Tuesday, March 24, 2026

দিনের শেষে ঘুমের দেশে


 

দিনের শেষে ঘুমের দেশে
ঘোমটা পরা ওই ছায়া,
ভুলালো রে ভুলালো মোর প্রাণ…
ও পারেতে সোনার কূলে
আঁধারমূলে কোন্ মায়া,
গেয়ে গেল কাজ ভাঙানো গান
দিনের শেষে।

 

নামিয়ে মুখ চুকিয়ে সুখ
যাবার মুখে যায় যারা,
ফেরার পথে ফিরেও নাহি চায়,
তাদের পানে ভাটার টানে
যাবো ওরে আজ ঘরছাড়া,
সন্ধ্যা আসে দিন যে চলে যায়
ওরে আয়…
আমায় নিয়ে যাবি কে রে
দিন-শেষের শেষ খেয়ায়,
ওরে আয়…
দিনের শেষে।

 

সাঁঝের বেলা ভাটার স্রোতে
ও পার হতে একটানা,
একটি-দুটি যায় যে তরী ভেসে…
কেমন করে চিনবো ওরে
ওদের মাঝে কোন্‌খানা,
আমার ঘাটে ছিলো আমার দেশে
দিনের শেষে।

 

ঘরে যারা যাবার
তারা কখন গেছে ঘরপানে,
পারে যারা যাবার গেছে পারে।
ঘরেও নহে, পারেও নহে
যে জন আছে মাঝখানে,
সন্ধ্যাবেলায় কে ডেকে নেয় তারে।

 

ফুলের বাহার নেইকো যাহার
ফসল যাহার ফললো না,
অশ্রু যাহার ফেলতে হাসি পায়।
দিনের আলো যার ফুরালো
সাঁঝের আলো জ্বলল না,
সেই বসেছে ঘাটের কিনারায়,

ওরে আয়…
আমায় নিয়ে যাবি কে রে
দিন-শেষের শেষ খেয়ায়,
ওরে আয়…
দিনের শেষে।

 

ইদানীং লিঙ্গুইস্টিক অ্যানোটেশন বলে একটা কথা খুব উঠেছে। ব্যাপারটা কঠিন কিছু মোটেও নয় — একটা টেক্সটেরমধ্যে বাক্য ধরে ধরে, বা, বাক্য বড়ো হলে, বাক্যকে ভেঙে ভেঙে নিয়ে তার মধ্যে ভিড় করে থাকা ইমোশনাল বৈশিষ্ট্যগুলোকে শনাক্ত করে দেওয়া। ট্রান্সক্রিপশনেও খুব লাগছে এটা। এখন। সেখানে অবশ্য আরও কিছু টেকনিক্যাল ডিটেইলিং করতে হয়, এই ধরুন, টাইমস্ট্যাম্প, ইন্টেন্ট, জঁর, ল্যাঙ্গুয়েজ ইত্যাদি। এ আই-কে ডেটা ফীড করাতে এগুলো ‘নাকি’ লাগে।


আমি এসবের বিন্দু-বিসর্গ জানতাম না। কিন্তু ঘটনাচক্রে, কিছু ইংরেজী টেক্সটের ওপর করা এই
লিঙ্গুইস্টিক অ্যানোটেশন দেখে আমি বেশ আমোদ অনুভব করি, এবং সেটাকে বাংলা টেক্সটের ওপর ফলাবার চেষ্টা চালাই। প্রথমে গানে করতে চেয়েছিলাম। কারণকী — গানের ক্ষেত্রে একটা টেক্সটের তিনটে ইন্টারপ্রিটেশন আসে, অন্ততঃ দুটো তো সবার-ই ঠাহরযোগ্য, যথাক্রমে, কথা এবং সুর। গান হলে, গিনিপিগ বলতে হাতের পাঁজি মঙ্গলবার যথা, রবীন্দ্রনাথ। সুমন চট্টোপাধ্যায় AKA কবীর সুমন এখনও বেঁচে, উচিত হবে না ভেবে ওদিকে হাত বাড়াই নি। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, মিল্টু ঘোষ, মুকুল দত্ত, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখরা নির্বাচিত পাঠযোগ্য।

সেগুলো কী দাঁড়িয়েছে, সে না হয় পরে শেয়ার করা যাবে ‘খন — উপস্থিত ওপরে চিপকানো গানটির ভার্সগুলোর কিছু চরণ দেখা যাক —

ও পারেতে সোনার কূলে / আঁধারমূলে কোন্ মায়া — প্রথমতঃ মায়াটা এ পারে নেই, সেটা আছে ওপারে। মাঝে একটা বহতা কিছু, একেই কী শান্তি-পারাবার বলে? যাকে তরাতে কর্ণধার লাগে, কিংবা, দেবী তারা এখানেই প্রচন্ডভাবে নশ্বরের কাছে এসে যান... এনিওয়ে, ওই মায়াটা অ্যাপারেন্টলি সোনার কূলে আছে। প্রশ্ন জাগতে পারে, একূলে তাহলে কী আছে? এপার বলতে কী তাহলে নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস ফালানা ফালানা? উত্তর একটু আলাদা — এপার মনোক্রমিক নয়, এপারের রঙ এক-একজনের কাছে এক একরকম। সেটায় পরে আসছি, কিন্তু ওই ওপারের যে সোনার কূল, তার মূলে কিন্তু আঁধার। তাহলে সোনার কূল বলে মনে হচ্ছে যেটা, ঠিক মনে হচ্ছে তো, সেটা? মায়াজালে আবদ্ধ নয় তো, সেটা?

দ্বিতীয়তঃ সে যাই হোক, সে কূল সোনার — এই মনে হওয়াতেই কিন্তু এপারে থেকে ফারদার কাজ করার ইচ্ছেটা মরে গেলো। ওয়েল, এই কাজ করার ইচ্ছে — একে কর্মই বলা যাক, নাকি? সোনার কূলের ধার বরাবর কিছু নৌকো চলে দেখা যায়, যার সব এই কূলে কিন্তু আসে না। প্রসঙ্গতঃ, দেবী তারা একা নেই, তাঁর অজস্র সঙ্গী-সাথীও আছেন, নশ্বরকে এপার থেকে ওপারে পার করিয়ে দেওয়ার জন্য। তাঁদের সংখ্যা, প্রয়োজনের তুলনায় শর্ট পড়লে, মানে, খুব, খুব পাতি ডিমান্ড-সাপ্লাই মেকানিজম টাল খেয়ে গেলে ‘পর, কটাক্ষেতে করে পার ব্যাপারটাই কিন্তু হয়ে যায়, তবে কিনা এপারের জনকে তাঁর অপিক্ষেতে থাকতে হবে, মুক্তি ভিক্ষে চাইতে হবে। সেটা মন্ত্রের মাধ্যমে হতে পারে, তারা-নামে হতে পারে যখন কিনা স্বজনে মিলে এপারের একজনের অন্তর্জলী করাচ্ছে তখন, কিংবা, সুস্থ-সবল বেঁচে থাকাতেও এবং মন্ত্র-টন্ত্র (তন্ত্র?) না জানলেও আন্তরিক কান্নার বিন্দুর বিন্দুর নৈবেদ্যতেও পার করিয়ে দেওয়ার টিকিট কনফার্মড হয়।

 

এবার, এপারের লোককে একটু দেখা যাক। আসলে এপারে একটা নয়, অগণন লোক। অগণন রঙ সুতরাং, কিন্তু সেটা বড়ো কথা নয়। যে এখন জেটিতে, সেই তার রঙ-ই আলোচ্য। এখানেও একটা খটকা আছে — পারঘাটাতে আদার সাইডোদ্যত কি একজন? দেখা যাচ্ছে, একাধিক মানুষ সেই ঘাটে, তাদের মাথা নীচু, তারা পিছু ফিরে, অর্থাৎ, ফেলে আসা পথের দিকে তাকাচ্ছে না। তার কারণ, তারা জানে, তারা গমনোদ্যত, এবং এই প্রস্তুতিপর্ব তাদের মন থেকে ফিরে চাইবার ইচ্ছেটাকে গলা টিপে ধরে মুছে দিয়েছে। একধরনের ঘাড় মুচড়ে ভেঙে দেওয়া... বোধহয় বলাই যায়। তাদের দিকে চাইলে ‘পর উজানে নয়, স্রোতের মুখেই বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে সেই তার, যে কিনা জেটিতে, কারণ সে তার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। আর সময়টা সন্ধ্যা। আর ঘাটে একটাও নৌকো নেই, সেই নৌকো যেটা, তাকে, জাষ্ট, ওপারে নিয়ে যাবে।

জেটির লোকগুলোকে কী কিছু বিষণ্ণ লাগে, একটাও নৌকো এসে না ভেড়ার জন্য?

 

জেটিতে অপেক্ষারত সবাই-ই, কিন্তু, যে লোকটা ফোকাসে আছে, সে বোধহয় একা আসে নি, অন্তর্জলী করতেও কেউ একা আসে না, তাকে সেটা করাতে আসে একাধিক স্বজন। আবার সাধের ঘরবাড়ি রেখে যাওয়ার সময় কেউ ঝাড়ের বাঁশ কাটে, কেউ দড়ি পাকায়। পিছনে পড়ে থাকে হাতির দাঁতের পালঙ্ক, মূহুর্ত আসে চার কাঁধের দোলায় চড়ে বেরিয়ে যাওয়ার। তো, যারা কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে যায়, তারা তো আর গিয়ে জেটিতে বসে ঘটিগরম চিবোতে চিবোতে —

এস আই আর-তে নাম উঠলো কি না, কিংবা,

মাত্র কুড়ি হাজার ডলারের ড্রোন কীভাবে নয় বিলিয়ন ডলারের রাডার সিষ্টেমকে গুঁড়িয়ে দিলো, কিংবা,

ইস্টবেঙ্গলের নতুন সভাপতি দায়িত্ব পেয়েই এক বছরের মধ্যে দলটাকে কোন্‌ উচ্চতায় নিয়ে যাবেন বলেছেন, অথবা,

রোহিত শর্মা, না, ফর্মের তুঙ্গে থাকা সঞ্জু স্যামসন, শ্রেয়স আইয়্যার, নাকি, স্বপ্নের টাচে থাকা ঈশাণ কিষাণ — এসব নিয়ে আলোচনা করবে না; তাদের সে ঠেকবাজি মারবার জন্য অন্যত্র আছে অনেক, সেসব ঘরপানে আছে। ঘরেও নহে, পারেও নহে — ঘর ছেড়ে এসে, এবং আদার সাইডে পৌঁছতে না পেরে, এ আলোচ্য লোক অতএব তার মতো করে একা। জেটিতে। অনেকের মধ্যে থেকে একা। তার একাকীত্ব’র গায়ে অনেকটা শাউটিং আউট লাউড লেবেল মারা আছে যেন। তাকে যে জন আছে মাঝখানে… হ্যাঁ, তা বলা তো যায়ই। যখন ঘর থেকে তাকে কাঁধের দোলায় চড়িয়ে বার করা হয়েছিলো, তখন তার গায়ে অজস্র ফুল, মালা, চন্দন চর্চ্চন, ধুপ ইত্যাদি, কিন্তু এখন তার ফুলের বাহার নেইকো যাহার / ফসল যাহার ফললো না, / অশ্রু যাহার ফেলতে হাসি পায়।

বায় দ্য ওয়্যে, আমরা কেমন করে যেন ডেডবডিকে চ্যাঁচাড়ির শয্যায় শোওয়াই?

 

দিনের আলো যার ফুরালো / সাঁঝের আলো জ্বলল না — আলো কী করে? অন্ততঃ কৃত্রিম আলো? অন্ধকারই শ্বাশ্বত, তবুও, নকল আলো জীইয়ে রাখে। আলো বলতে আমরা যা যা বুঝি, তার কিছুটা কৃত্রিম;- আলোর কিছুটা নশ্বরের আবিষ্কার (আবিস্কার লিখলে বেটার হতো, কারণ, আগের স্বরধ্বনি লঘু), কিন্তু সেই নকল আলো আলোচনার মধ্যে আসে না, আলোচনার মধ্যে আসে সেই আলো, যে ভোর আনে, এনে অন্তরের কালিমা-কলুষ মুছে নিয়ে যায়। সূর্য পাটে বসে গেলে সেই আসল আলো আর নেই; অর্থাৎ, ফোকাসে থাকা লোকটা নশ্বরের কৃত্রিম আলোয় নয়, সূর্যের আলোয় ধনী ছিল মূলতঃ; আর সূর্য না থাকলে, তখন এবং শুধুমাত্র তখন, নশ্বরের কৃত্রিম আলো সম্বল ছিল তার। এবং সেটাও এখন তার নেই। স্বাভাবিক। এটা বারোভাতারি জেটি। তার নিজস্ব ঘর নয়। এবং দিন শেষ হলে স্বাভাবিক একান্তই যে, আলো নেই, তাই সে রিক্ত, সর্বস্বান্ত। আর এই রিক্ততাই তাকে জেটির ওয়েটিং লিস্টে রেখেছে, তাকে আর্তি জানাতে বাধ্য করেছেঃ ওরে আয়... / আমায় নিয়ে যাবি কে রে / দিন-শেষের শেষ খেয়ায়…

 

সৎ-লিখনে এই রিক্ততা না থাকলে পার হওয়ার ঘাটে এসে ওঠা যায় না, অপেক্ষা তো দূর। এই রিক্ততা যেটা দুটো চরণে চিত্রিত হয়েছে, একটা মাত্র ইমেজারির আঁচড়ে, সেটাই ওপারের সোনার কূল, কিংবা সোনার কূলের বিভ্রম, এপার, এপারের অপেক্ষা, জেটিতে থাকা অন্যান্য লোক এবং সে, আর দূরের ঘরবাড়ি, এপারের, পিছনে পড়ে যাওয়া, যেখানে কৃত্রিম আলো আছে, ও ফলতঃ, নশ্বরের জীবন এই সবের কর্ণারস্টোন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই দুটি পংক্তি।

 

নশ্বর রিক্ত না হতে পারলে আক্ষরিক, জেটিতে এসে উঠতে পারে না, কিছু পরে, গেয়ে উঠতে পারে না কোন্ কূলে আজ ভিড়লো তরী / এ কোন্ সোনার গাঁয়!

 

অনিন্দ্য ঘোষ      ©


গীতিকারঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সুরকারঃ পঙ্কজ কুমার মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

কন্ঠঃ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

মেটা ডেটাঃ গানটি অনিন্দিতা নামে একটি চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই সিনেমাটিও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনা।

 

  

 

 

 

 

 

 

 

ফটো কার্টসিঃ  গুগল ইমেজেস 

 

ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলিএখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে

 



 

No comments: