এটা, মানে, এই ব্লাড-ব্যাঙ্কটা তো বেশ অনেস্ট! (আমার ছায়া)

- অনেস্ট ছিল না। করতে হয়েছে। এখানেও আগে অনেক কিছু হতো।

- আপনি অনেস্ট বানালেন বুঝি? (আমার ছায়া)

- আলবাত। বত্রিশ বছর কি আর এমনি এমনি কাটালাম। চুল সব পেকেই গেলো।

- আর্‌রে, কর্মফল বলে তো একটা কথা আছে। অনেক পুণ্য ক্রেডিটেড হচ্ছে আপনার অ্যাকাউন্টে। (আমার ছায়া)

- সততাই হলো আসলি কথা। বাকী সব নকল। ঝুট। অন্তঃসারশূন্য। বুইলেন কিনা?

- আপনি পাঁচ হাজার পার পাউচ বলছেন? এ নেগেটিভ ব্লাডের এক-একটা তো বাইরে পনেরো, কুড়ি, এমনকি পঁচিশেও ব্ল্যাক হচ্ছে।

- অ্যাঁ, পঁচিশ হাজার! কোথায়, কোথায়?

- আমি তো গতকাল ব্লাড খুঁজতে গিয়ে দেখলাম।

- কোথায় দেখলেন বলুন তো?

- শুধু একটা জায়গাকে অনেস্ট বানালে হবে? ওসব বুঝতে গেলে এই গ্রীলের ক্লোজড গেটের বাইরে আসতে হবে আপনাকে। কাম আউট ফ্রম দ্য কেজ, ম্যান। (আমার ছায়া)

- কিন্তু কোথায় যাবো? এত টাকা কে চাইছে? কে দিচ্ছে?

- আপনার প্রশ্নটা, মাইরি, বলছি, বিশ্বাস করুন, এত ককেটিশ না! আপনার প্রশ্নটা কিন্তু একটাই, আর সেটা হলো, কে দিচ্ছে। কে চাইছে-টা নয়। তা এক কাজ করুন। ব্লাডের দুটো পাউচ নিন, আর একটা মাইক।

- তারপর? করবোটা কী তারপর?

- তারপর মাই অ্যাস। পাউচ দোলাতে দোলাতে মাইকটা ফুঁকে দিন। চার মাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে।

- তাতে লাভ?

- আপনাকে আর খুঁজতে যেতে হবে না কষ্ট করে, টাকাই আপনাকে খুঁজে নেবে। আপনি ওই জাষ্ট গ্রীলের গেটের বাইরে আসুন। (আমার ছায়া)

 

বস্তুতঃ আলো কোথাও নেই সব আলেয়া। ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট, নিও-নেটাল মর্টালিটি রেট, আন্ডার ফাইভ মর্টালিটি রেট, মেটারনাল মর্টালিটি রেট, ন্যাশানাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে, হাউজহোল্ড কনসাম্পশন এক্সপেন্ডিচার সার্ভে, সেনসাস, ন্যাশানাল হেলথ পলিসি, ন্যাশানাল চাইল্ড পলিসি ১৯৭৪ কোয়া ২০১৩, এম ডি জি গোল, এস ডি জি গোল, জি ডি পি মার্কেট ইকোনমির জার্গনগুলো এক একটা কমোডিটি হয়ে সব কে সব শালা মানুষকে, কমিনিউনিটিকে, দেশকে না ঠাপিয়ে, তার গাঁড়ে-গুদে ঠেসে দেওয়ার জিনিস।

মাত্র কুড়ি হাজার ডলারের ড্রোন কিনা নয় বিলিয়ন ডলারের রাডারকে গুঁড়িয়ে দিলো, আর সেটা নিয়ে কী হইচই পৃথিবী জুড়ে! কুড়ি হাজার ডলার সেটার আগে একটা ‘মাত্র বসিয়ে দেওয়া হলো। আর একটা মানুষের মাসিক খোরাকি খরচ? এই প্রশ্নটা, এই মা কিংবা বাচ্চা গাছ থাকলে ফসল আবার ধরবে, গাছ থাক, এই ফসল যাক... কিংবা দুটোই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমা থেকে ঈস্টম্যান কালার হয়ে, বাঁড়া, সিনেমার অ্যাস্পেক্ট রেশিও ১.৩৩:১ থেকে ২.৩৯:১ হয়ে গেলো, আমরা এখন রেক ২০২০ -এর কলোরিমেট্রি দিয়ে গাঁড়পিয়াজী করছি... প্রশ্নটা সেই যখন মরা ছাগলের চোখের মতো একটা চল্লিশ ওয়াটের বাল্‌ব জ্বলতো, সেই তখন থেকে এই ২০২৬ শে এসেও, এই এত্তো সোডিয়াম ভেপার, নিওনের আলোতে বানভাসি দেশের মধ্যে ঢুকে কবাডি খেলার মতো করে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে, আর মানুষ কোর্টের বাইরে চলে যাচ্ছে। চলে যাচ্ছে তার গোটা আয়ুর মতো, আর আমরা নিয়তি মারিয়ে যুদ্ধের আলোচনা করছি, ভোটার লিস্টে নাম উঠেছে কিনা, সেই নিয়ে হল্লা করছি! আর এদিকে খিদেতে, স্রেফ খিদেতে কতো মানুষ হাল্লাক হয়ে গেলো।

শুধুমাত্র পুষ্টির ঘাটতিতে কতো অ্যানিমিয়া, কতো মৃত্যু অগণন ভাবতে বসলে একা চিতাকাঠ হাসে, আর হাসে মাটি। বারুদের, গন্ধকের, কেমিক্যাল এক্সপ্লোসিভের অনবরত মিশেলে যে মাটি আর ইল্ড করে না, যে মাটি ফসল দিয়ে নিজেকে খোলে না আর, বদলে, নিজের বুকে শাটার টেনে দেয়, মৃত মানুষের দেহ সঙ্গে নিয়ে!

 

কাটঃ থ্রি আকাশের অস্তরাগে

 

আমিঃ ‘বুঝলি, এই যে এই ব্লাডব্যাঙ্ক... এটাও না একটা বোধিপীঠ।

আমার ছায়াঃ ‘সে আর বলতে জাতের বালাই নেই কো আমার, মানুষ সবাই, বামুন-চামার।'

আমিঃ ‘কংগো। ভাব একবার একটা বিজেপি’র বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ নেতা, জীবনে মাংস তো দূর

আমার ছায়াঃ ‘পিঁয়াজ-রসুন পর্যন্ত গুণে খেয়েছেন। শুধু ফলার আর দুধ।

আমিঃ ‘দুধটাও কিন্তু কেড়ে নেওয়া। ওটা বাছুরের বা আদার কাভসের জন্য তাদের মায়েদের বাঁটে আসে। আমরা স্ন্যাচ করে নিই। তুই গরুর দুধ দোওয়া দেখেছিস কোনও দিন?’

আমার ছায়াঃ ‘ওই, একটু দূরে মা-গরুর নজরের সামনে বাছুরকে বেঁধে রেখে তো?’

আমিঃ ‘খেয়াল করলে দেখতে পেতিস, তারপরও মা গরুটা কিছুটা দুধ লুকিয়ে রাখতে পারে, আর বাছুরটা তাতে করেই বড়ো হয়ে যায়।

আমার ছায়াঃ ‘তা আর বলতে, ওই নেচে-কুঁদে কেস। এই আমরা যেমন ধর্ম নিয়েও লাফাচ্ছি, আবার, রক্ত নিয়েও লাফাচ্ছি।

আমিঃ ‘ধর্ম নিয়ে লাফালেই তো রক্ত নিয়ে লাফানো হয়ে যায়।

আমার ছায়াঃ ‘আহা, নট অন দ্যাট ওয়্যে, আমরা ধর্মের নামে লাফালাফি করতে গিয়ে অন্যকে খুঁচিয়ে, খুজলিয়ে, খচিয়ে ঘা করে দিই ঠিকই, রক্তও তাতে বেধড়ক বেরোয়, কিন্তু, যেই না নিজের রক্ত ধরে টান পড়লো

আমিঃ ‘কে শালা নেড়ে, কোন্‌ বানচোত ম্লেচ্ছ সবের শিঙে ফুঁকে গেলো।'

আমার ছায়াঃ ‘হেঃ হেঃ। রেয়ার গ্রুপের রক্ত আমার, ভাই। শর্ট পড়েছে, বাঁচা। তো, রক্ত এলো। দেওয়ার আগে, আরে আরে, এটা তো মোল্লার রক্ত।

আমার ছায়াঃ ‘বাস, রাম গেলো পুটকি শুঁকতে। রামের মায়ের।

আমিঃ ‘হ্যা, হ্যা, যা বলেছিস। আপনি বাঁচলে রামের নাম। নশ্বর বাঁচবে, তবে না মন্দিরে কাঁসর-ঘন্টা বাঁচবে।

আমার ছায়াঃ ‘তবে উল্টোটাও সত্যি। কাফের, মালাউন, ব্লু-ব্লাড। নিজের রক্তে টান পড়লে

আমিঃ ‘এক্স্যাক্টলি, রক্ত হলো গিয়ে তোর স্কেলার টার্ম। এর মধ্যে ভেক্টর ক্যাপ পুরে দিতে চাওয়ার চেষ্টাটাই রিডিক্যিউলাস। অ্যান্ড এভরিবডি নোজ ইট অ্যাজ আদার এলস’স লাই। ফর হিম, ইট বিকামস আ ট্রুথ আনটিল

আমার ছায়াঃ ‘দাঁড়া, পাউচের জন্য আইসক্রিম কিনি। ভাই, চারটে অরেঞ্জ বার দেবেন তো।

আমিঃ ‘সেই কবে থেকে সোডিয়ামের পোঙায় লাথি মেরে যাচ্ছি। শুয়োরের বাচ্চা ১৪০ এ উঠে হাঁপাচ্ছে। এত স্টেরয়েডের মধ্যে কী করে বুঝবো, একটা গোটা শরীরের রক্ত টক্সিক হয়ে যাচ্ছে, আর সেই সেপসিসের জন্য এই ঝুড়ি ঝুড়ি ডিলিরিয়াম। অথচ দেখ, গতমাসের সি আর পি রিপোর্টেও কিস্যু মেলে নি। আর আজকের ড্যেল্যিরিয়ামে কিনা আমার দুই ছেলে, এক মেয়ে!’

আমার ছায়াঃ ‘বলেছে ওই কথা?’

আমিঃ ‘আরে, আমার সামনে বললো। যখন রিক্যুইজিশন আনতে ওয়ার্ডে গিয়েছিলাম। কিন্তু কথা এটা নয়

আমার ছায়াঃ ‘তাহলে?’

আমিঃ ‘একটা মেয়ের ব্যাপারটা নাহয় বোঝা গেলো না। ড্যেল্যিরিয়ামের খরচায় আঁচিয়ে নিলাম। কিন্তু ওই গার্লি স্টাফটা বাদ দিলে ভুল খুব কিছু বলে নি। অ্যাকিউট নিউট্রিশন ডেফিসিয়েন্সি আর অ্যানিমিয়া না থাকলে তো আমার এক দাদা থাকার কথা। এক কেজি চারশোর বাচ্চা জন্মেই মরে গেছে, সে আলাদা কথা। কিন্তু হোলিস্টিক্যালি ভাবলে ভুল কই! বাচ্চা যে বিয়্যার করবে, নিজের এবং বাচ্চার নিউট্রিশনের দায়টাও সে একাই বয়ে বেড়াবে? সেটা তার একার দায়!’

আমার ছায়াঃ ‘কিংবা হয়তো এটা অন্য জন্মের স্ক্রিপ্ট। স্বাভাবিক মগজে এটা থাকার কথাও নয়। এই টারব্যুলেন্ট টাইমে, এই থটলেস ব্রেইনে কোন্‌ জন্মের ডায়লগ এই জন্মে এসে ঘাই মেরে রিসাইটেড হয়ে গেলো আজ কে জানে!’

আমিঃ ‘সেটাও সম্ভব। মানুষের জীবনে একটা সার্টেন জায়গার পর থেকে সম্ভব-অসম্ভব, সত্যি-মিথ্যে, ধর্ম-অধর্ম সব মিলেমিশে আছে। তফাত করা যায় না তাদের। কিন্তু রক্ত

আমার ছায়াঃ ‘একক।

আমিঃ ‘ঠিক তাই। মানুষ শালা কতো উন্নত হলো, কতো কিছু বানালো — মায় একটা কৃত্রিম মেধা বানিয়ে ফেললো। কিন্তু আদি মেধাচোদাগুলো একটা পাউচও আর্টিফিশিয়াল ব্লাড তৈরী করতে পারলো কি?!’

আমার ছায়াঃ ‘পারবেও না কস্মিনকালে। আর এটাই ঈশ্বরের রেল্ম থেকে আসছে। পিওর সম্প্রদান। যার বিনিময়ে কিছু চাওয়া হয় নি। কোনও ট্রেড হয় নি।

আমিঃ ‘সেই কারণেই এটা সাক্রেড। আর তাই এটা মালাউনকে নেড়ে দেবে না, এটা ম্লেচ্ছকে মুচি দেবে না হয় না। এটা চলে না। রক্তের রেল্মে, হিউম্যান রেসের ক্ষেত্রে, রিজিওনাল ট্রেইট মেইনটেইন করে এটাকে দেওয়ার অধিকার মানুষের। শুধু মাত্র মানুষের।

আমার ছায়াঃ ‘আর মানুষেরই অধিকার, প্রয়োজনভেদে, নেওয়ারও।

 

অনিন্দ্য ঘোষ   ©

 

ক্রোনোলজি

 

১। অ্যাডমিশন গত পরশু সকালে।

 

২। কন্ডিশন সেপসিস (শেখা গেলো, টক্সিমিয়ার পরের ধাপ)।

 

৩। ইন্ডিকেটর হিমোগ্লোবিন — ৬.১

 

৪। দুই ইউনিট এ নেগেটিভ রক্ত। তখনই।

 

৫। চেয়েও মিললো না রিক্যুইজিশন।

 

৬। রাতে রিক্যুইজিশনের সফট কপি (ফটো) প্রার্থনা করা হলো কারণ রক্তের অন্বেষণ। বিফল। নার্সিংহোমে নাকি একটাও স্মার্টফোন নেই। পরদিন সকালেই রিক্যুইজিশনের হার্ড কপি আর স্যাম্পল কালেক্ট করতে হবে। মেডিকো-লিগ্যাল রীতি।

 

৭। রিক্যুইজিশনের হার্ড কপি আর স্যাম্পল কালেক্ট করা হলো। এক ইউনিট ব্লাড পাওয়াও গেলো। সন্ধ্যাবেলায় চালানো হলো সেই ব্লাড। কতো স্পীডে যাবে জিজ্ঞাসা করাতে প্রতুত্তরে বিস্ময় এলো, রক্ত, রক্তের মতো যাবে। তার আবার স্পীড কীসের? এখানে কি অ্যাক্সিলেটার আছে? না, ক্লাচ-গিয়ার আছে?

 

৮। গত পরশু সন্ধ্যায় যে ব্লাড চললো, তার জন্য যে একটা সি বি সি করার দরকার আজ বিকেল পৌনে চারটে অবধি কারোর মগজে আসে নি।

 

৯।  আজ বিকেল চারটের সময় ডাক্তারের ঝাড় কেন দু ইউনিট ব্লাড জোগাড় করা যায় নি, যখন নার্সিংহোম রিক্যুইজিশনের সফট কপি পাঠিয়ে দিয়েছিলো!

 

১০। আজ সন্ধ্যায় আর একটা ইউনিট ব্লাড গেলো।

 

১১। অনুরোধ করে রাখা গিয়েছিলো গতকালের হিমোগ্লোবিন জেনে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আজকে যে রক্ত গেলো, সেই ফরেন বডি অ্যাডমিনিস্টারড হওয়ার জন্য পেশেন্ট টসকিয়ে গেলো, নাকি, তার নাড়ি টিমটিম করছে। সাড়ে দশটায় প্রথম ফোন জানা গেলো, অন্য এক ডাক্তার পেশেন্ট ভিজিট করছেন, এখন বলা যাবে না। আধঘন্টা পর যেন আবার ফোন লাগানো হয়, যেন মন্ত্র জপা হয়, সেই মোতাবেক করাও হলো, কিন্তু ফোনটা তোলার ইচ্ছেই দেখালো না একটা ওয়ার্ডের ১০+ নার্সদের মধ্যে একজনও। আজ বুঝতে পারলাম, কেন মেডিকেল সার্ভিস প্রোভাইডিং ইন্সটিটিউশনে এত ভাঙচুর হয়! বেচারি ডাক্তারগুলো কেন ক্যালানি খেয়ে মরে পেশেন্ট পার্টির কাছে।

 

মোদ্দা কথাঃ পেশেন্ট পার্টি উজবুক থাকবে। কেন, সে নার্সিংহোমের কথা শুনে রক্তের দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করবে না! হোয়াই দ্য হেল দ্যে আর অ্যারেঞ্জিং থিংস দেমসেলভস!!!

 

নোট ১। যে ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে রোগী, তাঁর কোনও দোষ নেই। তাঁকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

 

নোট ২। গতকাল সেই রক্ত যেটা পেশেন্টের কাছে যাওয়ার কথা, সেটা তার শরীরে যায় নি। হয় সেটা নার্সিংহোম ব্ল্যাকে বেচে দিয়েছে, নয়তো, সুবিধেজনকভাবে দান করেছে। তাই হিমোগ্লোবিন ওঠে নি। তাই প্রথমবার ডাক্তার ভিজিটের বাহানা। পরে, ফোন না তোলা।

 

নোট ৩। যে পেশেন্ট আমার, তাকে সুস্থ করে বাড়ী ফিরিয়ে আনবো এটা বোধহয় স্বাভাবিক ব্যাপার, এক যদি আমি পিশাচ না হই। অলরেডি রক্তাল্পতা বা অ্যালবুমিনের কারণে হাত-পা ফুলে গেছে (নার্সিংহোম ডেভেলপমেন্ট), কিন্তু রোগীকে ভর্তি করার সময়ই আমি একটা বিঘৎ 'ফিরবে না' ধরে নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু দিস বাঞ্চ অফ ফাকিং ইললিটারেটস এই নার্সগুলো এটা বুঝছে না যে, আই হ্যাভ কাউন্টেড দেম এলাইভ, আমার পেশেন্ট মরলেই আমি ধরে নেবো, রক্ত না দেওয়ার জন্য মরেছে। শুধুমাত্র ব্লাড না চালানোর জন্য, যে ব্লাড আমি শহরে চিরুনী চালিয়ে দুই ইউনিট জোগাড় করে টেবলে দিয়ে এসেছি। আর সেটা ধরে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবন্ত, প্রাণবন্ত, রক্তে টইটম্বুর এই অল্পবয়সী নার্সগুলোর শরীর থেকে সবটুকু রক্ত বার করে নিয়ে তাদের চিতাকাঠ বা কবর বা সেমেট্যরির দিশা দেখাতে আমার বোধহয় নেহাত মন্দ লাগবে না।

 

সব সওয়া যায়, স্বজনবিয়োগ অকালে না হলে তো সেটাও নস্যি, কিন্তু মূর্খের ঔদ্ধত্য অসহ।

 

অনিন্দ্য ঘোষ    ©

 

ব্লগ লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/share/p/17FXRMReLS/

 

 

 

 

 

 

 

 

ফটো কার্টসিঃ  এত খুঁজে-ধাঁজে যদি রক্ত এনে দিতে পারি, সেটা সঠিক জায়গায় গেলো কি গেলো না, সেটা পরের কথা, কিন্তু এতটা ফিল্ডিং মারতে পারলাম, আর একখানা ছবি... কী যে বলেন না! তাহলে তো কার্টসির ঘরে আমার নামই যায়।

 

ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলিএখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে

 

No comments: