আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন--
আমার ব্যথার পূজা হয় নি সমাপন ॥
যখন বেলা-শেষের ছায়ায় পাখিরা যায় আপন কুলায়-মাঝে,
সন্ধ্যাপূজার ঘণ্টা যখন বাজে,
তখন আপন শেষ শিখাটি জ্বালবে এ জীবন--
আমার ব্যথার পূজা হবে সমাপন ॥
অনেক দিনের অনেক কথা, ব্যাকুলতা, বাঁধা বেদন-ডোরে,
মনের মাঝে উঠেছে আজ ভ'রে।
যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে একে একে তারা,
আকাশ-পানে ছুটবে বাঁধন-হারা,
অস্তরবির ছবির সাথে মিলবে আয়োজন--
আমার ব্যথার পূজা হবে সমাপন ॥
এ পুজো, খুব সম্ভব, রবীন্দ্রনাথের শেষ পুজো। সমস্ত অনুভূতি, তাদের স্বাদ যেমনই হোক, সেগুলো রবীন্দ্রনাথ আগেই উৎসর্গ করেছেন। শুধু ব্যথা, দুঃখ ইত্যাদি রেখে দিয়েছিলেন কাছে, লেখালিখির বা অপরাপর সৃষ্টির ফ্যিউয়েল হিসেবে। তিনি জানতেন, বা তাঁর মনে হয়েছিল, যেটা ভুল-ঠিকের ঊর্ধ্বে, এটা দিয়েই তাঁর সাধনার উদযাপন হবে।
এই উদযাপনের লগ্ন — যখন বেলা-শেষের ছায়ায় পাখিরা যায় আপন কুলায়-মাঝে, সন্ধ্যাপূজার ঘণ্টা যখন বাজে।
মানে, পার্থিব লগ্নই। তার বেশী কিছু না।
প্রশ্ন হলো, দুঃখগুলোকে খুঁজে নিতে গিয়ে বা তার প্রায়োরিটাইজ করতে গিয়ে। কোন্ দুঃখ বা ব্যথাগুলো সবথেকে ভালো নৈবেদ্য হবে?
জীবনের সারাটা যাপন মথিত করলেন তিনি, বা হয়তো তাঁর অজান্তেই এটা হলো, এবং নৈবেদ্য’র ডালা তৈরী হলো, কিংবা, হয়তো সেভাবে হলো না, সব দুঃখকে রবীন্দ্রনাথ ধরে দিতে চাইলেন; শ্মশানে, লাস্ট রাইটস করার সময় মূল্য ধরে দেওয়ার মতো করে। অর্থাৎ অনেক ডালা। স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ জীবনে নেহাৎ কম বাঁশ খান নি। ডালা তৈরী করার সময় দুঃখ নিয়ে কোনরকম ম্যানিপুলেশন কি তিনি করলেন? জানা যায় না, সম্ভবত করেননি তিনি, তাহলে উদযাপনের মধ্যে আর যাই থাকুক, সততা থাকে না। আর সততা না থাকলে, এদিকের সাফল্য অধরাই থেকে যায়; কমোনারে মালের বোতল ধরে, অর্থাৎ দেবদাস হয়ে যায়।
তা সে যাক, এখন প্রশ্ন হলো, নৈবেদ্য পড়বে কোথায়? হোমানল তৈরী হবে কেমন করে।
প্রতিটা মানুষেরই; কিংবা প্রতিটা মানুষের না হোক, কিছু মানুষের; কিছু মানুষের না হোক, রবীন্দ্রনাথের অন্দরে অনেক আলোরও বাস। মনে হয়, তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেকেরই ভিতর এই আলো আছে; ঘটনা হলো এই বিশ্বাসটুকু না থাকলে কারোর মধ্যেই কোনও শাশ্বত আলো জ্বলে না।
এই শাশ্বত আলোকে কোনও লম্পো বা টর্চের সঙ্গে নয়, আমাদের রাখতে হবে সূর্যের সমাসনে, আদারওয়াইজ, সেই আলো থেকে আর যাই হোক, হোমানল জ্বলে না; জ্বালানোর মতো জ্বালানীই থাকে না তার। যে এই চিরায়ত আলোকে উপলব্ধি করতে পারে, সে লগ্নটাকেও সঠিক ঠাহর করতে পারে।
কিন্তু এই অন্তরীণ সূর্য এবং এই যজ্ঞ-চেতনার একই তলে নেই; একটা কনভেক্স লেন্স বা তার থেকেও ভালো কিছু দিয়ে অন্দরের সূর্য থেকে হোমানল জ্বালানোর প্রাথমিক ফুলকিটা আসবে।
আহুতি পড়বে এবং পড়লে সেগুলো সফল, দুঃখগুলো এক-একটা নক্ষত্র হয়ে জ্বলবে। কিন্তু অন্দরের সূর্যের ব্যাপক আলো, সেটা থাকলে তো আর সেই নক্ষত্রগুলোকে হদিশ করে উঠতে পারা যায় না, তাই চিন্ত্বনের তল আলাদা।
মানুষের ভিতর একটা মহাকাশ আছে, একটা বিশ্ব প্রপঞ্চ আছে, বাবেলের লাইব্রেরী দিয়ে তাকে বুঝতে চাওয়া বেকার। সহজ করে ভাবলেই ভালো। মহাকাশ, বিশ্ব-প্রপঞ্চ — এসব ভারী ভারী শব্দ বলতে আমরা যা বা যেগুলো বুঝি, সেটার বা সেগুলোরই একটা এক্সটেনশন। সেই আকাশে নক্ষত্রগুলো জ্বলে উঠল। যেই না ওঠা, রবীন্দ্রনাথ বাহিরের আকাশেও, যে আকাশ কিনা সবাই দেখে, তাদের দেখতে পেলেন। কেননা, ততক্ষণে অন্দর তাঁর ফাঁকা, খর আলোর মধ্যেও ফাঁকা, আর ফাঁকায় তাকিয়ে লাভ কী, যখন কিনা উল্টোদিকে দেখার জিনিস থইথই করছে! অন্দর-বাহির মিলেমেশে একক হলো। নিশ্চিন্তি।
আর নক্ষত্রগুলোর একে একে জ্বলে ওঠা দেখতে পেয়ে গেলে? তব অউর কেয়া, বাস্ এক হী তো বাঁচা থা দেনে কে লিয়ে, সেই শেষ শিখাটা... রবীন্দ্রনাথ সেটাও দিলেন অস্ত-রবির অ্যালাইনমেন্টে, এবং দিয়ে উঠতে পারলেই তা, তাঁর শেষ পুজোর সমাপন হলো। এবার তাঁকে মুক্ত মানুষ বোধহয় বলাই যেতে পারে। কারণকী, এরপর পার্থিব কী এমন পড়ে থাকতে পারে আর, যা তাঁকে টলাতে পারে বিশেষ?
সফল রবীন্দ্রনাথ। দুঃখ পেয়েছেন; আবার সেগুলোকে জিন্স থেকে ধুলো ঝাড়ার মতো করে ঝেড়েও ফেলতে পেরেছেন।
...আর এটা কিন্তু সহজ কাজ মোটেও না।
পুনশ্চঃ তন্ত্র বলে, মরে যাওয়া হিন্দুদের বডি যখন পোড়ে, তখন... সৎকার তো এত বাল-ছালের ব্যাপার নয়, পুরো শরীরটাই আহুতিতে যায় সেখানে। মন্ত্র-ফন্ত্র এখানে ফুস। কী হচ্ছে, সেটাই বড় কথা। তো শরীর — কন্টেইনার হিসেবে নেহাত কম না, বহোত মাল ধরে, একজীবনে যা যা চয়ন করা যায়, কিংবা, যেগুলো বেঁচে থাকলেই মগজে এসে জেঁকে বসে, অর্জিত এবং বেনোজল যথা স-ব-কি-ছু’র আহুতি হয়। আগুন খায়; আবার, খেলে হাগতে হবে, এটা জেনেও খায়। পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল মানেই আগুনের গু থেকে সেসব কোথাও একটা রয়ে গেল। এগুলো মৃত্যু করায়। এ-ও বোধহয় একরকমের শোধন, যেটা বেঁচে থেকে করতে গেলে তন্ত্র, কিংবা, রবীন্দ্রনাথের কিছু নির্বাচিত গান।
অনিন্দ্য ঘোষ (গদ্যটুকু) ©
ফটো কার্টসিঃ বন্ধু, পরিচয় ফাঁস করতে বারণ করেছে ।
ঋণঃ আমি সজ্ঞানে বা অজান্তেই একপ্রকার, আমার বাক্যের শুরু, মাঝখান বা শেষে, বহু গায়ক / গায়িকার গানের অংশ, অনেকসময় কবিতার কোনো অংশ, কারোর গদ্যের কোনো অংশ, নামকরণ ইত্যাদি প্রভৃতি ব্যবহার করে ফেলি। এখানেও যদি করে থাকি, তো, সেইসব কবিদের, গদ্যকারদের আর গানের ক্ষেত্রে, গানের গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক / গায়িকা ও সেইসব গানের অংশভুক সকলকে।