❝Should I kill myself, or have a cup of coffee? But in the end, one needs more courage to live than to kill himself.❞
Albert
Camus, A Happy Death
বাক্য দুটি পড়তে-লিখতে-শুনতে দারুণ না? পড়ার পর ঝিম ধরানো, এ-আমি-কোথায়-এলাম টাইপ একটা বিহ্বল ক্রমাগত পা ঠুকে চলার মধ্যে যখন জেনে উঠতে পারা যায়, বাক্য দুটোর লেখক আলবেয়ার কাম্যু — কেমন যেন অসাড় হয়ে আসে হাত-পা, অল্প-স্বল্প বমি-ও ঘুলিয়ে উঠে আসতে চায়।
মজার ব্যাপার হলো, কাম্যু এই বাক্য দুটি লেখেন নি। কখনও।
হয়েছেটা কী — কাম্যুর লেখার পাঠকেরা কাম্যুর তামাম লেখার আত্মার নির্যাস বের করতে চেয়েছেন।
অতঃপর করেছেন। তাঁদের যেটাকে আত্মা বলে মনে হয়েছে, সেটাকে লিখেছেন। দুই বাক্যে।
তারপর সেটাকে প্যারাফ্রেজ করেছেন। বারংবার। বারো জনে। যতক্ষণ না রক-সলিড একটা কিছু দাঁড়ায়।
তারপর — প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে, আমারই এ দুয়ার প্রান্তে, সে তো হায়... মৃদু পায়... এসেছিল পারি নি তো জানতে-এর মতো সেটা কাম্যুর লিখনের মধ্যে ঢুকে গেল। নিজে থেকে গেল না, তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। পুরুষাঙ্গের মতোই অনেকটা — এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস বে! যা ফোট বে, গন্তব্যে যা! এভাবে মুহ্যমান দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তোর নির্মাণ? তোর কম্প্যাটিবেল ডেস্টিনেশনে যা, বে।
ডেস্টিনেশন, অর্থাৎ স্ত্রী-অঙ্গ, আ হ্যাপী ডেথে নির্মিত হয়েছিল এইরকমঃ
❝Sometimes there are days when you’d like to change places with him. But sometimes it takes more courage to live than to shoot yourself.❞
Albert Camus, A Happy Death
খুব আনমোল ধামাকাদার কিছু কাম্যু কখনও লিখেছেন বলে আমি মনে করি না, তাঁর কিছু কোটেশন আছে (ভুল কোটেশনটিও তার মধ্যের একটি), যেগুলো উচ্চকিত, কিন্তু আনলাইক কুন্দেরা, বলতে গেলে প্রায় কোনোটাই তাঁর ফিকশনে নেই, হয়তঃ ব্যক্তিগত আলাপচারীতায়, কি পিলো টকে এসব বলে থাকলেও থাকতে পারেন, কিন্তু ফিকশনে কাম্যু ভীষণ লো ক্যি অ্যাপ্রোচ নেন, তাঁর আন্ডারটোনের জন্য অনেক খোঁচ লাগা বাক্যও মোলায়েম লাগে, পড়া শেষ হওয়ার পর যার ফল আউট হদিশ করা যায়।
প্রকৃত লিখন আর প্যারাফ্রেজিং অফ অ্যান অথর’স স্পিরিট দুয়ে মিলে গেলে ‘পর, গৌরীপটের ভিতর শিবলিঙ্গ যথা, সৃষ্টির যে চিরায়ত ছবিটা মেলে, তার একটা ডিফারেন্ট ভার্সন পাওয়া গেলো অন্য একটা ভাষায়। আঁজ়মাকে দেখিয়ে —
❝নীলমণি ভাবিলঃ বিনা তামাকে এই গভীর রাত্রির লড়াই জিতিব কেমন করিয়া? ছেলের কান্না দুই কানে তিরের ফলার মত বিঁধিয়া চলিবে, মেয়েটার মুখের চাহনি লঙ্কাবাটার মতো সারাক্ষণ মুখে লাগিয়া থাকিবে, নিমুনিয়ার সঙ্গে নিভার ব্যাকুল কলহ চাহিয়া দেখিতে দেখিতে শিহরিয়া শিহরিয়া মনে হইবে বাঁচিয়া থাকাটা শুধু আজ এবং কাল নয়, মুহূর্তে মুহূর্তে নিষ্প্রয়োজন — আর ঘরে এখন তামাক আছে একটুখানি!❞
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আত্মহত্যার অধিকার
কিন্তু ভুল কোটেশনটা যে করিডোরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেই করিডোরেই যেন দাঁড়িয়ে আছে ওপরের অনুচ্ছেদটা। প্রাথমিকভাবে তো জবুথবু করেই দেয়। সেই জড়তা কাটিয়ে উঠলে দেখা যায় — এখানে তামাকটা কিন্তু আত্মহত্যার বাইনারিতে সাবস্টিউট হিসেবে নেই, আছে আত্মহত্যারই বাইনারিতে, তবে কমপ্লীমেন্টারি হিসেবে। আমার তো এমনই লেগেছে বরাবর। জানি না, মানিক পরিক্রমণ আমার জলাঞ্জলি গেছে কি না, তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অর্বে ‘আত্মহত্যা’ জিনিসটা যেন ইনড্যেলিবল। অর্থাৎ, পরিবেশ এমনই যাতে করে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনও রাস্তা আর নেই।
বাকী গল্পটা কিন্তু সেই পথে যায় নি, বরং একটা রাতের জন্য পরিত্রাণ পাওয়ার গল্প; যার পরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আগামী। কাল, পরশু ইত্যাদি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই বিবরণে না গিয়ে পাঠককে জাষ্ট সাবধান করে দিয়ে গেলেন। দিয়ে গেলেন চরিত্রদের নিয়তি সম্পর্কে। কিন্তু একে নিয়তিবাদ বলে কি না জানি না আমি, একটা ক্রুর নিহিলিস্টিক ইশারা কিন্তু জেগে থাকে। ফলতঃ গল্পটা যেহেতু সীমাহীন দারিদ্র্যের, আরও নিষ্ঠুর ঠা ঠা হাসতে থাকে।
আমি, আমার ভাবনায়, যার কিছু খুচরো আমি লিখে উঠতে পেরেছি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনও দিনই বিরাট কিছু ভাবি নি, স্বেচ্ছায় নয়, ভেবে উঠতে পারি নি আর কি, সুতরাং একটা অক্ষমতার দায় আমার ওপরও অর্শায় বই কি — সবসময়ই আমার মনে হয়েছে, পুতুলনাচের ইতিকথা, চিন্তামণি আর হরফ বাদ দিলে, তাঁর বাকী সব উপন্যাসেই, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ হোয়াট্টা ওয়েস্ট!
কোনও কিছুকে আপনি যদি মাপতে চান, তাহলে কিন্তু আপনার একটা স্কেল লাগবে। বাঙালীর সৃজনশীল মেধার ক্ষেত্রে সে মেধার গভীরতার মাপকাঠি — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মেধার প্রকাশের ক্ষেত্রে — বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (রক্তবীজ ১ এবং ২-তে অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিক বারবার এবং মিমি চক্রবর্তী একবার বোকচোদা বলতে না পেরে, বোকচোদা বোঝাতে বাঁকা চাঁদ বলেছেন এবং প্রত্যেকটা সময় আমার বঙ্কিমের মুখ মনে পড়েছে), জীবনানন্দ, এবং ওয়ালীউল্লাহ (শেষজন মেধায় এবং তার প্রকাশে অসম্ভব পরিশীলিত ও ফলতঃ, সামঞ্জস্যপূর্ণ)।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেধা যদি দেখি, তাহলে সেটা রবীন্দ্রনাথের সমান, কিংবা বেশী হলেও হতে পারে। মেধার প্রকাশের দিকে গেলাম না, এক্স্যাক্টলি ওইখানেই — সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। প্রকাশ করার কৌশল, খুব সম্ভব, সহজাত। আমরা আর একে সার্থক দেখেছি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের... আজ্ঞে না, পদ্যে নয়, গদ্যে। আরও অনেকেই অল্প-বিস্তরে আছেন, আমি পুঁথি বাড়াতে চাচ্ছি না।
কিন্তু অতল মেধার সঙ্গে অপরিসীম গাম্বাটপন থাকলে কী হয়? কেন, একটা দিবারাত্রির কাব্য হয়, একটা পদ্মানদীর মাঝি হয়, একটা জননী হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাস আমি সচেতনে পড়ি নি এখনও — স্বাধীনতার স্বাদ। ৩৯২ পাতা জুড়ে মানিক কী করেছেন, সেটা আমি আর একটু পরে জানতে চাই; - আফটার অল, ওই মেধা... পাঠককেও কিন্তু যোগ্য হয়ে উঠতে হয়, এবং যেখানে, ‘স্বাধীনতা’ শব্দটা নিয়ে বিস্তর খটকা আছে আমার নিজেরই।
গল্পের ক্ষেত্রে (অ্যাকাডেমিয়া থেকে আসছি না, বস্তুতঃ কোথাও থেকে আসছি না আমি, তাই ছোট-বড়-অণু-পরমাণু-কোয়ার্ক গল্পের বিভাজন করতে পারি না), এই মানিক কিন্তু অনবদ্য। তাঁর মেধার ভূমার দর্শন এইখানে মেলে, কারণ একটাই, গল্প লিখতে চেয়েছেন তিনি, বামপন্থা এবং ফ্রয়েড এর খিচুড়ি বানানোর ইচ্ছে তাঁর প্রবল থাকলেও, গল্পের কারণে দোকান সাজিয়ে উঠতে পারেন নি, ময়না দ্বীপ জাতীয় বহুবিধ অন্তঃসারশূন্য, তথা বিপদজনক ব্যাখ্যায় যান নি, যেতে পারেন নি নির্ঘাত; আর সেই কারণেই প্রাগৈতিহাসিক গল্পটা খানিকটা আনটোল্ড থাকার জন্য উতরে যায়। যদিও পাঠকের জন্য সেখানে বিশেষ কিছু পড়ে নেই — গল্পটা পড়ে ফেলার পরঃ সেক্স যদি ড্রাইভ-ই হবে, তবে সেটা তো প্রাগৈতিহাসিক, এবং দ্যাট টু, তখনো যা, এখনো যা। রাইট সার। বলে নিয়েই পাঠকের অন্য গল্পে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনও চারা থাকে না।
আমার বিস্ময় জাগে, ও-বাংলাতেও আখতারুজামান ইলিয়াসের সঙ্গে কী মিল এখানে!
কিন্তু কাম্যুর টাকা কড়ি কেমন ছিল জানি না আমি, সেসময়ের অনেকেরই টিবি হতো, এবং এটা বিশেষ কিছু মানে বহে আনে না। পক্ষান্তরে, মানিকের আর্থিক অবস্থা — যা এদিক-সেদিক থেকে শুনে জেনেছি, বেশ, বেশ করুণ ছিল। ঘাড়ে করে দিন আনতেন আর সেটা কোনও মতে গুজরান হতো; কিন্তু সেই জায়গা থেকে অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার এইরকম স্পর্ধা, অস্তিত্বকে এইরকম ফ্র্যাজাইল দেখতে পাওয়া — আত্মহত্যা তো হবেই, তার আগে কিছুটা তামাক হবে না! এইখানে মানিকের অতলান্ত মেধার পরিচয় মেলে। গল্পের বাকী অংশও দারুণ, এক দিনের জন্য সংকট কাটে গল্পের চরিত্রদের, এবং আর একজনের সঙ্গে মোলাকাত হয় যে তার অনারোগ্য অসুখে জর্জরিত এবং অস্তিত্ব নিয়ে নাকাল। কিন্তু তার গানপয়েন্টে হ্যান্ডগান ধরলে ‘পর সে কি বলতে পারতঃ চালিয়ে দে না বাঁড়াটা, দেরী করছিস কেন! এটা জানা যায় না। স্বাভাবিক গল্পের আভরণের মধ্যে নেই সে, তার স্টেকও অতএব তার ওইটুকু, একটা জাক্সটাপোজ করিয়েই সে মুক্ত (স্বাধীন?)।
গল্পের মূল চরিত্ররা আজ না হয় বাঁচল, কিন্তু কাল? বা তার পরের দিন? তখন তারা কী খাবে? কী খেয়ে হাগবে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্নের মশালটা এখানেই গেড়ে দিয়ে কেটে পড়েন এবং গল্পটা অনবদ্য হয়ে ওঠে। আমরা লেখক মেধার প্রতি অবনত হই। শ্রদ্ধায়।
আমার ভাবতে সাধ যায়, বাংলা গদ্যাংশটিও কাম্যুর লেখা... কি বলতে চান কাম্যু? আমি তাঁকে কেমন শুনেছি?
তাঁর অনেকানেক কথার মধ্যে এক্ষেত্রে যেটিকে আমার প্রয়োজন লাগে — এই জীবন অর্থহীন, ওই জীবন অর্থহীন, সেই জীবনও তাই, কিন্তু অর্থ নেই বলে কোনও দিনই যে অর্থ আসবে না — সেটা কে বলতে পারে নিশ্চিত? গল্পের নাম যখন আত্মহত্যার অধিকার, তখন, সে অধিকার চাওয়া হচ্ছে নিশ্চয়। সে অধিকার প্রশ্নিত হচ্ছে নিশ্চয়। যদি হয়, তাহলে, কার কাছ থেকে সে অনুমতি চাওয়া হচ্ছে? আমি যেমনটা বুঝেছি, বেঁচে থাকার কাছ থেকে। স্বহনন (একবার একটা গল্প লেখার চেষ্টা করেছিলুম, তাতে এই শব্দটা ছিল, একে তো আমার খুদি খুদি অপাঠ্য হাতের লেখা; তায় যে ডিটিপি করে, তার কাছে ‘স্ব’ এর পর তিন অক্ষরের শব্দ আসছে মানেই সেটা — ‘মেহন’; মেজরিটি মিনস বলে একটা কথা আছে না, তো যা হওয়ার সেটাই হয়েছিল, স্বহনন হয়ে গিয়েছিল স্বমেহন। পরে, আমি প্রুফ দেখতে গিয়ে দোষ কারো নয় গো মা-ই গেয়ে উঠেছিলাম, কারণ আমি চিরটা জীবন স্বখাত সলিলেই ডুবে মরে এসেছি, এই লেখাটাও তার ব্যত্যয় হবে না মনে হয়) কিন্তু দন্ডনীয় অপরাধ ছিল এই ভারতে কিছু দিন আগে পর্যন্ত। ভারতীয় দন্ডবিধির ৩০৯ ধারাকে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা রিপিল করেছে বটে, কিন্তু এটা থেকে কি এটা প্রমাণ হয় না, একটা সার্টেন টাইম অবধি মানুষের মগজে আত্মহত্যা একটা অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত ছিল, এবং সেই মানুষদের কোনও স্প্যাটিয়াল ডিসক্রিমিনেশন ছিল না, কেনকি, ইন্ডিয়ান প্যিনাল কোড, ১৮৬০ সালে লর্ড মেক্যুলে কর্তৃক প্রণীত আর সে ব্যাটা ব্রিট ছিল। সে থাকুক, বেঁচে থাকা থেকে যদি আত্মহত্যার অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়, অর্থাৎ, যদি কেসটা — অধিকার বুঝে নেওয়া প্রখর দাবীতে, সারারাত জেগে আঁকা লড়াকু ছবিতে... হয়ে যায়, তাহলে বেঁচে থাকাকে অ্যাবসার্ড বলি কী করে! এই, ওই, সেই — লট কে লট বেঁচে থাকা অ্যাবসার্ড হয় কী করে। লেখার সময়, ঠান্ডায় থরহরি কম্পকালীন পেটে হুইস্কি, কি তার চীপ সাবস্টিউট (জিন সেঙের বদলে রিন সেন) ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক মারার সময়, কি পরম কাঙ্ক্ষিত মেয়েটির সঙ্গে বিছানায়, চূড়ান্ত অ্যাক্টিভ থাকার সময় অক্সিজেন নিই না? কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ি না? কাম্যু নেন নি? তাহলে বেঁচে থাকা অ্যাবসার্ড হয় কী করে? আমার কেবলই মনে হয়, বেঁচে থাকা নয়, কাম্যু, বেঁচে থাকার মর্ফকে, মোডালিটিকে অ্যাবসার্ড বলে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন। পুজো আর সাধনার মধ্যে তফাত যেমন যোজন যোজনের, বেঁচে থাকা আর বেঁচে নেওয়ার মধ্যেও, আমার ভাবনায় তেমনটাই, কিংবা তার থেকেও বেশী। বেঁচে নিতে গেলে বেঁচে থাকার আচারসমূহকে প্রশ্ন করতেই হয়, আর সে প্রশ্ন হলে আন্তরিক, মানুষ অশৌচকালেও সেক্স করে ফ্যালে। আর তারপর, অঙ্গ-টঙ্গ ধুয়ে-মুছে সাফ-সুতরো হয়ে এলে পার্টনার যদি জিগায়ঃ এর নাম কি ভালোবাসা? তখন মুখ থেকে বেরিয়ে যায়ঃ ও শব্দের তেমন কোনও মানে নেই। (পার্টনার যদি মেয়ে হয়, তাহলে পোস্ট লাভ-মেকিং ফেজে লাভ জিজ্ঞাসা করাটা চেতন ভগত ডিডিউসড শিফটিং অফ ভালন্যারেবিলিটি ইনড্যিসপেন্স্যেবল হয় যায় না কী?)
আসলে যে মানে খুঁজে পাচ্ছে না ভালোবাসায়, সে তো আরও বৃহত্তর জায়গায় লাট খাচ্ছে; সে, বিহ্বল প্রশ্নসব একের পর এক ছুঁড়ে যাচ্ছে জীবনকে, তার অর্থকে। সে... ‘বাঁচা’ – এই শব্দটাকে মরীয়া খুঁজে ফিরছে, কারণকি, এ খোঁজ ব্যর্থ হলে নিজের রগের পাশে হ্যান্ডগান ধরে ট্রিগার টানা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। সেসময় পিস্তল কখনোই দ্য ডেভিল’স রাইট হ্যান্ড নয়। এটা সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়, এটা অন্বেষণ এবং শূন্যতার প্রশ্ন, যেটা সেই তল্লাশকারীকে ক্ষ্যাপা ক্ষুঁজে ফেরে পরশপাথর বানিয়ে দেয়। আমরা শালা ক্ষ্যাপা নই, আর সে বানচোত ক্ষ্যাপা — অতএব আমরা তাকে বাহিরের লোক, যে কিনা অন্দরে ঢুকে এসেছে ঠাউরে শিউরে উঠি। বস্তুতঃ মারস্যো কখনোই আউটসাইডার নয়, তাকে আউটসাইডার স্টিগমা দেওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, ইংরেজরা কতটা মূর্খ জাত;- সে অচেনা হতে পারে, কিন্তু আমি আমার লোকাস স্ট্যান্ডাই সম্পর্কে কী করে এত নিশ্চিত হলাম যে তাকে বহিরাগত বলে দিতে পারি। এটা ইংরেজরা ভাবে নি, ভাবে নি বলেই, যে সবচেয়ে বড় ইনসাইডার, এবং যে ইনসাইডের প্রতিটি ইঞ্চিকে প্রশ্ন করেছে, অগ্রাহ্য করে দেখেছে, তাতে ঠিক কী কী হয়; সেই মারস্যোকে তারা আউটসাইডার হেঁকে দিয়েছে। বস্তুতঃ এই ইংরেজ, তথা বাকী বিশ্ববাসীকে, কাম্যু একটা সহজ বাক্যে এঁকে দিয়েছেন, রূপরেখা টেনে দিয়েছেন, লক্ষ্মণের কাটা গন্ডীর মতোঃ ফরনিকেটেড অ্যান্ড রেড দ্য পেপারস। অর্থাৎ একটা বেসিক শিশ্নোদরপরায়ণতা — যা সাবেক, সভ্যতার আদিকাল থেকে চলে আসছে — পেটে জুটেছে? তলপেটেও জুটে গেছে? তবে আর কী, ঘুমোতে যা! এই জায়গাতেই একটা পিন-পয়েন্টেড স্ট্রাইক করেছেন কাম্যু; সার্জিক্যাল কি না জানি না, তবে ক্লিনিক্যাল, এটুকু বলতে পারি। বারংবার তিনি আয়না দেখেছেন — কী, ঠিক কী নজরগোচর এখন?
আমাদের তখন প্রাক-যৌবন। ঠেক মারতে যাবো, তার আগে রেশন নিচ্ছি বোসপুকুর মোড়ে — দু প্যাকেট ফিল্টার উইলস, আর প্যাকেট পাঁচেক বিড়ি (তখন স্টার বিড়ির যুগ, ক্লাসিক বিড়ি আসে নি মার্কেটে) নিয়ে খুচরো বুঝে নিচ্ছিলাম, পাশের ঠেকের শান্তনুদা এসে একটা গোল্ড ফ্লেক কিনে, ধরিয়ে শু শু করে ধোঁয়া টানতে টানতে তন্নিষ্ঠ আনমনা ফিরে যেতে লাগল রাস্তার ওপারে দাঁড় করানো সাইকেলের কাছে। সাইকেলে উঠেও পড়ল। এদিকে এক টাকা দিয়েছে, পঞ্চান্ন পয়সা ফেরত হয়, উদগ্রীব দোকানদার শ্যামলদা, বারকয়েক ও ছেলে, এ ভাই ডেকে সাড়া না পেয়ে বলে ফেললঃ ‘আবার কী? ও ধোনকুমার, ব্যালান্সটা নিয়ে যাও।’ ওই এক ‘ধোনকুমার’- এ শান্তনুদা কাত, সুড়সুড় করে ফিরে এসে ব্যালান্স নিয়ে গেলো। আমি গোটা ব্যাপারটা দেখে তদ্গত শুধিয়েই ফেললামঃ ‘এই ধোনকুমার-টা কী কেস, শ্যামলদা?’ শ্যামলদা, প্রয়োগের সার্থকতায় তখন সে হাসছে; ইনসিসর্সের দুটো নেই, ওপরের পাটির কয়েকটা ক্ষয়ে-খাবলে গেছে, তার মধ্যেই যতটুকু হাসি হাসলে মন একটু হলেও অন্ততঃ ভরে, হেসে নিয়ে, কিন্তু হাসিটা জীইয়ে রেখে শ্যামলদা বললঃ ‘তোদের বয়সে কী এখন সবচেয়ে উঁচু বল তো?’ আমি হাওয়া বাঁচিয়ে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে, ধরিয়ে বললামঃ ‘মাথা।’ স্ম্যার্কেং টোনে শ্যামলদা বললঃ ‘বাঁড়ার মাথা। আবার কী? তোদের বয়সে জেগে থাকে ধোন। সবচেয়ে উঁচুতে থাকে। আবার কী? মাথারও উঁচুতে, যদ্দিন না একটা ভালো চাকরী পাচ্ছিস। আবার কী?’ আমি ধোঁয়া ছেড়ে জানতে চাইলামঃ ‘আর চাকরী পেলে?’ শ্যামলদা গম্ভীর হয়ে গেলো, জীবনে অনেকবার পি এস সি, এস এস সি দিয়ে লাগাতে পারে নি একটাতেও, বললঃ ‘চাকরী পেলে মাথাটা উঁচু হবে। আবার কী? ধোন নীচু হবে। আবার কী? তারপর তো বে করবি বলে বাপ-মা’র কান ঝালাপালা করে দিবি, নয় তো, সিঙ্গল খাটে করাত লাগাবিঃ অ্যাত্তো বড় খাট নিয়ে আমি কী করবোওওও। আবার কী?’ আমি মাঝখানে একটা লম্বা টান টেনে নিয়ে ফের ধোঁয়া ছেড়ে বললামঃ ‘ভাটিও না তো।’ শ্যামলদা অবাক বললঃ ‘ওই দেকো, আবার কী? আমি হ্যাজাচ্ছি? ওই বায়নার ঠেলায় বাপ-মা মিলে ধর তক্তা মার পেরেক করে বে দিয়ে দেবে। আবার কী? আর তারপর তো ওই উঁচু ধোন গুটিয়ে গর্তে সেঁধিয়ে যাবে। আবার কী? হুঁ হুঁ বাবা, বউয়ের ফুটো বলে কথা...’
আমি রাস্তা টপকে যাই।
আজ বুঝি অকৃতদার শ্যামলদারা পুরুষাঙ্গ আর স্ত্রী অঙ্গ এবং একটার মধ্যে অন্যটার সেঁধিয়ে যাওয়া, যেন গ্রহণ লেগেছে — এই ঘূর্ণিতে লটকে গিয়েছিল। পিরিয়ডটাও তাই, ঘোরতর ট্যাবুড গার্লি থিং। কিন্তু সন্তানের জন্মটা যেন এই লুপটার বাইরে, ইন্টারপোলেটেড, প্রোজেক্টেড ফ্রম আউটসাইড একটা কনসেপ্ট, ফলে, সন্তান, পিতৃত্ব, মাতৃত্ব — এসবই পূজিত হতো আউটসাইডার জ্ঞানে। সেগুলোও যে ইনসাইড দ্য লাইফ — শ্যামলদারা বেঁচে থাকতে বুঝে আর উঠতে পারল না।
কাম্যু জানতেন, এসব ছুটকো ব্যাপার সুয়ো মোটো ঠিক হয়ে যাবে, যদি জীবনের একটা অর্থ জোটে, বেঁচে থাকার ভাগ্যে বেঁচে নেওয়ার শিকেটা ছিঁড়ে যায়। অস্তিত্বের কেন সবাই-ই জানে, অস্তিত্বের বাকী দিশা দেওয়াতেই কাম্যু প্রবল তৎপর ছিলেন; একটা কথা এখানে বোধহয় অবধানেবল, অর্থ বা দিশার সুলুক সন্ধান কীভাবে হবে, কেমনভাবে তাকে দেখবে সমাজ, তথা, ঊনপাঁজুরে ঊনপঞ্চাশ দিক — কাম্যু এককথায় সেরেছিলেনঃ সেটা ডেভিয়েন্ট বিহেভিয়ারের একটা রকমফের হতেই পারে। এখানেই মজা, কারণ ল’ অফ ল্যান্ড কথাটা হেব্বি চালু। সব জায়গায়। সব সময়। তা এই আইন-কানুন কারা বানিয়েছে — এই জায়গায় এসে একটা কথা উপলব্ধিতে আসে যে, আইন, নর্মস, কাস্টমস এসবের ট্র্যাজেক্টরি ঠিক করেছে কমোনারে মিলে, যারা নানাবিধ কাগজ পড়ে, আর, আর ফরনিকেট করে। উল্লেখ থাকুক, বেঁচে থাকা যদি শূন্যতা ছাড়া আর কিছু না হয়, সম্পর্কগুলোও, সেক্ষেত্রে, ওই শূন্যতা দিয়ে মোড়া, ফলতঃ যে কোনো যৌনতাই, ইররেসপেক্টিভ অফ সেক্স অ্যান্ড জেন্ডার, ফরনিকেট ছাড়া আর কিছু নয়।
সুতরাং এই উদ্দেশ্যহীনতার উপলব্ধি থেকে উদ্দেশ্যের দিকে যে যাত্রা, সেক্ষেত্রে যাত্রাকারী এবং যাত্রায় বাধা দানকারী — উভয় পক্ষেরই একটা লিভ্যারেজ থাকে। যাত্রাকারী যদি ডেভিয়েন্ট কিছু করে, যদি সাবেক আইন, রীতি থেকে প্রতিসৃত বা চ্যুত হয়, যদি অর্থহীনতাকে প্রতিফলিত করতে না পারে, তাহলে, তাকে শূলে চড়ানোই মঙ্গল, তাতে শান্তির ভারসাম্য টাল খাবে না। কাম্যু ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট-এর দিকে এই ভাবেই একটা ক্ল্যান্ডেনস্টাইন আঙুল তুলে গেছেন বরাবর।
কিন্তু এই এত তর্জনী নিঃক্ষেপ দিয়ে হবেটা কী? ঘেঁচু (আমি সত্যিই এই শব্দের ইংরাজী, এই পারলেন্সে, জানি না; অ্যাট লিষ্ট, মাথায় তো এখন এক্কেবারেই আসছে না) যে হবে না, সেটা বলার জন্য কাম্যু পড়ার দরকার নেই, র্যাশানাল সিক্সথ সেন্স-ই যথেষ্ট। সেই রুব্রিকস একটা কথাই বলে — যদি রুবিক’স ক্যিউব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জিগস-অ পাজ়ল সলভ করাও যায়, তাহলে সেটাই এনে দেবে জীবনের অর্থ, বেঁচে থাকাকে সদর্থক গর্ভবতী করে দেবে। তাহলে তখন — ওই প্যারাফ্রেজের প্রথমাংশ — Should I kill myself — অপ্রয়োজনীয় কেননা, রিডান্ডান্ট, তখন পেন্ডুলামের অস্সিলেশন a cup of coffee -এর ডোমেইনে চলে এসেছে।
...তাহলে যে প্রথম প্রথম মনে হচ্ছিল, আত্মহত্যা ছাড়া চারা নেই! আরে ইয়ার, জীবন, জীবন বেঁধে বাঁচে। দারিদ্র্য ভারতের আজকের সঙ্গী নয়, উল্টে, বরং এখন কমে এসেছে। কিন্তু যে সময় জাঁকিয়ে ছিল, সেটা তো একটু-আধটু সময় নয়, ভারত বাঁচল কী করে?
নোটঃ পঠিত হওয়া মানে অল ইনক্লুসিভ কিছু নয় তো বটেই, বরং একটা দিক মাত্র দেখা। পুরো কাম্যু এবং/ অথবা মানিক পরিক্রমা করে লিখে নামিয়ে দেওয়ার মতো ঘিলুর ভার আমার মগজ সইতে পারবে না বলেই মনে হয় আমার।
আর যাবতীয় মনে হওয়া, যা লিখিত হলো, তার সবটুকুই ব্যক্তিগত।
অনিন্দ্য ঘোষ ©
ফটো কার্টসিঃ গুগল ইমেজেস ।
ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলি। এখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে।
No comments:
Post a Comment