এক একটা রাত
যাই যেখানেই, সময়ের আরেপারে অনিবার্য শ্রুতি একটিইঃ চল, ফোট বানচোত; অর্থাৎ রকমফেরে ঈষৎ, সেইঃ হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে! জানি না, রবীন্দ্রনাথ মুখের ওপর এভাবে স্ল্যামিং অফ দ্য ডোর ব্যাপারটাকে ঠিক কীভাবে নিতেন। খুব ভেঙে বোধহয় পড়তেন না, নচেৎ, অন্য কোথা শব্দটা দুবার আসবে কেন — নির্ঘাত, ফিজিবল এবং প্রব্যাবল সব জায়গা দেখতে চাইতেন যে, ঠিক কোন্টা প্যালপেবল হয়। অনেক আকাশ ডাকত বলেই না তাঁর বলাকার উড়ে উড়ে যাওয়া।
রবীন্দ্রনাথের চলে যাওয়ার পর থেকে এই আজ পর্যন্ত গঙ্গা দিয়ে এত জল বহে গেলো, যে, গঙ্গা শেষমেশ, তার নাব্যতাই হারিয়ে ফেলল। ওগো মা গঙ্গা গানটায়, দিনু ভাসায়ে মোর সজনী, তুমি দেখো তারে — কলিখানি কেউ গাইবে আর? নৌকো উল্টোলে, আর তখন, সজনী একটু দেখে দেখে পা ফেললে হেঁটে হেঁটে গঙ্গা পার হতে পারে। এদিকে ওই মিহি বালি তোলার জন্য কত লোভীর লালা যে লকলক করছে, তার বাঁও মেলা ভার। সে যাক, বলিউডে মন্দাকিনী এলো, তারপর দাউদের বউ হয়ে ভ্যানিশও হয়ে গেলো; কিন্তু হে রাম, গঙ্গা যে মইলি, সেই মইলিই থেকে গেলো! অমোঘ সুযোগ ছিল মন্দাকিনীর কাছে, কিন্তু হক কথা, পাকিরা গঙ্গা মানবে কেন।
যাউক গা, গঙ্গা অনেক বড় ব্যাপার, বালি মাফিয়া আরও বড়; আমি বরং নিজের কথা লিখি। আমিও আমার মতো চলি, স্থাণু জীবন আমাকে চেয়ারে সেঁটে দেয় নি যে, দেওয়ালের ওপর সূর্যের আলো দেখে সময় বুঝতে হবে, আর আকূল মিনতি সত্ত্বেও কোনও এক রুবি, মুখের ওপর ঠাস করে দরোজা বন্ধ করে দিয়ে চলে যাবে অনেক দূরে, শহরে, ভালোবাসা নিয়ে। এমনটা এখনও পর্যন্ত হয় নি; জানি না, সামনে কী আছে। তবে এখনও যাতায়াত হয়। আর হলেই সেই ইনেভিটেবল শব্দবন্ধ।
কিন্তু আমিও তো রবীন্দ্রনাথের ফেলে যাওয়া জল-হাওয়ায় বাঁচি; মচকালেও বা, ভাঙব কেন! তবে রবীন্দ্রনাথ হলেন গিয়ে ফাদার ফিগার, সামথিং স্পেশ্যাল, সামথিং সাক্রেড; - তাঁর সম্ভাব্য অর্ডিনেট আর আমার লোকি — ওই দেখুন, নিজের কথা লিখিই নি, তবুও এখনই কুট্টির ঘোড়ায় হাসতে লেগেছে। আমার যাওয়ার জায়গা কম, আমার ফেরার জায়গা আরও কম। তবু এতদিন কি নিবিড় ভরসায় ছিলাম, মিথ্যে কথা কেন লিখব, এখনও আছি যে একটা ঘর আছে। ঘর কেন, একটা গোটা বাড়ীই আছে।
একটু আগে ঘুম আসছিল না; তন্দ্রাহারা রাত জাগে, কিন্তু তন্দ্রাহারা রাতে জাগলে কন্ডিশন কারমাইকেল হয়ে যায়। বই পড়তে ইচ্ছে করছিল না, সিনেমা দেখতে মন চাইছিল না, এদিকে, কিচ্ছু ভাবছি না বলে বসে থাকাও যায় না। ভাবলাম গান শুনি। কেমন গান? প্রথমেই পিঙ্ক ফ্লয়েডে অন্দর থেকে হুড়কো তোলার আওয়াজ এলো, অতঃপর নামতে নামতে পল সাইমন, এমনকি, বব ডিলানেও দেখি মন সায় দেয় না। নোবেলের এত বড় অপমান সওয়া যায় না, গজগজ করতে আশির দশকের রাহুল দেব বর্মনের কম্পোজিশন খুললাম। ভিতর থেকে আওয়াজ এলোঃ এ কে রে?, বাংলায় ফিরে এসো বাওয়া হলো, মানে, হতেই হলো আর কি, রাত জেগে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ফোক শুনছে কিংবা মাওরি ভক্তিগীতি, এমন বাঙালীকে আমি চিনি না; কিন্তু ভিতর মুখে চেয়ে হাঁক পাড়লামঃ তাহলে কী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়? অন্তরের অরব মাথানাড়া, স্বাভাবিক, সব গানই ঠোঁটস্থ প্রায়। তা পরিচিত কেউই ঠাঁই পেল না; সবার প্রতিই দেখি, আমিই আওড়াচ্ছিঃ হেথা নয়...
আচমকা পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গলায় পন্ডিত জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের লেখা এবং সুর করা একটা গান ইউ টিউব আমায় রেফার করল। কেউ আর রা কাড়ছে না দেখে, সেটাকেই চালিয়ে দিলুম। কাম অন, মেক সাম নয়েজ।
কিন্তু এটা আমি কী শুনলাম। গানের সুর, পরিবেশনা, যন্ত্রণানুসঙ্গ — এসব প্যাঁচালের মধ্যে আমি ঢুকি না সচরাচর; জিলিপি ঝুড়িতে দেখতে বেশি ভালো লাগে আমার। আমি গানটির কথাখানি আপনাদের কাছে পেশ করলামঃ
নিশীথ শয়নে জাগে আঁখি উদাসী
স্মৃতির অতল তলে
এ কী আলোড়ন চলে
অগণন ঢেউ ভাঙে
হৃদিতটে আসি
নিশীথ শয়নে জাগে আঁখি উদাসী
জীবনের এত সুখ
এত প্রিয় পরিজন
এত প্রেম, এত গান
তবু কেঁদে ওঠে মন
ওরে, তুই নিজ ঘরে
চির পরবাসী
নিশীথ শয়নে জাগে আঁখি উদাসী
খুব সম্ভব ১৯৮৪ বা ৮৫ তে গানখানি রেকর্ডে আসে, কিন্তু তার অনেক আগে আমার দিদি (দিদিমা)- কে এ গান গাইতে শুনেছি আমি। কী শুনেছিলাম কথা সেটা নয়, লিখিত বা প্রথম পরিবেশিত যবেই হোক, ১৯৮৫ সাল থেকে বাংলার মানুষ শুনে আসছে, ওরে, তুই নিজ ঘরে
চির পরবাসী! কে বলছে একথা? যে জেগে আছে। কাকে বলছে? যে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমিয়ে আছে বলতে, জাগরণের ঘুমে ঘুমিয়ে আছে যে বিনিদ্র অথবা বিনিদ্র নয়, সেই তাকে।
প্রশ্ন উঠে যায়ঃ তাহলে কি আছে আমার? কোথায় যাব আমি?
...ঘুম আসে না। ফলতঃ কিংবা বাধ্যতঃ আমি সেই গানটা শুনি, কাঁটা বেছে খাওয়া উট হই সামান্য, শুনতে পাইঃ আমি কেমনে কাটাই এ রাত জানি না, কত কথা ভীড় করে আসে মনে, কত ছবি নিদ-হারা দু নয়নে, স্মৃতির বুকে কেন কাটে সাঁতার, এ আঁধারে বল না ।
ঘুম আসে না।
লেখাটা আমার, আর তাই -
অনিন্দ্য ঘোষ ©
গানগুলোতে শোনা ছাড়া আমার আর কোনও ভূমিকা নেই।
আজ - ২৮।১১।২০২৫
রাতের কথা
আর রাত্রি ঘুমোলে? — এ’কথার উত্তর হয় না, খোকা ঘুমোয়, পাড়ার পারা জুড়িয়ে গিয়ে পাড়া পটে আঁকা ছবিটি হয়ে যায়, উদাসী আঁখিরও পলক লেগে যায়, নিজ গৃহের পরিচিত পালঙ্কে প্রবাসী সে স্থবির হয়ে যায় — এ’সব যদিও বা হয়, রাত রাতে ঘুমোয় না। রাতের ঘুম দেখাও যায় না; তবে কিনা শরীর আছে যখন, কখনো একটা ঘুমিয়ে নেয় সে, মিয়্যার চোখ মটকানো বললেও হয়তঃ ভুল বলা হয় না।
আমি রাতে জেগে থাকি। কেন থাকি, সেটা বলে বোঝানো আমার পক্ষে সম্ভব না, জেগেই আছি — এমনই দেখতে পাই আমি। রোজ। আর জেগে থাকি বলেই জানি রাত রাতে কেমন ও কতটা সরে। প্রহর ঠিক কাকে বলে আমি জানি না, তবে এটা দেখেছি এক একটা সার্টেন সময়ে প্রতি রাতে চেনা গন্ধ এসে দাঁড়ায় ওতপ্রোত। বন্দোবস্ত এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, এই নতুন শীতের রাতগুলোতে দরোজা, জানালার সব বন্ধ থাকলেও আমি বলতে পারি এই সময় বাহিরে কেমন গন্ধ বহে যাচ্ছে।
আমার অন্দরে যেসব গন্ধ আছে, তাদের সঙ্গে, হাজার চেষ্টা করে আমি দেখেছি — সেসব গন্ধকে মিলিয়ে নিতে পারি নি। আসলে এমনটা হয়, যে জায়গাটা ভীষণ শুকনো, সেখানে আপনি আর্দ্রতার সোঁদা গন্ধকে প্রত্যাশা করলে ভুলই করে যেতে থাকবেন। কেউই এসে আপনাকে শুধরে দেবে না, যতক্ষণ না আপনার ঠাহর যাচ্ছে যে জায়গাটা শুকনো ঠিক আছে, কিন্তু কতটা শুকনো!
না, রক্ত-মাংসের গন্ধের কথা আমি বলি নি। অনুভূতিগুলোর কি কোনও গন্ধ নেই? রাতের গন্ধ আছে, এটা মানতে পারলেন, আর বোবা কান্নারও একটা গন্ধ যে থেকে গেলেও থেকে যেতে পারে, আপনার এইটুকু মেনে নিতে আপনার নাব্যতা কমে গেলো!
গরমের রাতগুলোতে, কিংবা বর্ষায়, যখন আমার ভিতর ঘর আর ঘাসের ওপর রাত মিলে-মিশে যায়, আমি দেখি, রাত্রি আমাকেও পেড়ে ফে'লে, ছেয়ে যায় প্রখর। কে যেন বলেছিল, রাত্রির সঙ্গে বিষের একটা সামঞ্জস্য আছে নিবিড়, কারা যেন গলায় লাল যোগ চিহ্ন টাঙিয়ে নিদান দিয়েছিল, রাতের সঙ্গে মৃত্যুর বা তেমনতর বিপদের একটা যোগাযোগ আছে ঘোরতর — আমি এতগুলো রাতের সঙ্গতে নিজেকে কাটালাম, নিজেকে বড়ো করলাম, নিজেকে সম্মৃদ্ধ করলাম; টেক ইট ফ্রম মী, কোথাও কিচ্ছু নেই। থাকবে কী করে, রাত যে খুবই চলমান। রাতের অন্ধকারকে আমি ছুঁয়ে-ধরে দেখেছি, অনেকটা যেমন হাভাতের ঘরে দামী, গোটা চাল রান্না হলে সে বারেবারে টিপে দেখে সাবধানী; তো দেখেছি এই — রাতের অন্ধকারও একই রকম ঘন, আর ঘন থাকতে থাকতেই সে গলে যায়, যখন ভোর আসে। প্রথম আলো ভালো করে ফোটবার আগেই, ঠিক যেন মোম, রাত গলে গলে এক এক জায়গায় জমাট বেঁধে যায়। হয় না — গাঁ-গঞ্জের ছেলের মেঠো শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার দাগ সহজে নজরে আসে না? এও অনেকটা তেমনই। গ্রীষ্মের তুমুল দিনে, ভিজিবিলিটি যখন অনেক দূর অবধি যায়, কোনও এক দীঘল গাছের নীচে দাঁড়ালে আপনি সেই আঁধার-মোমের সন্ধান পেলেও পেতে পারেন, কিংবা, একটা নিঃসঙ্গ গোলপোস্টের কাছে গিয়ে সন্ধান চান, সে হয়তঃ বলে দেবে।
আসলে হয়েছেটা কী — রাতকে কেউ কোনও দিন ভালোই বাসে নি। কেউ জানলই না, অন্ধকারকে ভালোবাসলে, কতটা আলো নিজের মধ্যে ধরে রাখা যায়, ঠিক যেমন শ্মশানে গেলে বোঝা যায় জীবনের প্রকৃত অর্থ। একটা করে রাত আসে, আর আমি উল্লসিত হই, আমার জন্য কমনীয়, পেলব, স্বাদু সব জিনিস এসে গেছে বলে। আমি সে’ কারণে রাতে রাত খাই; গোটা দিন জুড়ে আমার হাইবারনেশন চলে, কিন্তু প্রয়োজন বালাই হয়ে দাঁড়ালে অগত্যা আমার ব্রুমেশনও হয় — এটুকু ছাড়া কেউ, আমার কাছে, দিন সম্মন্ধে আর কিছু যেন জানতে চাইবেন না; অন্ধ জানে হাতি বলে একটা প্রাণী আছে, বেশ চাকধেড়িয়া গোছের। বাস, এর বেশীতে তার নীরবতা অপার। ‘নীরবতা’ যখন লিখেই ফেললাম, সেকালে, এর পরের লাগসই শব্দ ‘অলমিতি’ ছাড়া আর কিছু, বোধহয় হয় না।
অনিন্দ্য ঘোষ ©
২৯।১১।২০২৫, রাত
ফটো কার্টসিঃ গুগল ইমেজেস ।
ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলি। এখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে।
No comments:
Post a Comment